, | |

মূলপাতা আঞ্চলিক রাজনীতি

চট্টগ্রাম ১০ ও ১১ আসনে বিএনপির প্রার্থী হচ্ছেন কারা?


রাজনীতি সংবাদ প্রতিবেদক প্রকাশের সময় :২৮ অক্টোবর, ২০২৫ ১১:৩০ : পূর্বাহ্ণ

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১০ (হালিশহর-পাহাড়তলী-খুলশী) ও চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর-পতেঙ্গা-ডবলমুরিং) আসনে বিএনপির প্রার্থী মনোনয়নে চমক আসছে। দুটি আসনে নতুন মুখ আসছে। চট্টগ্রাম-১০ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেতে যাচ্ছেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। আর চট্টগ্রাম-১১ আসনে ধানের শীষের প্রতীক পেতে যাচ্ছেন চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব নাজিমুর রহমান।

বিএনপির নীতিনির্ধারক পর্যায়ের একজন নেতা রাজনীতি সংবাদকে এ তথ্য জানিয়েছেন।

বিস্ময়কর বিষয় হলো, চট্টগ্রাম-১১ আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে রাজনীতির মাঠে আলোচনায় নেই এক সময়ের আলোচিত ছাত্রনেতা নাজিমুর রহমান। নিজেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবেও ঘোষণা করেননি তিনি। নির্বাচন নিয়ে কোনো ‘টুঁ শব্দ’ও করছেন না। চুপচাপ বসে আছেন তিনি। গত ২৬ অক্টোবর ঢাকায় বিএনপির গুলশান কার্যালয়ে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে মনোনয়নপ্রত্যাশী নেতাদের বৈঠকেও তিনি অংশ নেননি। কিন্তু তলে তলে চট্টগ্রাম-১১ আসনে নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করে ফেলেছেন নগর বিএনপির এই সদস্য সচিব।

এই আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে প্রকাশ্যে আলোচনায় আছেন ইসরাফিল খসরু। তিনি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ছেলে। চট্টগ্রাম-১১ আসনের বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রচার আছে, ছেলে ইসরাফিল খসরুর জন্য আসনটি ছেড়ে দিয়েছেন আমীর খসরু। কিন্তু ইসরাফিল খসরুর আশায় গুড়ে বালি ছিটিয়ে দিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, এক নেতার পরিবার থেকে দুজনকে মনোনয়ন না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। কারণ এক নেতার পরিবার থেকে দুজনকে মনোনয়ন দেওয়া হলে দলের অন্য নেতারাও তাদের সন্তানের জন্য মনোনয়ন চাইবেন। এতে দলের মধ্যে কোন্দল সৃষ্টি হবে। যেহেতু আমীর খসরু চট্টগ্রাম-১০ আসনে মনোনয়ন চাইবেন, তাই তার ছেলে ইসরাফিল খসরুকে চট্টগ্রাম-১১ আসনে মনোনয়ন দেবেন না বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান।

চট্টগ্রামের ১৬টি আসনের মনোনয়নপ্রত্যাশীরা ধানের শীষের প্রতীক পেতে কেউ ঢাকায়, কেউ লন্ডনে দৌড়যাঁপ করছেন। কিন্তু ব্যতিক্রম নাজিমুর রহমান। নীরবতা পালন করছেন তিনি। এর রহস্য কী?

নাজিমুর রহমানের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র রাজনীতি সংবাদকে জানিয়েছে, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে ফোনে নিয়মিত যোগাযোগ হয় নাজিমুর রহমানের। মাস খানেক আগে তারেক রহমান তাকে চট্টগ্রাম-১১ আসনে ‘গ্রিন সিগন্যাল’ দিয়েছেন। তবে তাকে প্রার্থী ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত নীরব থাকতে বলেছেন।

এই বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব নাজিমুর রহমান এই প্রতিবেদককে কৌশলী জবাব দিলেন এভাবে-‘আমীর খসরু যেহেতু বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য, তাই তার প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে নীরবতা পালন করছি। বড় কিছু আদায় করার জন্য নীরব থাকতে হয়।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বিএনপির মনোনয়ন পেতে হলে দুটি যোগ্যতা লাগবে। একটা হলো, দলের জন্য ত্যাগ থাকতে হবে, আরেকটা হলো গ্রহণযোগ্যতা থাকতে হবে। আমি মনে করি, এই দুটি যোগ্যতা আমার রয়েছে।’

২০২৪ সালের ৭ জুলাই চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব নির্বাচিত হন নাজিমুর রহমান। নগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহ ও সদস্য সচিব নাজিমুর রহমান অল্প সময়ে ওয়ার্ড কমিটি গঠন করে তৃণমূলে দলকে সুসংগঠিত করেন। ১৯৯৪ সালে চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রদলের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন নাজিমুর রহমান। ২০০২ সালে ছাত্রদলের সভাপতি পদ থেকে বিদায় নেন। এরপর তিনি মহানগর বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হন। নাজিমুর রহমান নগরীর হালিশহর বড়পোল এলাকায় বসবাস করেন।

