আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি এখনো প্রার্থী মনোনয়ন দেয়নি। কিন্তু অনেক নেতা ইতোমধ্যে দলটির হাইকমান্ডের ‘গ্রিন সিগন্যাল’ পেয়ে ভোটের মাঠে নেমে পড়েছেন। চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালী-বাকলিয়া) আসনে ভোটারদের দুয়ারে দুয়ারে ছুটছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য শিল্পপতি শামসুল আলম। দলের হাইকমান্ডের ‘গ্রিন সিগন্যাল’ পেয়েই কি ভোটের মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন এই বিএনপি নেতা?
গত ৬ বছর ধরে বিএনপির কোনো কর্মসূচিতে দেখা যায়নি চট্টগ্রামের খ্যাতনামা শিল্প প্রতিষ্ঠান মেসার্স ইলিয়াছ ব্রাদার্সের (এমইবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামসুল আলমকে। ২০১২ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত তিনি নগর বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি পদে ছিলেন। এর মধ্যে ২০১৬ সালে তিনি বিএনপি কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য পদেও স্থান পান। ২০১২ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বিএনপির সরকারবিরোধী আন্দোলনে রাজপথে সরব ছিলেন তিনি। তবে ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর আড়ালে চলে যান আলোচিত এই বিএনপি নেতা।
আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর গত বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর নগর বিএনপির কর্মসূচিতে প্রকাশ্যে দেখা যায় শামসুল আলমকে। সেদিন চট্টগ্রাম নগরীর আলমাস মোড়ে ‘বিশ্ব গণতন্ত্র দিবস’ উপলক্ষে চট্টগ্রাম বিভাগীয় বিএনপির সমাবেশে তিনি অংশ নেন। এরপর থেকে নগর বিএনপির কর্মসূচিতে আগের মতো সরব হয়েছেন তিনি।
সম্প্রতি চট্টগ্রাম-৯ আসনে নির্বাচনী তৎপরতা শুরু করেছেন সজ্জন, বিনয়ী ও পরিচ্ছন্ন নেতা হিসেবে পরিচিত শামসুল আলম। ভোটারদের কাছে টানতে ব্যতিক্রমধর্মী ‘উঠান বৈঠক’ কর্মসূচি শুরু করেছেন তিনি। তার এই কর্মসূচিতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নিচ্ছেন। এ পর্যন্ত তিনটি ‘উঠান বৈঠক’ কর্মসূচি করেছেন তিনি। এ বিএনপি নেতার এই ‘উঠান বৈঠক’ কর্মসূচি নিয়ে জনমনে কৌতূহল দেখা দিয়েছে।

চট্টগ্রাম-৯ আসনের বিএনপি নেতাদের অনেকে মনে করছেন, শামসুল আলম হয়তো গোপনে দলের হাইকমান্ড থেকে ‘গ্রিন সিগন্যাল’ পেয়েছেন। না হয় তিনি এভাবে আটঘাট বেঁধে ভোটের মাঠে নামতেন না।
তবে এই আসনে বিএনপির অন্য সম্ভাব্য প্রার্থীদের তেমন কোনো তৎপরতা নেই। এমনকি জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ডা. একেএম ফজলুল হকেরও নির্বাচনকেন্দ্রিক কোনো কার্যক্রম চোখে পড়ছে না।
‘উঠান বৈঠক’ কর্মসূচির বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য শামসুল আলম রাজনীতি সংবাদকে বলেন, ‘আমি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে এই কর্মসূচি শুরু করেছি। তিনি দলের সকল নেতাকর্মীকে প্রতিটি ভোটারের আস্থা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছেন। তাছাড়া এবারের নির্বাচন অনেক কঠিন হবে। মানুষ এবার যোগ্য প্রার্থী দেখে ভোট দেবে। এজন্যই আমি ভোটারদের কাছে ছুটে যাচ্ছি।’
