চট্টগ্রাম হালিশহর হাউজিং এস্টেটের এল ব্লকের ১ নম্বর রোডে ৭.৩৩ কাঠার একটি প্লট। যেখানে তিনটি দোকান নির্মাণ করে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। এটাকে বাণিজ্যিক হিসেবে ব্যবহার করা হলেও জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের কাছে কাগজে-কলমে দেখানো হয়েছে আবাসিক প্লট! ২ কোটি ৫৬ লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিতে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা প্লটটি কারসাজি করে আবাসিক হিসেবে নামজারি ও লিজ হস্তান্তরের জন্য আবেদন করা হয়েছে।
এই কারসাজির নেপথ্যে চট্টগ্রাম হাউজিং এস্টেটের প্রশাসনিক কর্মকর্তা হারুন অর রশিদ হাওলাদারের বিরুদ্ধে ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের পরিচালক (ভূমি ও সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা) মো. আহসান হাবিব রাজনীতি সংবাদকে বলেন, বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার হওয়া প্লটকে আবাসিক হিসেবে দেখিয়ে আবেদন করা বেআইনি। প্রশাসনিক কর্মকর্তা এমন অনিয়ম করে থাকলে তাকে এর দায় নিতে হবে। আমরা এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেবো।
২০০৮ সালের ২১ জুলাই হালিশহর হাউজিং এস্টেটের এল ব্লকের ১ নম্বর রোডে ৭.৩৩ কাঠা আয়তনের ১ নম্বর প্লটটি বেগম সামছুন নাহার চৌধুরী নামের এক নারীকে বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য লিজ দেয় জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ। কিন্তু অনুমোদন নেওয়ার পর বাণিজ্যিক ফি পরিশোধ করেননি তিনি। এ অবস্থায় ২০২০ সালে প্লটের মালিক মারা যাওয়ার পর ২০২৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর তার ওয়ারিশ চার ছেলে ও এক কন্যা (মো. মোতাহের হোসেন চৌধুরী, মো. মোশারফ হোসেন চৌধুরী, হাসিনা আক্তার নারগিস, মো. মোহসীন চৌধুরী ও মো. তবারক হোসেন) নামে প্লটটি বাণিজ্যিক ব্যবহারের অনুমতি বাতিল করে আবাসিক হিসেবে নামজারি করা হয়।
এই পাঁচ মালিক সম্প্রতি মো. ইফতেখাইরুল আলম নামের এক ক্রেতার কাছে বায়নামূলে প্লটটি বিক্রি দেন। ইফতেখাইরুল আলম নামের এই ক্রেতা গত ২৯ জানুয়ারি এই প্লটটির লিজ হস্তান্তর ও নামজারির অনুমতির জন্য জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের নিকট আবেদন করেন। তিনি প্লটটি আবাসিক হিসেবে ব্যবহারের অনুমতি চাইলেও এটা ব্যবহার হচ্ছে বাণিজ্যিক হিসেবে। যা তিনি আবেদনপত্রে গোপন করেছেন।

গত ১৬ মে দুপুরে হালিশহর হাউজিং এস্টেটের এল ব্লকের ১ নম্বর রোডে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, প্লটটিতে ভাড়া দেওয়ার জন্য তিনটি দোকান নির্মাণ করা হয়। বর্তমানে দুটি দোকান বন্ধ থাকলেও একটি দোকান চালু আছে।
গত বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম হাউজিং এস্টেটের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. হারুন অর রশিদ হাওলাদার প্লটটির লিজ নতুন ক্রেতার কাছে হস্তান্তর ও নামজারির অনুমতি দিতে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান বরাবর একটি সুপারিশপত্র লিখেন।
বিস্ময়কর বিষয় হলো, সেই সুপারিশপত্রে প্রশাসনিক কর্মকর্তা হারুন অর রশিদ হাওলাদার এটাকে আবাসিক প্লট হিসেবে দেখিয়েছেন!
জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, প্লটের বাণিজ্যিক ব্যবহারের ফি হলো জমির মূল্যের সমান। হালিশহর হাউজিং এস্টেটে বর্তমানে প্রতি কাঠা জমির বাজারমূল্য হলো ৩৫ লাখ টাকা। সে হিসেবে ৭.৩৩ কাঠা প্লটটির বাণিজ্যিক ব্যবহার ফি’র পরিমাণ দাঁড়ায় ২ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। এই বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকি দিতে এটাকে আবাসিক প্লট হিসেবে দেখানো হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিযোগ পাওয়া গেছে, বাণিজ্যিক হিসেবে ব্যবহার করা এই প্লটকে আবাসিক হিসেবে দেখাতে চট্টগ্রাম হাউজিং এস্টেটের প্রশাসনিক কর্মকর্তা হারুন অর রশিদ হাওলাদার ক্রেতার কাছ থেকে মোটা অংকের ঘুষ নিয়েছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে হারুন অর রশিদ হাওলাদার ঘুষ নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে রাজনীতি সংবাদকে বলেন, ‘নির্বাহী প্রকৌশলী এটিকে আবাসিক প্লট দেখিয়ে প্রতিবেদন দিয়েছেন। সেই আলোকে আমি জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের কাছে সুপারিশপত্র পাঠিয়েছি।’
প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘প্লটটিকে বাণিজ্যিক হিসেবে ব্যবহারের বিষয়টি আমি জানি না। এটা তো অবৈধ। আমি বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবো।’
জানতে চাইলে এই প্লটের বর্তমান মালিক মো. ইফতেখাইরুল আলম এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার বিষয়টি আপনি কীভাবে বুঝলেন? এখানে তো কোনো দোকান নেই। এটা কোনোভাবেই কমার্শিয়াল প্লটের মধ্যে পড়ে না।’
উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম হালিশহর জি ব্লকে হাউজিং এস্টেটের সাড়ে ৭ কাঠার একটি প্লটে গড়ে উঠা ১১ তলা ভবনের ৮৫ লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া নিয়ে গত ৪ মে রাজনীতি সংবাদে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্লটটির লিজ হস্তান্তর ও নামজারির অনুমতির জন্য হাউজিং এস্টেটের প্রশাসনিক কর্মকর্তা হারুন অর রশিদ হাওলাদার বিক্রেতা ও ক্রেতাদের কাছ থেকে ১৫ লাখ টাকা ঘুষ নিয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। এ ঘটনায় টনক নড়ে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের। ইতোমধ্যে ঘটনাটি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান।
আরও পড়ুন: চট্টগ্রামে একটি ১১ তলা ভবনের ৮৫ লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকি
