চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ইজারার বিরুদ্ধে আন্দোলনকারী ১৫ কর্মচারীর বদলি ও বহিস্কারাদেশ প্রত্যাহার হয়েছে। কিন্তু তাদের কাঁধে এখনো ঝুলে আছে মামলা। এ নিয়ে তারা চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফুঁসে উঠছেন। বন্দর চেয়ারম্যানকে প্রত্যাহারের দাবিতে আন্দোলনে নামার পরিকল্পনা করছে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। এই পরিস্থিতিতে সংগঠনটির দুই সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকন ও হুমায়ুন কবিরকে গতকাল রোববার (১৫ মার্চ) দুপুরে নগরীতে একটি প্রভাবশালী গোয়েন্দা সংস্থার কার্যালয়ে ডেকে নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র রাজনীতি সংবাদকে এ তথ্য জানিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রটি জানায়, চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের দুই সমন্বয়কের সঙ্গে ওই গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের প্রায় ঘণ্টাব্যাপী আলোচনা হয়। চট্টগ্রাম বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে দুই সমন্বয়ককে বন্দর কর্তৃপক্ষকে সহযোগিতা করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকন কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তবে তিনি রাজনীতি সংবাদকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যান এস এম মনিরুজ্জামানকে এখান থেকে প্রত্যাহার করতে হবে। তার কারণে বন্দরের চেইন অব কমান্ড ভেঙে গেছে। তিনি বন্দরের দায়িত্বে থাকলে অপারেশনাল কার্যক্রম স্বাভাবিক থাকবে না। এ ছাড়া অপারেশনাল কার্যক্রম স্বাভাবিক করতে হলে বন্দরের কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলা প্রত্যাহার করতে হবে।’
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এনসিটি ইজারার বিরুদ্ধে আন্দোলনকারী শ্রমিকদের বিরুদ্ধে বন্দর চেয়ারম্যান বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ায় তার ওপর চরম ক্ষুব্ধ কর্মচারীরা। এ অবস্থায় কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলা প্রত্যাহার ও বন্দর চেয়ারম্যানকে প্রত্যাহারের দাবিতে আন্দোলনে নামার পরিকল্পনা করছে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ।
জানা গেছে, গত ৯ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাত আড়াইটায় চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ইজারার বিরুদ্ধে আন্দোলনকারী দুই সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকন ও হুমায়ুন কবিরসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে বন্দর থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা দায়ের করে বন্দর কর্তৃপক্ষ। বন্দরের ইন্ট্রাক্টর (টেকনিক্যাল) সাঈদ ইমাম বাদী হয়ে এ মামলা দায়ের করেন।
এ মামলা দায়ের হওয়ার আগে ওই দিন সন্ধ্যায় সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকনকে আটক করে র্যাব। কিন্তু গ্রেপ্তারের ১৯ ঘণ্টা পর তিনি আদালত থেকেই জামিনে মুক্তি পান। ইব্রাহিম খোকন ছাড়া আরও ৫ জনকে এ মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
এদিকে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের দুই সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকন ও হুমায়ুন কবিরসহ বন্দরের ১৫ কর্মচারীর বদলি ও ১৪ জনের সাময়িক বহিস্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়েছে।
বন্দর সূত্রে জানা গেছে, ২৬ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রধান নিরীক্ষা কর্মকর্তা মো. শাহজাহান স্বাক্ষরিত পৃথক পৃথক আদেশে ১৪ কর্মচারীর সাময়িক বহিস্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়। এরপর গত ৮ মার্চ নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব রাসনা শারমিন মিথির স্বাক্ষরিত এক আদেশে ১৫ কর্মচারীর বদলির আদেশ প্রত্যাহার করা হয়। এসব কর্মচারীদের বরখাস্তকালীন সময়কে ‘কর্তব্যরত’ হিসেবে গণ্য করা হয়।
বন্দর সূত্রে জানা গেছে, বদলি ও সাময়িক বহিস্কারাদেশ প্রত্যাহারের পর এসব কর্মচারীরা গত ৯ মার্চ চট্টগ্রাম বন্দরে তাদের আগের কর্মস্থলে যোগদান করেছেন।
এর আগে গত ২ ফেব্রুয়ারি এনসিটি ইজারার বিরুদ্ধে আন্দোলনকারী ১৫ কর্মচারীকে খুলনার মোংলা বন্দর ও পটুয়াখালীর পায়রা বন্দরে বদলি করে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। এরপর ৮ ফেব্রুয়ারি বদলি হওয়া ১৫ জনের মধ্যে ১৪ জনকে সাময়িক বরখাস্ত করে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
উল্লেখ্য, নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) আরব আমিরাতভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে গত ৩১ জানুয়ারি থেকে কর্মবিরতি পালন শুরু করে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। আন্দোলনের জেরে বন্দর কর্তৃপক্ষ কর্মচারীদের বদলি ও বরখাস্ত করলে ৪ ফেব্রুয়ারি থেকে লাগাতার কর্মবিরতি শুরু করে বন্দরের শ্রমিকরা। এর ফলে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যসহ বন্দরের প্রায় সব ধরনের অপারেশনাল কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
পরিস্থিতি সামাল দিতে গত ৫ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম বন্দরে আসেন তৎকালীন নৌপরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার এম সাখাওয়াত হোসেন। তিনি দফায় দফায় সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ দুদিনের জন্য আন্দোলন স্থগিতের ঘোষণা দেয়। তবে ওইদিন বন্দর কর্তৃপক্ষ আন্দোলনকারী শ্রমিকদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়। আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া ১৫ শ্রমিক নেতার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ তদন্তের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) আবেদন করে বন্দর কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি তারা যাতে দেশত্যাগ করতে না পারেন, সেজন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও সংস্থাগুলোকে অবহিত করার অনুরোধ করা হয়। এরপর তাদের বাসা বরাদ্দও বাতিল করা হয়।
এর প্রতিবাদে গত ৭ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে এনসিটি ইজারা চুক্তি বাতিলসহ চার দফা দাবিতে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট কর্মসূচির ডাক দেয় চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। তাদের বাকি তিনটি দাবি ছিল-বন্দরের বর্তমান চেয়ারম্যান এস এম মনিরুজ্জামানকে চেয়ারম্যান পদ থেকে প্রত্যাহার করা; বিগত আন্দোলনে যেসব কর্মচারীর বিরুদ্ধে বদলি, চার্জশিট, সাময়িক বরখাস্ত, পদাবনতিসহ নানাবিধ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে তা বাতিল করে প্রত্যেক কর্মচারীকে চট্টগ্রাম বন্দরের স্ব স্ব পদে পুনর্বহাল করা এবং আন্দোলনরত শ্রমিক নেতাদের বিরুদ্ধে মামলাসহ কোনোরূপ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না।
সংবাদ সম্মেলনের পরদিন ৮ ফেব্রুয়ারি সকাল থেকে বন্দরের বিভিন্ন জেটি, টার্মিনাল, কনটেইনার ডিপো, বহির্নোঙরসহ বন্দরের সব স্থানে কাজ বন্ধ করে দেয় শ্রমিকরা। কিন্তু ওই দিন সকাল থেকে শুরু হওয়া এই ধর্মঘট দিবাগত রাত সাড়ে ১২টায় স্থগিতের ঘোষণা দেয় সংগঠনটি। এরপর থেকে এনসিটি ইজারা ইস্যুতে আর আন্দোলনের মাঠে নামেনি চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ।
গত ৮ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি ইজারা চুক্তি হচ্ছে না। নির্বাচনের পর নতুন সরকার আসলে এই চুক্তির প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।
কিন্তু বিএনপি সরকার গঠনের পর এখনো পর্যন্ত ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি ইজারা চুক্তির প্রক্রিয়া নিয়ে অবস্থান স্পষ্ট করেনি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকন রাজনীতি সংবাদকে বলেন, ‘আমরা বিষয়টা পর্যবেক্ষণ করছি। কোনো অবস্থাতে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে এনসিটি ইজারা চুক্তি করতে পারবে না সরকার। চুক্তির প্রক্রিয়া শুরু হলে আমরা আবার আন্দোলনে নামবো।’
আরও পড়ুন:
ডা. শাহাদাত এখন কীভাবে মেয়র পদে আছেন?
৪ এপ্রিল চিটাগাং চেম্বারের নির্বাচন হচ্ছে না
চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি ও সিএমপি কমিশনার পদে নতুন মুখ