মনোনয়নের বিষয়ে বিএনপির হাইকমান্ড থেকে কি ‘গ্রিন সিগন্যাল’ পেয়েছেন-এ প্রশ্নের জবাবে এই বিএনপি নেতা বলেন, ‘মনোনয়নের বিষয়ে আমি এখনো পর্যন্ত কোনো গ্রিন সিগন্যাল পাইনি। তবে বিএনপির হাইকমান্ড থেকে আমাকে মাঠে কাজ করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দলের জন্যই আমি ভোটারদের দুয়ারে দুয়ারে যাচ্ছি। মনোনয়ন না পেলেও দল যাকে প্রার্থী করবে তার জন্য কাজ করবো।’
দীর্ঘ ৬ বছর আপনাকে বিএনপির কর্মসূচিতে দেখা যায়নি, কোথায় ছিলেন-এ প্রশ্নের জবাবে শামসুল আলম বলেন, ‘ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার ১৬ বছর আমার ওপর মানসিকভাবে অত্যাচার করেছে। বিএনপির রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত থাকার কারণে আমার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে দিয়েছে। আমাকে গ্রেপ্তার করে ৭ মাস জেলে রাখা হয়। আমার ছেলে শোয়েব রিয়াদকে (ইলিয়াস বাদ্রার্সের গ্রুপের পরিচালক) সাতদিন গুম করে রাখা হয়। এমন পরিস্থিতিতে রাজনীতির মাঠে থাকা কি আমার পক্ষে সম্ভব ছিল? তখন যদি আমি প্রকাশ্যে বিএনপির রাজনীতিতে সম্পৃক্ত থাকতাম, হয়তো আমাকেও গুম করে ফেলতো। কিছুদিন পরপর আমাকে স্থান বদল করে থাকতে হতো।’
জানা গেছে, শামসুল আলমের বিরুদ্ধে কয়েকটি ঋণখেলাপির মামলা রয়েছে। আর ঋণখেলাপিরা আগামী জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শামসুল আলম রাজনীতি সংবাদকে বলেন, ‘৫ আগস্টের পর আমি ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ঋণ নবায়ন করেছি। কাজেই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে আমার আর কোনো আইনগত বাধা নেই।’
৬৯ বছর বয়সী শামসুল আলম চট্টগ্রাম-৯ আসনের পূর্ব বাকলিয়া এলাকার বাসিন্দা। ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি কোতোয়ালী-বাকলিয়া আসনে বিএনপি থেকে প্রার্থী হয়েছিলেন। রাজনীতির মাঠে অচেনা মুখ শামসুল আলম প্রথমবারের মতো নির্বাচন করে আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট প্রার্থী নুরুল ইসলাম বিএসসির ঘাম ঝরিয়ে ফেলেন। ধানের শীষ প্রতীকে ১ লাখ ৯ হাজার ৪৮৪ ভোট পেয়েছিলেন শামসুল আলম। আর নৌকা প্রতীকে নুরুল ইসলাম বিএসসি পেয়েছিলেন ১ লাখ ৪০ হাজার ৪১১ ভোট।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোতোয়ালী-বাকলিয়া আসন থেকে শামসুল আলম ছাড়া আরও তিন বিএনপি নেতা মনোনয়ন চাইতে পারেন। এরা হলেন-নগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান আহ্বায়ক কমিটির সদস্য আবুল হাশেম বক্কর, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক আবু সুফিয়ান ও সাঈদ আল নোমান। তবে এই আসন থেকে এবার মনোনয়ন চাইবেন না সিটি মেয়র ও নগর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক ডা. শাহাদাত হোসেন। ২০১৮ সালের নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৯ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হয়েছিলেন তিনি।
দলীয় একটি সূত্র জানিয়েছে, ডা. শাহাদাত হোসেন এই মুহূর্তে মেয়রের পদ ছাড়তে চাইছেন না। তিনি আগামী সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও মেয়র প্রার্থী হতে চান। এজন্য তিনি আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৯ আসন থেকে মনোনয়ন চাইবেন না। তবে তিনি শামসুল আলমকে ‘সমর্থন’ দিয়েছেন।

