আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ হয়েছে। বিএনপির প্রয়াত ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমানের তিন শিষ্য পল্টি নিয়ে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর দলে ভিড়েছেন।
এই তিন নেতা হলেন-নগর বিএনপির দুই যুগ্ম আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট আবদুস সাত্তার ও কাজী বেলাল উদ্দিন এবং নগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব জমির উদ্দিন নাহিদ। তারা প্রয়াত আবদুল্লাহ আল নোমানের শিষ্য হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
গত ১৭ অক্টোবর বিকেলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী তার মেহেদীবাগের বাসায় চট্টগ্রাম-১০ (হালিশহর-পাহাড়তলী-খুলশী) আসনের নেতাকর্মীদের নিয়ে এক মতবিনিময় সভার আয়োজন করেন। এতে নগর বিএনপির দুই যুগ্ম আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট আবদুস সাত্তার ও কাজী বেলাল উদ্দিন এবং নগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব জমির উদ্দিন নাহিদ অংশ নেন। শুধু তাই নয়, অ্যাডভোকেট আবদুস সাত্তার সভায় সভাপতিত্ব করেন। আলোচিত এই তিন নেতা ছাড়া নোমানের অনুসারী আরও অনেক নেতাকর্মী আমীর খসরুর সভায় ছুটে আসেন।
তবে সভায় সবার নজর কাড়েন আবদুস সাত্তার, কাজী বেলাল উদ্দিন এবং জমির উদ্দিন নাহিদ। কারণ নোমানের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। আমীর খসরুর এই নির্বাচনী সভায় প্রয়াত আবদুল্লাহ আল নোমানের এই তিন শিষ্যের উপস্থিতি দেখে নেতাকর্মীদের অনেকে বিস্মিত হন। তিন নেতা ‘পল্টি’ নেওয়ায় তাদেরকে নিয়ে নগর বিএনপিতে নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে।
আবদুল্লাহ আল নোমানের সঙ্গে দলের সভা-সমাবেশ ও আন্দোলন-সংগ্রামে ছায়ার মতো লেগে থাকতেন আবদুস সাত্তার, কাজী বেলাল উদ্দিন এবং জমির উদ্দিন নাহিদ। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি সাবেক মন্ত্রী আবদুল্লাহ আল নোমান মারা যান। নোমানের মৃত্যুর বছর না পেরোতেই ভোল পাল্টে পল্টি নিয়ে আমীর খসরুর সাথে ভিড়েছেন এই তিন নেতা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট আবদুস সাত্তার রাজনীতি সংবাদকে বলেন, ‘যেহেতু এখন নোমান ভাই নেই, তাই আমি খসরু ভাইয়ের সাথে ভিড়েছি।’
প্রশ্নের জবাবে এ বিএনপি নেতা বলেন, ‘সাঈদ আল নোমান (প্রয়াত আবদুল্লাহ আল নোমানের ছেলে) তো আমার নেতা না। উত্তরাধিকার সূত্রে কি নেতা হওয়া যায়? উত্তরাধিকার সূত্রে যদি নেতার ছেলে নেতা হয়, এমপির ছেলে এমপি হয়, তাহলে দলের নেতাকর্মীরা কি আঙ্গুল চুষবে?’
আবদুল্লাহ আল নোমানের অন্যতম শিষ্য ছিলেন নগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও নগর যুবদলের সাবেক সভাপতি কাজী বেলাল উদ্দিন। যিনি তিন মাস আগেও সাঈদ আল নোমানের সঙ্গে চট্টগ্রাম-১০ আসনে একটি কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিলেন। এই বিএনপি নেতা এখন ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে আমীর খসরুর সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক কাজী বেলাল উদ্দিন রাজনীতি সংবাদের কাছে দাবি করেন, ‘আমি এরশাদের আমল থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত নোমান ভাইয়ের গ্রুপ করতাম। এরপর থেকে আমি কোনো গ্রুপিং রাজনীতি করিনি।’
প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমার বাসা চট্টগ্রাম-১০ আসনের শুলকবহরে। সে হিসাবে ২০০৮ সালে জাতীয় নির্বাচনের সময় থেকে নোমান ভাইয়ের সাথে ছিলাম। তার অর্থ এই নয় যে, আমি নোমান ভাইয়ের গ্রুপ করতাম।’
অপর এক প্রশ্নের জবাবে কাজী বেলাল বলেন, ‘ওয়ান-ইলেভেনের সময় সক্রিয় থাকার কারণে আমাকে মহানগর যুবদলের সভাপতি করা হয়। আমাকে যুবদলের সভাপতি করার জন্য নোমান ভাই কোনো সুপারিশ করেননি। বরং আমীর খসরু তখন আমার জন্য সুপারিশ করেছিলেন।’
জানতে চাইলে নগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব জমির উদ্দিন নাহিদ রাজনীতি সংবাদকে বলেন, ‘খসরু ভাই দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য। তিনি আমাদেরকে দাওয়াত দিয়েছেন তাই গিয়েছি। শুধু চট্টগ্রাম-১০ আসন কেন, তিনি নগরীর যে কোনো আসনের নেতাকর্মীদের ডেকে পরামর্শ দিতে পারেন। আর দল যাকেই ধানের শীষের প্রতীক দেবে, আমরা সবাই মিলে তার সঙ্গে কাজ করবো।’
দলীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, চট্টগ্রাম-১০ (হালিশহর-পাহাড়তলী-খুলশী) আসনে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ‘গ্রিন সিগন্যাল’ পেয়েছেন। এ কারণে তিনি গত ১৭ অক্টোবর বিকেলে তার মেহেদীবাগের বাসায় চট্টগ্রাম-১০ আসনের বিএনপি নেতাকর্মীদের নিয়ে মতবিনিময় সভা করেন। শুধু তাই নয়, সভায় আমীর খসরু নেতাকর্মীদের ভোট কেন্দ্র কমিটি গঠনের নির্দেশও দিয়েছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট আবদুস সাত্তার রাজনীতি সংবাদকে বলেন, ‘‘তিনি (আমীর খসরু) ‘গ্রিন সিগন্যাল’ পেয়েছেন বলেই চট্টগ্রাম-১০ আসনের নেতাকর্মীদের নিয়ে মতবিনিময় সভা করেছেন। এমনকি সভায় তিনি নেতাকর্মীদের ভোট কেন্দ্র কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন।’’
এদিকে চট্টগ্রাম-১০ আসনের বিএনপি নেতাকর্মীদের নিয়ে আমীর খসরু সভা করার পরদিনই একই আসনের অনুসারীদের নিয়ে পাল্টা সভা করেন সাঈদ আল নোমান। নগরীর কাজীর দেউড়ি ভিআইপি টাওয়ারের বাসায় ১৮ অক্টোবর রাতে তিনি এই সভা করেন। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাঈদ আল নোমানও চট্টগ্রাম-১০ আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী।
প্রয়াত আবদুল্লাহ আল নোমানের সঙ্গে দীর্ঘ ৯ বছর ধরে মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব ছিল আমীর খসরুর। ২০১৬ সালে আমীর খসরুকে যখন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য করা হয়, তখন থেকে তার সঙ্গে দূরত্ব বাড়ে আবদুল্লাহ আল নোমানের। আমীর খসরু নগর বিএনপির সভা-সমাবেশে প্রধান অতিথি থাকলে তাতে অংশ নিতেন না নোমান। কয়েক বছর ধরে তাদের মধ্যে মুখ দেখাদেখিও বন্ধ ছিল। ২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনে আমীর খসরু চট্টগ্রাম-১০ (হালিশহর-পাহাড়তলী-খুলশী) আসন থেকে মনোনয়ন চেয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত খসরুকে ডিঙিয়ে নোমানই এই আসন থেকে ধানের শীষের প্রতীক পান।
বিএনপির প্রয়াত ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান এর আগে ১৯৯১ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত টানা তিনবার চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালী-বাকলিয়া) আসনে নির্বাচন করেন। এরমধ্যে ১৯৯১ সালে তার কাছে পরাস্ত হয়েছিলেন আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট প্রার্থী প্রয়াত সাবেক সিটি মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী। কিন্তু সাবেক মন্ত্রী নোমান ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনে মর্যাদাপূর্ণ এই আসন ছেড়ে চলে যান পাহাড়তলী-হালিশহরে। তখন কোতোয়ালী আসনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন পান শিল্পপতি শামসুল আলম। এরপর ২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনে কোতোয়ালী আসনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন পান সিটি মেয়র ও নগর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক ডা. শাহাদাত হোসেন। কিন্তু এবার তিনি নির্বাচন করবেন না। চট্টগ্রাম-৯ আসন থেকে এবার মনোনয়ন চাইবেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য শিল্পপতি শামসুল আলম, নগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান আহ্বায়ক কমিটির সদস্য আবুল হাশেম বক্কর এবং চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক আবু সুফিয়ান।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, চট্টগ্রাম-১০ (পাহাড়তলী-হালিশহর) আসনে যদি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত করা হয়, তাহলে সাঈদ আল নোমান চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালী-বাকলিয়া) আসন থেকে মনোনয়ন চাইতে পারেন।
আরও পড়ুন:
চট্টগ্রাম-৯ আসনে এবার কে হচ্ছেন বিএনপির প্রার্থী?
ইউনিভার্সিটি থেকে রাজনীতির মাঠে সাঈদ আল নোমান, নানা জল্পনা
চট্টগ্রামে অভিনব কায়দায় যুবদল নেতার চাঁদাবাজি ও জমি দখলের চেষ্টা
সমালোচনার মুখে চট্টগ্রামের সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন
