চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর-পতেঙ্গা) আসন থেকে লাফ দিয়ে চট্টগ্রাম-১০ (হালিশহর-পাহাড়তলী-খুলশী) আসনে এসেছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। গত ৩ নভেম্বর চট্টগ্রাম-১০ আসন থেকে বিএনপির প্রয়াত ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমানের সন্তান সাঈদ আল নোমানকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন তিনি। বাবার স্মৃতিবিজড়িত আসন হারিয়ে চোখের জল ফেলেছিলেন তরুণ নেতা সাঈদ আল নোমান। কিন্তু ভাগ্যে থাকলে ঠেকায় কে? এক মাসের মাথায় নাটকীয়ভাবে ভাগ্যের চাকা ঘুরে গেলো সাঈদ আল নোমানের। হাতছাড়া হয়ে যাওয়া আসনটি তার হাতের মুঠোয় এসে ধরা দিলো!
চট্টগ্রাম-১০ আসন থেকে আমীর খসরুকে সরিয়ে সাঈদ আল নোমানকে বসিয়ে দিয়েছে বিএনপি। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! অনেক লড়াই করে চট্টগ্রাম-১০ আসনে প্রথমে মনোনয়ন পেয়েও শেষ পর্যন্ত মনোনয়নপত্র পেলেন না বিএনপির প্রভাবশালী নেতা আমীর খসরু। তার হাত থেকে যেন মনোনয়নপত্র কেড়ে নিলেন একমাস আগে বঞ্চিত হওয়া সাঈদ আল নোমান! এজন্যই বলা হয়, রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই।
দলীয় একটি সূত্র জানিয়েছে, আমীর খসরু চট্টগ্রাম-১১ আসনে তার ছেলে ইসরাফিল খসরুর মনোনয়নের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এক নেতার পরিবার থেকে একজনকে প্রার্থী করার নীতিতে অটল থাকায় আমীর খসরুর পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। ইসরাফিল খসরুকে বাদ দিয়ে চট্টগ্রাম-১১ আসনে মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব নাজিমুর রহমানকে মনোনয়ন দিতে চেয়েছিলেন তারেক রহমান। কিন্তু তাতে আপত্তি করেন আমীর খসরু।
দলীয় সূত্রটি জানিয়েছে, আমীর খসরু নাজিমুর রহমানের বিরুদ্ধে আপত্তি তোলায় আসনটি নিয়ে বেকায়দায় পড়ে যান তারেক রহমান। এতে সুযোগ নেন সাঈদ আল নোমান। তিনি নীরবে দলীয় বিভিন্ন চ্যানেলে তদবির শুরু করেন। বিশেষ করে তিনি তার পিতার পরিচয় ও নিজের ব্যক্তিত্ব দিয়ে বিএনপির অনেক সিনিয়র নেতাকে আকৃষ্ট করেন। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তাকে অনেক পছন্দ করেন। বিএনপি মহাসচিব সাঈদ আল নোমানকে মনোনয়ন দেওয়ার জন্য দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের কাছে সুপারিশ করেছেন। এতে কপাল খুলে যায় সাঈদ আল নোমানের। তারেক রহমান শেষ পর্যন্ত চট্টগ্রাম-১০ আসনে সাঈদ আল নোমানকে বেছে নেন। আর আমীর খসরুকে ঘরের আসনে (চট্টগ্রাম-১১) পাঠিয়ে দেন।
সাঈদ আল নোমান গতকাল শনিবার (২৭ ডিসেম্বর) মনোনয়নপত্র হাতে পেলেও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এতে স্বাক্ষর করেছিলেন গত ২০ ডিসেম্বর।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, সাঈদ আল নোমান তার প্রয়াত বাবা আবদুল্লাহ আল নোমানের মতো নীরবে দাবার বোর্ডে শেষ চাল দিয়েছেন! চাল দিয়ে মনোনয়ন পাওয়ার বিষয়টা নিশ্চিত না হলেও তিনি দৃঢ় আশাবাদী ছিলেন। যে কারণে ২৫ ডিসেম্বর ঢাকার পূর্বাচল ৩০০ ফিট সড়কে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সংবর্ধনা সভায় তিনি শোডাউন করেছিলেন। এ সময় তাকে বেশ হাস্যোজ্জ্বল ও প্রাণবন্ত দেখা গেছে। তিনি হয়তো তখন মনোনয়ন পাওয়ার বিষয়টা আভাস পেয়েছিলেন। তবে আমীর খসরু তার আসনটি হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার খবর আগেই জেনেছেন।
চট্টগ্রাম-১১ আসন থেকে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। এরপর উপনির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হয়ে বিজয়ী হন আমীর খসরু। পরবর্তীতে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও জয়ী হন তিনি। তবে ২০০৮ ও ২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনে হেরে যান আমীর খসরু।
২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনে আমীর খসরু চট্টগ্রাম-১১ আসন থেকে লাফ দিয়ে চট্টগ্রাম-১০ আসনে এসে মনোনয়ন চেয়েছিলেন। তখন চট্টগ্রাম-১০ আসনে আমীর খসরুকে মনোনয়ন দেওয়ার বিষয়টি চূড়ান্তও হয়েছিলো। কিন্তু গোঁ ধরেন আবদুল্লাহ আল নোমান। চট্টগ্রাম-১০ আসনে মনোনয়ন না দিলে তিনি নির্বাচন করবেন না বলে বিএনপির হাইকমান্ডকে সাফ জানিয়ে দেন। শেষ পর্যন্ত আবদুল্লাহ আল নোমানের কাছে ধরাশায়ী হন আমীর খসরু। এবার নোমানের সন্তান সাঈদ আল নোমানের কাছেও ধরাশায়ী হলেন আমীর খসরু।
গতকাল সাঈদ আল নোমানের মনোনয়ন পাওয়ার খবরে তার কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে আনন্দের জোয়ার বইছে। চট্টগ্রাম-১০ আসনে তার কর্মীদের অনেকে মিষ্টি বিতরণও করেন। সাঈদ আল নোমানের অনেক কর্মী-সমর্থক আমীর খসরুকে ইঙ্গিত করে ফেসবুকে তির্যক মন্তব্য করেন। অপরদিকে চট্টগ্রাম-১০ আসনে আমীর খসরুর কর্মী-সমর্থকরা হতাশ হয়ে পড়েছেন। তাদের মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়েছে।
চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সাবেক যুগ্ম-আহবায়ক এস কে খোদা তোতন রাজনীতি সংবাদকে বলেন, ‘আজ আমাদের জন্য ঈদের দিন। চট্টগ্রাম-১০ আবদুল্লাহ আল নোমানের রেজিস্ট্রেশন করা আসন। আমীর খসরু এসে আসনটা দখল করেছিলো। তার কাছ থেকে আমরা আসনটা উদ্ধার করেছি।’
ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশন থেকে চট্টগ্রাম-১০ আসনের বিএনপি প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্রও নিয়েছেন আমীর খসরু। গত ১৭ অক্টোবর বিকেলে আমীর খসরু তার মেহেদীবাগের বাসায় চট্টগ্রাম-১০ আসনের নেতাকর্মীদের নিয়ে এক মতবিনিময় সভার আয়োজন করেছিলেন। এতে নগর বিএনপির দুই যুগ্ম আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট আবদুস সাত্তার ও কাজী বেলাল উদ্দিন এবং নগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব জমির উদ্দিন নাহিদসহ অসংখ্য নেতাকর্মী অংশ নেন। ওই সভায় আমীর খসরু চট্টগ্রাম-১০ আসনে কেন্দ্র কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছিলেন।
ওই সভায় অংশ নেওয়া এক বিএনপি নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাজনীতি সংবাদকে বলেন, আমীর খসরু বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারনী ফোরাম স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য। তার মতো একজন সম্মানিত নেতার কাছ থেকে আসন কেড়ে নেওয়া চরম অপমানজনক। দলের দুঃসময়ে সীমাহীন ত্যাগ স্বীকার করা এই নেতার কি এটাই প্রাপ্য ছিল?
ওই সভায় অংশ নেওয়া বিএনপির আরেক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাজনীতি সংবাদকে বলেন, আমীর খসরু কীভাবে এটা মেনে নিলেন? তার উচিত, নিজের আত্মসম্মানের দিকে তাকিয়ে চট্টগ্রাম-১১ আসনে নির্বাচন না করা।
সাঈদ আল নোমানের অনুসারী পাহাড়তলী এলাকার এক প্রবীণ বিএনপি নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাজনীতি সংবাদকে বলেন, গত ৩ নভেম্বর চট্টগ্রাম-১০ আসনে আমীর খসরুকে মনোনয়ন দেওয়ার পর আমরা হাল ছেড়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু সাঈদ আল নোমান আশা ছাড়েননি। আমীর খসরুর মতো একজন বাঘা নেতাকে তিনি এভাবে পরাস্ত করবেন, এটা আমরা কল্পনাও করিনি। একেই বলে নিয়তি!
আরও পড়ুন: চট্টগ্রামে পল্টি নিয়ে খসরুর দলে ভিড়লেন নোমানের তিন শিষ্য