সূত্রটি আরও বলেছে, চট্টগ্রাম-৯ আসনে আবুল হাশেম বক্কর মনোনয়ন প্রত্যাশী হলেও তাকে সমর্থন করছেন না ডা. শাহাদাত। কারণ তিনি মনে করছেন, বক্কর মনোনয়ন পেলে ওই আসনটি তার হাতছাড়া হয়ে যাবে। তাছাড়া বক্কর যদি এমপি হন তাহলে ওই আসনে একটা বলয় গড়ে তুলবেন। এতে ডা. শাহাদাতের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়বে। এই কারণে তিনি বক্করের চেয়ে শামসুল আলমকে নিরাপদ মনে করছেন।
এ বিষয়ে জানতে ডা. শাহাদাত হোসেনের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
ডা. শাহাদাত হোসেনের সমর্থনের বিষয়ে জানতে চাইলে শামসুল আলম রাজনীতি সংবাদকে বলেন, ‘তিনি (শাহাদাত) আমাকে সমর্থন দিয়েছেন কি না তা আমি বলতে পারবো না। তবে ডা. শাহাদাত মেয়র হওয়ার পর আমি তাকে শুভেচ্ছা জানাতে নগর ভবনে গিয়েছিলাম। তখন আমি তাকে নির্বাচনে মনোনয়ন চাওয়ার বিষয়টি অবহিত করি। তখন তিনি (শাহাদাত) আমাকে এই ব্যাপারে উৎসাহিত করেন।’
এদিকে চট্টগ্রাম-৯ আসনে আবু সুফিয়ানের প্রবেশ করা নিয়ে বিএনপি নেতাকর্মীদের কৌতূহল দেখা দিয়েছে।
জানা গেছে, আবু সুফিয়ান চট্টগ্রাম-৮ (চান্দগাঁ-বোয়ালখালী) আসন থেকে মনোনয়ন চাওয়ার পরিকল্পনা ছিল। ২০১৮ সালের নির্বাচনে ও ২০২০ সালের উপনির্বাচনে তিনি এই আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হয়েছিলেন। কিন্তু আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে আবু সুফিয়ানকে চট্টগ্রাম-৮ ছেড়ে চট্টগ্রাম-৯ আসন থেকে মনোনয়ন চাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
চট্টগ্রাম নগর বিএনপির দায়িত্বশীল একজন নেতা বিষয়টি নিশ্চিত করে রাজনীতি সংবাদকে বলেছেন, সপ্তাহ খানেক আগে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আবু সুফিয়ানের বিষয়ে এই নির্দেশ দেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আবু সুফিয়ান রাজনীতি সংবাদের কাছে কোনো মন্তব্য করেননি।
দলীয় একটি সূত্র জানিয়েছে, চট্টগ্রাম-৯ আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে শামসুল আলম এগিয়ে রয়েছেন। কারণ তিনি এই আসনে ২০০৮ সালে প্রার্থী হয়েছিলেন। আবু সুফিয়ানকে হয়তো শামসুল আলমের বিকল্প হিসেবে রাখা হতে পারে। যদি কোনো কারণে বাছাইয়ে শামসুল আলম ঝরে পড়েন, তাহলে হয়তো আবু সুফিয়ানের কপাল খুলে যেতে পারে।
সাঈদ আল নোমানের মনোনয়ন চাওয়ার পরিকল্পনা আছে চট্টগ্রাম-১০ (পাহাড়তলী-হালিশহর) আসনে। কিন্তু ওই আসনে যদি প্রার্থী হিসেবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে চূড়ান্ত করা হয়, তাহলে সাঈদ আল নোমান চট্টগ্রাম-৯ আসনে নজর দিতে পারেন বলে দলীয় একটি সূত্র জানিয়েছে।
সাঈদ আল নোমানের বাবা বিএনপির প্রয়াত ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান ১৯৯১ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত টানা তিনবার কোতোয়ালী আসনে নির্বাচন করেন। কিন্তু তিনি ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনে মর্যাদাপূর্ণ এই আসন ছেড়ে চলে যান পাহাড়তলী-হালিশহর আসনে।
আরও পড়ুন:
চট্টগ্রামে অভিনব কায়দায় যুবদল নেতার চাঁদাবাজি ও জমি দখলের চেষ্টা
সমালোচনার মুখে চট্টগ্রামের সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন
ইউনিভার্সিটি থেকে রাজনীতির মাঠে সাঈদ আল নোমান, নানা জল্পনা