চট্টগ্রামের ১৬টি আসনের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্যের দিক থেকে চট্টগ্রাম-১১ আসনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে রয়েছে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর, দুটি ইপিজেড, বিমানবন্দর, নৌ-বিমান ঘাঁটিসহ জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। মর্যাদাপূর্ণ এই আসন থেকে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। এরপর উপনির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হয়ে বিজয়ী হন আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। পরবর্তীতে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও জয়ী হন তিনি। তবে ২০০৮ ও ২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনে হেরে যান আমীর খসরু।

আসন্ন সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১১ ছেড়ে চট্টগ্রাম-১০ আসনে পা রাখতে যাচ্ছেন সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী আমীর খসরু। এর আগে ২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনেও তিনি এই আসন থেকে মনোনয়ন পেতে আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আবদুল্লাহ আল নোমানই এই আসন থেকে ধানের শীষের প্রতীক পান। এর আগে ২০০৮ সালেও এই আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হয়েছিলেন তিনি। আবদুল্লাহ আল নোমানের মৃত্যুর পর ফাঁকা হয়ে যাওয়া চট্টগ্রাম-১০ আসন এবার নিজের কব্জায় নিতে যাচ্ছেন আমীর খসরু। যদিও তার পৈতৃক বাড়ি হলো নগরীর উত্তর কাট্টলী এলাকায়, যা চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) আসনের অন্তর্ভুক্ত।

কিন্তু আমীর খসরু কেন গুরুত্বপূর্ণ চট্টগ্রাম-১১ আসন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন? ওই আসনের বিএনপি নেতাদের কেউই এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাচ্ছেন না। চট্টগ্রাম-১১ ছেড়ে আমীর খসরু চলে যাওয়াতে তার অনুসারী নেতাকর্মীরা সবাই হতাশ হয়ে পড়েছেন।

এই বিষয়ে জানতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

বিএনপির নীতিনির্ধারক পর্যায়ের একজন নেতা রাজনীতি সংবাদকে জানান, আমীর খসরু এবার চট্টগ্রাম-১০ আসন থেকে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ইতোমধ্যে দলের হাইকমান্ড থেকে তাকে ‘গ্রিন সিগন্যাল’ দেওয়া হয়েছে।

‘গ্রিন সিগন্যাল’ পেয়েই গত ১৭ অক্টোবর বিকেলে নগরীর মেহেদীবাগের বাসায় চট্টগ্রাম-১০ আসনের নেতাকর্মীদের নিয়ে মতবিনিময় সভা করেন আমীর খসরু। ওই সভায় তিনি উপস্থিত নেতাকর্মীদের ভোট কেন্দ্র কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন।

চট্টগ্রাম-১০ আসনে বিএনপি থেকে আরও দুই নেতা মনোনয়নপ্রত্যাশী। এরা হলেন-চট্টগ্রাম মহানগর যুবদলের সাবেক সভাপতি মোশাররফ হোসেন দীপ্তি ও বিএনপির প্রয়াত ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমানের ছেলে সাঈদ আল নোমান। এর মধ্যে দীপ্তি ২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১০ আসনে ‘বিকল্প প্রার্থী’ হিসেবে মনোনয়ন পেয়েছিলেন।

বিএনপির নীতিনির্ধারক পর্যায়ের ওই নেতা রাজনীতি সংবাদকে জানান, মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে সাঈদ আল নোমান আলোচনায় থাকলেও তার মনোনয়ন পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। কারণ তিনি বিএনপির জন্য কোনো ত্যাগ স্বীকার করেননি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে তিনি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না। তার বাবা বিএনপির প্রয়াত ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান দলের জন্য ত্যাগ স্বীকার করেছেন বিধায় দল তাকে মূল্যায়ন করেছে। আবদুল্লাহ আল নোমানকে পাঁচটি সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিলো। এর মধ্যে দুবার এমপি হয়েছেন তিনি। সেই সাথে তাকে দুবার মন্ত্রীও করা হয়। ফলে এখন আবদুল্লাহ আল নোমানের ছেলেকে কী কারণে দল মূল্যায়ন করবে?

সাঈদ আল নোমানের কোনো সম্ভাবনা না থাকলেও ভাগ্য সহায় হলে আলোচিত যুবদল নেতা মোশাররফ হোসেন দীপ্তির কপাল খুলে যেতে পারে।

বিএনপির নীতিনির্ধারক পর্যায়ের ওই নেতা জানিয়েছেন, যদি আমীর খসরু কোনো কারণে শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে চট্টগ্রাম-১১ আসনে ফিরে যান, তাহলে যুবদল নেতা মোশাররফ হোসেন দীপ্তির ভাগ্য খুলে যেতে পারে। কারণ গত ১৭ বছর দলের আন্দোলন-সংগ্রামে তিনি অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এবার মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন করবেন।

আরও পড়ুন:

চট্টগ্রাম-৯ আসনে এবার কে হচ্ছেন বিএনপির প্রার্থী?

চট্টগ্রামে পল্টি নিয়ে খসরুর দলে ভিড়লেন নোমানের তিন শিষ্য

ইউনিভার্সিটি থেকে রাজনীতির মাঠে সাঈদ আল নোমান, নানা জল্পনা

চট্টগ্রামে অভিনব কায়দায় যুবদল নেতার চাঁদাবাজি ও জমি দখলের চেষ্টা

মন্তব্য করুন
Rajniti Sangbad


আরও খবর