রাজনীতি সংবাদ প্রতিবেদক
প্রকাশের সময় : ১০ মে ২০২৬, ১০:০২ পূর্বাহ্ণ
এম এ আজিজ। বয়স ৬৮ বছর। চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক। তার রাজনীতির পথচলা শুরু হয়েছিল ছাত্র ইউনিয়ন দিয়ে। ১৯৬৯ সালের আইয়ুববিরোধী ছাত্র আন্দোলনে স্লোগান দিয়ে রাজপথ কাঁপিয়েছিলেন তিনি। ১০ বছর পর ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গ ত্যাগ করে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে যান তিনি। এরপর রাজনীতির মাঠে নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে নিজেকে একজন পরিণত নেতায় পরিণত করেন।
চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গনে একজন ত্যাগী ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির নেতা হিসেবে পরিচিত এম এ আজিজ। নগর বিএনপির সভা-সমাবেশে তার রসালো বক্তব্য নেতাকর্মীদের আকৃষ্ট করে। তবে তিনি প্রচারবিমুখ। ছাত্র ইউনিয়ন থেকে বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হওয়া, নগর বিএনপির বর্তমান হালচাল ও আসন্ন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন নিয়ে তার সঙ্গে কথা বলেছেন রাজনীতি সংবাদের সম্পাদক সালাহ উদ্দিন সায়েম।
রাজনীতি সংবাদ: আপনি কত বছর ধরে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত আছেন?
এম এ আজিজ: ৩৪ বছর।
প্রশ্ন: আপনি রাজনীতিতে আসলেন কীভাবে?
উত্তর: আমি যখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ি, তখন থেকেই রাজনীতিতে আমার হাতেখড়ি। আমি তখন ছাত্র ইউনিয়ন করতাম। দীর্ঘ প্রায় ১০ বছর আমি ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতি করেছি। এরপর বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হই।
প্রশ্ন: ছাত্র ইউনিয়ন থেকে কীভাবে বিএনপির রাজনীতিতে জড়িয়ে গেলেন?
উত্তর: এর পেছনে একটা কাহিনী আছে। ১৯৮০ সালের দিকে আমি একদিন ট্রেনে করে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় যাচ্ছিলাম। ট্রেনে সাপ্তাহিক বিচিত্রায় আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য কর্নেল (অব.) শওকত আলীর সাক্ষাৎকার পড়ছিলাম। সাক্ষাৎকারে তার কাছে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, শেখ মুজিব ও জিয়াউর রহমান সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়। জিয়াউর রহমান সম্পর্কে তিনি মন্তব্য করেছিলেন এভাবে-‘পৃথিবী সার্বক্ষণিক রাহুর ছায়ায় নিমজ্জিত। পৃথিবী বছরে একবার কিছুক্ষণের জন্য রাহুমুক্ত হয়। ওই সময়ে যে ছেলেটা ভূমিষ্ট হয় তার কাজে স্বয়ং বিধাতাও বাধা দিয়ে রাখতে পারে না। আমার মনে হয় জিয়াউর রহমান ওই সময়ে জন্মগ্রহণ করেছেন।’ এ কথার মাধ্যমে কর্নেল (অব.) শওকত আলী বুঝাতে চেয়েছেন, জিয়াউর রহমান উপযুক্ত না হয়েও অনেক কিছু অর্জন করেছেন। তিনি যেটা চেয়েছেন সেটা করেছেন। তিনি ভাগ্যবান মানুষ ছিলেন। তার এই মন্তব্য পড়ে আমি জিয়াউর রহমানের আদর্শের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হই। আমি মনে করি, জিয়াউর রহমানের মতো একজন সৎ রাষ্ট্রনায়ক এই বাংলাদেশের জন্য আশীর্বাদ ছিলেন।
প্রশ্ন: আপনি বিএনপির রাজনীতির শুরু থেকে এ পর্যন্ত কোন কোন পদে ছিলেন?
