, | |

মূলপাতা রাজনীতির মুখ

ডা. শাহাদাতের দিকে অভিযোগের তীর ছুড়লেন বিএনপি নেতা স্বপন


প্রকাশের সময় :৩০ অক্টোবর, ২০২৬ ৭:০১ : অপরাহ্ণ

মশিউল আলম স্বপন। বয়স ৫৮ বছর। তিনি পেশায় ব্যবসায়ী, নেশায় খেলোয়াড় আর পরিচয়ে রাজনীতিবিদ। মশিউল আলম স্বপন চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য। পাশাপাশি তিনি একজন শিপিং ব্যবসায়ী। তিনি চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী তিনটি ব্যবসায়িক সংগঠনের প্রতিনিধিত্ব করছেন। এই ব্যবসায়ী চিটাগাং চেম্বার অব কমার্সের সহসভাপতি, বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস চেয়ারম্যান এবং বার্থ অপারেটরস, শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরস অ্যান্ড টার্মিনাল অপারেটরস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের জেনারেল সেক্রেটারি। তার পেশা ব্যবসা আর পরিচয়ে রাজনীতিবিদ হলেও নেশায় একজন খেলোয়াড় ও ক্রীড়া সংগঠক। তিনি চট্টগ্রাম বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার সদস্য সচিব। দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে তিনি খেলাধুলার সঙ্গে জড়িত।

নিজের রাজনৈতিক জীবন, খেলোয়াড়ি জীবন, চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির রাজনীতি এবং চট্টগ্রামের ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে গত ২৪ অক্টোবর রাজনীতি সংবাদের সঙ্গে কথা বলেছেন মশিউল আলম স্বপন। তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রাজনীতি সংবাদের সম্পাদক সালাহ উদ্দিন সায়েম।

রাজনীতি সংবাদ: আপনি কত বছর ধরে রাজনীতির সঙ্গে জড়িত?

মশিউল আলম স্বপন: ১৯৮৫ সালে চট্টগ্রাম কমার্স কলেজে ইন্টারমিডিয়েটে পড়ার সময় আমি ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হই। তখন ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলাম। এরপর ১৯৯১ সালে আমাকে ৩০ নম্বর পূর্ব মাদারবাড়ি ওয়ার্ড ছাত্রদলের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। পাশাপাশি ডবলমুরিং থানা ছাত্রদলের যুগ্ম সম্পাদকের দায়িত্বেও ছিলাম। এরপর ১৯৯৬ সালে পূর্ব মাদারবাড়ি ওয়ার্ড যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক হই। এরপর ২০০৮ সালে আমাকে ৩০ নম্বর পূর্ব মাদারবাড়ি ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি করা হয়। দীর্ঘ ১৭ বছর সভাপতির দায়িত্বে ছিলাম। এরপর ২০২৪ সালে আমাকে মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য করা হয়।

প্রশ্ন: আওয়ামী লীগের ১৬ বছরের শাসনামলে আপনার বিরুদ্ধে কয়টি মামলা হয়েছিল আর কতবার জেল কেটেছেন?

উত্তর: আমার বিরুদ্ধে ১১টি মামলা হয়েছে। আর জেল খেটেছি দুবার।

প্রশ্ন: এতো মামলা কাঁধে নিয়ে ১৬ বছর কীভাবে জীবনযাপন করেছিলেন?

উত্তর: আমার পরিবারকে অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত রাতে পুলিশের অভিযানের ভয়ে বাসায় থাকতে পারতাম না। রাতে আমার প্রাইভেট কারে স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে যেতাম। কিন্তু কোথায় যাবো তা জানা ছিল না। নিরুপায় হয়ে রাস্তায় পার্কিং করে গাড়িতে ঘুমাতাম। অনেক সময় চিটাগাং ক্লাবের সামনে পার্কিংয়ে আমরা গাড়িতে রাতে ঘুমাতাম। ২০১৮ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত নগরীর চট্টেশ্বরী রোডে গোয়াছি বাগান এলাকায় একটি ফ্ল্যাটে আত্মগোপনে ছিলাম। সেখানে কোনো ফার্নিচার ছিল না। কেবল একটা ব্যাগে কাপড়চোপড় ছিল। ফ্লোরে ঘুমাতাম। রাতে যখন আমি ঘুমাতাম তখন আমার স্ত্রী ব্যালকনিতে বসে থাকতো। পুলিশের কোনো গাড়ি আসতেছে কিনা তা দেখতো।

প্রশ্ন: এরশাদ উল্লাহ ও নাজিমুর রহমানের নেতৃত্বে কেমন চলছে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপি?

উত্তর: আমার দৃষ্টিতে এরশাদ উল্লাহ ও নাজিমুর রহমান ভালো পারফর্ম করছেন। তারা দক্ষতার সঙ্গে সংগঠনকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। সফলভাবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের নেতৃত্বে দলীয় কর্মসূচিগুলো স্বতস্ফূর্তভাবে পালিত হচ্ছে।

প্রশ্ন: সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক ডা. শাহাদাত হোসেনকে নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?

উত্তর: উনি একজন স্মার্ট, ভদ্র ও শিক্ষিত মানুষ। কিন্তু কর্পোরেশনের যেকোনো কাজ উনি নিজের হাতে করতে চান। নিজের হাতে তো আপনি অনেক কিছু করতে পারবেন না। উনি প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করছেন। প্রতিটা ওয়ার্ডে নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য উনি চাইলে প্রশাসনের লোকদের দিয়ে কাজ করাতে পারেন, আবার প্রতিটা ওয়ার্ডে দলীয় নেতাকর্মীদের দিয়ে কাজ করাতে পারেন। উনি এটা করলে সাধারণ মানুষ উপকৃত হতো। কিন্তু উনি সেটা করছেন না।

প্রশ্ন: নগর ভবনে মেয়রের (বর্তমানে প্রশাসক) কার্যালয়ে তো প্রতিনিয়ত বিএনপি নেতাকর্মীদের ভিড় লেগে থাকে। ডা. শাহাদাত কি নেতাকর্মীদের রাজনৈতিক সুবিধা দিচ্ছেন না?

উত্তর: উনার কার্যালয়ে নেতাকর্মীদের ভিড় থাকলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। আপনি যদি মাঠ পর্যায়ে প্রতিটা ওয়ার্ডে গিয়ে খবর নেন তাহলে দেখবেন দলীয় নেতাকর্মীরা শাহাদাত ভাইয়ের ওপর ক্ষুব্ধ। কারণ শাহাদাত ভাই নেতাকর্মীদের যথাযথ মূল্যায়ন করেন না। উনার কার্যালয়ে গিয়ে অনেক নেতাকর্মী ঢুকতে পারেন না, উনার কাছে যেতে পারেন না। অনেক নেতাকর্মী কাজের জন্য উনার কাছে যান কিন্তু উনি সেটা করেন না। হয়তো তার পছন্দের কিছু নেতাকর্মীকে তিনি কাজ দেন কিন্তু সব নেতাকর্মী উনার কাছে গিয়ে রাজনৈতিকভাবে সুবিধা পায় বলে আমার মনে হয় না।

প্রশ্ন: ৪১টি ওয়ার্ডে কাউন্সিলর নেই। গত দুই বছর ধরে নগরীর সাধারণ মানুষ নাগরিক সেবা পেতে পদে পদে ভোগান্তিতে পড়ছেন। বিষয়টা কীভাবে দেখছেন?

উত্তর: এতো বড় একটা শহরে একজন লোক সিটি কর্পোরেশনে বসে কিংবা গাড়িতে চড়ে এলাকায় এলাকায় গিয়ে কাজ করা কখনো সম্ভব না। ডা. শাহাদাত ভাই চাইলে প্রতিটা ওয়ার্ডে বিএনপির সাবেক কাউন্সিলর কিংবা গত সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে যারা কাউন্সিলর প্রার্থী ছিলেন তাদেরকে নাগরিক সমস্যা তদারকির দায়িত্ব দিতে পারতেন। এতে সাধারণ মানুষ ভোগান্তি থেকে রেহাই পেতেন। কিন্তু উনি এই কাজটা কেন করেননি বা করছেন না তা আমি জানি না। তবে এই কাজটা করলে উনার সুনাম হতো। উনি কি এককভাবে ক্ষমতা উপভোগ করার জন্য ওয়ার্ডে কাউকে দায়িত্ব দিচ্ছেন না তা আমি জানি না। সেটা যদি হয়ে থাকে তাহলে আগামী নির্বাচনে ক্ষতিটা উনারই হবে।

প্রশ্ন: আগামী চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিএনপির চেয়ারম্যান নতুন কাউকে মেয়র প্রার্থী করবেন বলে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। নগর বিএনপির সদস্য সচিব নাজিমুর রহমান ও একজন এমপি মনোনয়ন চাওয়ার কথা শোনা যাচ্ছে। পাশাপাশি ব্যবসায়ী নেতা আমির হুমায়ুন মাহমুদ চৌধুরীর কথাও আলোচনায় আছে। বিষয়টা নিয়ে আপনার ভাবনা কী?

উত্তর: নাজিমুর রহমান কিংবা যে কেউ মেয়র পদে মনোনয়ন চাইতে পারেন। নাজিমুর রহমান একজন ক্লিন ইমেজের নেতা। তিনি তৃণমূল থেকে আজকে এ অবস্থানে এসেছেন। তবে কোনো এমপি মেয়র পদে মনোনয়ন চাওয়ার বিষয়টা আমি সমর্থন করি না। কারণ যিনি এমপি তিনি প্রতিমন্ত্রী কিংবা মন্ত্রী হওয়ার জন্য চেষ্টা করতে পারেন। তিনি কেন এমপি পদ ছেড়ে মেয়র পদে মনোনয়ন চাইবেন? আর আমির হুমায়ুন সাহেব একজন প্রজ্ঞাবান মানুষ। উনি প্রশাসনিক কাজ খুব ভালো বুঝেন। উনার বড় ভাই অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর চট্টগ্রামে একটা শক্ত অবস্থান আছে। ফলে আমির হুমায়ুন সাহেবকে মেয়র প্রার্থী করলে খারাপ হবে বলে মনে হয় না।

প্রশ্ন: আপনি প্রথমবার নির্বাচন করে চিটাগাং চেম্বার অব কমার্সের সহসভাপতি হয়েছেন কীভাবে?

উত্তর: এটা আশ্চর্যজনক বিষয়। আমি পরিচালক প্রার্থী ছিলাম। নির্বাচন শেষে সন্ধ্যায় ফলাফল ঘোষণা পর্যন্ত আমি ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে ছিলাম। পরিচালক নির্বাচিত হওয়ার পর সেখান থেকে বাসায় চলে যাই। কিন্তু ফল ঘোষণার পর রাতে চেম্বারে ভাইস প্রেসিডেন্ট নিয়ে একটা পলিটিক্স হচ্ছিলো। তবে ভাইস প্রেসিডেন্ট নিয়োগ প্রক্রিয়ার মধ্যে আমি ছিলাম না। ওইদিন রাতে মেহেদীবাগে আমীর হুমায়ুন চৌধুরীর বাসায় একটি বৈঠক হয়। পরদিন সকালে চেম্বারের নির্বাচিত একজন পরিচালক আমাকে ফোন করে জানান, আমীর হুমায়ুন চৌধুরীর বাসায় বৈঠকে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে আমাকে সিলেকশন করা হয়েছে। এটা শুনে আমি হতবাক হয়ে যাই। অথচ এই পদের জন্য আমি কারও কাছে কোনো তদবির করিনি।

প্রশ্ন: চট্টগ্রামের খ্যাতনামা শিল্পপ্রতিষ্ঠান সীকম গ্রুপের চেয়ারম্যান আমিরুল হকের নেতৃত্বে কেমন চলছে চিটাগাং চেম্বার?

উত্তর: উনি একজন সফল ব্যবসায়ী। একজন ডায়নামিক লিডার। উনার প্রতিটা জিনিসের মধ্যে আধুনিকতার ছোঁয়া আছে। উনার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা অনেক বেশি। উনি বুঝে শুনে সিদ্ধান্ত নেন। গত পাঁচ মাসে আমি দেখেছি, উনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে চেম্বারকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

প্রশ্ন: চেম্বারের নির্বাচনের আগে আপনি বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশন নির্বাচনে ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। নির্বাচনের সময় আপনাদের ‘ঐক্য পরিষদ’ প্যানেলের প্রার্থীদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিলো। আপনারা অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃত্বে এসে গত ৬ মাসে কী পরিবর্তন এনেছেন?

উত্তর: গত ৬ মাসে আমরা সবচেয়ে বড় যে পরিবর্তনটা এনেছি সেটা হলো শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করেছি। গত ১৬ বছরে আওয়ামী লীগের শাসনামলে যারা নেতৃত্বে ছিলেন তারা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অনেক মালিকের ব্যবসা বাগিয়ে নিয়েছিলেন। গত ৬ মাসে কোনো শিপিং এজেন্সির মালিক বলতে পারবেন না যে, অ্যাসোসিয়েশনের কেউ রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ব্যবসা বাগিয়ে নিয়েছেন।

প্রশ্ন: আপনি একসময় ফুটবলার ছিলেন। এরপর খেলোয়াড় থেকে ক্রীড়া সংগঠক হয়ে ওঠেন। খেলোয়াড় ও ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে নিজেকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

উত্তর: আমি দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে খেলাধুলার সঙ্গে জড়িত। আমি ছোটবেলায় চট্টগ্রাম লীগে খেলেছি। ২০০১ সালে আমি চট্টগ্রাম মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের ফুটবল কমিটির চেয়ারম্যান হই। দীর্ঘ আট বছর আমি এই দায়িত্বে ছিলাম। এরপর আমি তিন বছর মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব ব্লুজের প্রেসিডেন্ট ছিলাম। তিন বছরে আমি মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব ব্লুজকে ৮টি শিরোপা এনে দিয়েছি। এরপর আমি মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব ছেড়ে নিজে একটা ক্লাব গড়ে তুলি। এটার নাম হলো কেএম স্পোর্টিং ক্লাব।

প্রশ্ন: আপনি একাধারে রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও ক্রীড়া সংগঠক। কোনটা বেশি উপভোগ করেন?

ডা. শাহাদাতের দিকে অভিযোগের তীর ছুড়লেন বিএনপি নেতা স্বপন

উত্তর: খেলাধুলা। রাজনীতি ও ব্যবসার চেয়ে খেলাধুলা আমার বেশি ভালো লাগে। খেলাধুলা আমার কাছে নেশা হয়ে গেছে। আমি এখনো প্রতিদিন ভোরে সিআরবিতে ফুটবল খেলতে যাই।

রাজনীতি সংবাদ: আপনাকে অনেক ধন্যবাদ

মশিউল আলম স্বপন: আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ।

Rajniti Sangbad


আরও খবর