উত্তর: প্রথমে আমি ১৯৯০ সালে ৩৮ নম্বর দক্ষিণ মধ্যম হালিশহর ওয়ার্ডের মেহের আফজল ইউনিট বিএনপির সভাপতি ছিলাম। এরপর ৩৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি নির্বাচিত হই। তখন বৃহত্তর বন্দর থানা বিএনপির সভাপতি ছিলেন রোজী কবিরের স্বামী হুমায়ুন কবির আর সাধারণ সম্পাদক ছিলেন শাহাদাত হোসেন সেলিম, যিনি এখন লক্ষ্মীপুর-১ আসন থেকে এমপি হয়েছেন। তারা সংসদ সদস্য এ এম জহিরউদ্দিন খানের অনুসারী ছিলেন। এরপর ১৯৯৬ সালে বৃহত্তর বন্দর থানা বিএনপির সভাপতি হন মোহাম্মদ মিয়া ভোলা আর আমি সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হই। তখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর বৃহত্তর বন্দর থানাকে দুই ভাগ করে। বন্দর ও পতেঙ্গা। তখন আমাকে বন্দর থানা আর মোহাম্মদ মিয়া ভোলাকে পতেঙ্গা থানা বিএনপির সভাপতি করা হয়। পরে আমি বন্দর থানা বিএনপির আহ্বায়ক হই। পরে আবার সম্মেলনের মাধ্যমে সভাপতি নির্বাচিত হই।
প্রশ্ন: তখন আপনি বিএনপির কোন নেতার অনুসারী ছিলেন?
উত্তর: তখন আমি আবদুল্লাহ আল নোমানের অনুসারী ছিলাম।
প্রশ্ন: মহানগর বিএনপির রাজনীতিতে প্রবেশ করলেন কখন?
উত্তর: ২০০৮ সালে। তখন আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত ১৪ সদস্য বিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটেতে আমাকে যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়। এরপর ২০০৯ সালে আমির খসরু-ডা. শাহাদাতের কমিটিতে সহসভাপতি হই। এরপর ২০১৬ সালে শাহাদাত-বক্করের কমিটিতেও আমাকে সহসভাপতি করা হয়। এরপর ২০২০ সালে শাহাদাত-বক্করের আহ্বায়ক কমিটি যুগ্ম আহ্বায়ক হই। এরপর ২০২১ সালের ২৯ মার্চ ডা. শাহাদাত গ্রেপ্তার হলে ১ মে আমাকে মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়কের দায়িত্ব দেওয়া হয়। সর্বশেষ ২০২৪ সালে এরশাদ উল্লাহ-নাজিমুর রহমানের কমিটিতে আমাকে যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়।
প্রশ্ন: আপনি দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে মহানগর বিএনপির রাজনীতি করছেন। কিন্তু এখনো নেতৃত্বে আসতে পারেননি। সহসভাপতি বা যুগ্ম আহ্বায়কের গণ্ডি থেকে বের হতে পারেননি। নেতৃত্ব দেওয়ার আগ্রহ কি নেই?
উত্তর: অবশ্যই আগ্রহ আছে। সামনে মহানগর বিএনপির কমিটি হলে আমি সভাপতি বা আহ্বায়ক পদে প্রার্থী হবো। নগর বিএনপিকে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা আমার রয়েছে। আমি নেতৃত্বের আসনে বসলে নগর বিএনপিকে একটি শক্তিশালী সংগঠন হিসেবে গড়ে তুলবো।
প্রশ্ন: নগর বিএনপি কি এখন শক্তিশালী সংগঠন নয়?
উত্তর: না। আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহ এমপি হওয়ার পর নগর বিএনপি দুর্বল হয়ে পড়েছে। তিনি এখন সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে খুব একটা একটিভ নেই। সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সময় দিতে পারছেন না। সদস্য সচিব নাজিমুর রহমান একা টেনে নিয়ে যেতে পারছেন না। তবে এরশাদ উল্লাহ ও নাজিমুর রহমান সৌভাগ্যবান। কারণ তাদেরকে রাজপথে ঘাম ঝরাতে হয়নি। তারা দায়িত্ব নেওয়ার ১ মাসের মাথায় আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। এরপর দল ক্ষমতায় চলে আসলো। তারা এখন নেতৃত্ব উপভোগ করছেন।
প্রশ্ন: তাহলে কি ডা. শাহাদাত হোসেন ও আবুল হাশেম বক্করকে নগর বিএনপির নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত সঠিক হয়নি বলে মনে করছেন?
উত্তর: তারা দলের দুঃসময়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন। অনেক কষ্ট করেছেন, শ্রম দিয়েছেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের শেষ মুহূর্তে তারা মনে হয় ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলেন। ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর ঢাকার নয়াপল্টনে বিএনপির মহাসমাবেশ কর্মসূচি পণ্ড হয়ে যাওয়ার পর পরদিন সারাদেশে হরতাল ঘোষণা করা হয়েছিল। চট্টগ্রামে হরতাল পালনের বিষয়ে দিকনির্দেশনা দিতে পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শাহাদাত-বক্করকে ফোন দিয়েছিলেন। কিন্তু তারা মহাসমাবেশে হামলার ঘটনার পর ফোন বন্ধ করে দেন। তখন তাদের ওপর প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন পার্টির চেয়ারম্যান। এ ছাড়া থানা-ওয়ার্ড কমিটি করতে না পারার কারণেও তাদের ওপর অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন পার্টির চেয়ারম্যান। মূলত এই দুই কারণে তাদেরকে নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
প্রশ্ন: আওয়ামী লীগের ১৬ বছরের শাসনামলে বিএনপির আন্দোলন-সংগ্রামে আপনাকে সবসময় রাজপথে দেখা গেছে। আপনার বিরুদ্ধে কয়টি মামলা হয়েছিল আর জেলে গিয়েছিলেন কয়বার?
উত্তর: মামলা হয়েছিল ৪৩টি আর জেলে গিয়েছিলাম তিনবার।
প্রশ্ন: চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের কর্মকাণ্ড কীভাবে দেখছেন?
উত্তর: তিনি ভালো করার জন্য চেষ্টা করছেন। কিন্তু কিছু কাজ নিয়ে মেয়রের বদনাম হচ্ছে। যেমন বাসা-বাড়ির ময়লা নিয়ে মানুষ মেয়রের বিরুদ্ধে সমালোচনা করছেন। প্রথমে দলীয় লোকজন দিয়ে ঠিকাদারি ব্যবস্থায় বাসা-বাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহের জন্য টাকা নেওয়ার সিদ্ধান্তটা সঠিক ছিল না। বিষয়টা নিয়ে সমালোচনার পর মেয়র ময়লার জন্য টাকা নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। কিন্তু শুনতেছি, এখনো নাকি ময়লার জন্য বিভিন্ন বাসা-বাড়ির মালিকদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হচ্ছে। আবার বিভিন্ন বাসা-বাড়ি থেকে পরিচ্ছন্ন কর্মীরা নিয়মিত ময়লা সংগ্রহ করছে না। বিষয়টা নিয়ে মানুষ মেয়রের ওপর প্রচন্ড ক্ষুব্ধ।
প্রশ্ন: গুঞ্জন উঠেছে, আগামী চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিএনপি মেয়র প্রার্থী পরিবর্তন করতে পারে। আমির হুমায়ুন মাহমুদ চৌধুরী কিংবা নাজিমুর রহমানকে প্রার্থী করার কথা শোনা যাচ্ছে। বিষয়টা আপনি কীভাবে দেখছেন।
উত্তর: আমির হুমায়ুন চৌধুরী হলেন আমীর খসরুর ছোট ভাই। আমীর খসরুর প্রত্যেকটা নির্বাচনে তিনি ‘থিংক ট্যাংক’ হিসেবে কাজ করেছেন। ২০১০ সালের সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মনজুর আলম আওয়ামী লীগের প্রার্থী মহিউদ্দিন চৌধুরীকে প্রায় ১ লাখ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করার পেছনে আমির হুমায়ুনের অনেক অবদান ছিল। তিনি একজন পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির মানুষ। উনাকে সবাই সম্মান করেন। কিন্তু তিনি তো বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত না। তবে দলের হাইকমান্ড চাইলে বিএনপির একজন সমর্থককেও প্রার্থী করতে পারেন। কিন্তু ডা. শাহাদাতের বিরুদ্ধে যদি গুরুতর কোনো অভিযোগ না থাকে, তাহলে তাকে পরিবর্তন করবে বলে আমার মনে হয় না। তবে দলের চেয়ারম্যানের যদি চট্টগ্রাম সিটি নিয়ে অন্য কোনো চিন্তা থাকে, সেক্ষেত্রে তিনি প্রার্থী পরিবর্তন করতে পারেন।
রাজনীতি সংবাদ: আপনাকে অনেক ধন্যবাদ
এম এ আজিজ: আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ।
আরও পড়ুন:
চট্টগ্রাম সিটির মেয়র পদে বিএনপিতে আলোচনায় দুই নাম
চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের প্রশাসক ও সিডিএ’র চেয়ারম্যান পদে আলোচনায় যারা
