মঞ্জুর আলম মঞ্জু, চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক। তার বাড়ি নগরীর উত্তর কাট্টলী এলাকায়। বিএনপি নেতাকর্মীদের কাছে ‘কাট্টলীর মঞ্জু’ নামে পরিচিত তিনি। চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির মধ্যম সারির এ নেতা ৪৩ লাখ টাকার প্রোটন এসইউভি গাড়িতে চলাফেরা করছেন। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর এই নেতার হঠাৎ এমন বিলাসবহুল গাড়িতে চলাফেরা করা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন দলটির নেতাকর্মীরা।
গত ১ সেপ্টেম্বর বিকেলে মঞ্জুর আলম মঞ্জু মালয়েশিয়ার প্রোটন ব্র্যান্ডের এক্স৭০ মডেলের গ্রে কালারের এসইউভি গাড়িতে চড়ে চট্টগ্রাম নগরীর পুরাতন রেলওয়ে স্টেশন চত্বরে মহানগর বিএনপির সমাবেশে হাজির হন। তার সঙ্গে আর কোনো নেতাকর্মী ছিলেন না। এ সময় সেখানে এ প্রতিবেদক উপস্থিত ছিলেন।

দেখা গেছে, মঞ্জুর আলম প্রোটন গাড়ি (রেজিস্ট্রেশন নাম্বার চট্ট মেট্রো-ঘ ১১-৫৩২৬) থেকে নেমে গায়ের হাফহাতা শার্ট পরিবর্তন করে গেঞ্জি পড়েন। এরপর তিনি বিএনপির সমাবেশের মঞ্চের দিকে চলে যান।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মঞ্জুর আলম মঞ্জু রাজনীতি সংবাদকে বলেন, ‘এই প্রোটন গাড়িটা আমার না, সীতাকুণ্ডের শীতলপুরের সোহেল রানা নামের এক ব্যবসায়ীর। তার কাছে আমি ১০ লাখ পেতাম। সে টাকা দিতে না পারায় ২০২২ সালের দিকে তার গাড়িটা আমি নিয়ে ফেলি।’
গত ৪ বছর ধরে আপনাকে এই গাড়িতে চলাফেরা করতে দেখা যায়নি-এ প্রশ্নের জবাবে এ বিএনপি নেতা বলেন, ‘তখন আমি গাড়িটা ব্যবহার করিনি। এটা তেলের গাড়ি বিধায় বাসায় ফেলে রেখেছিলাম। তখন আমি নিশান ব্র্যান্ডের জিপ গাড়ি ব্যবহার করতাম। এটা পিএইচপি গ্রুপ আমাকে উপহার দিয়েছে। এর আগে আমি ১৯৯৭ সালে প্রথম টয়োটা এলিয়ন কার কিনেছি।’
এক প্রশ্নের জবাবে মঞ্জুর আলম বলেন, ‘আমাদের যেসব নেতা আগে লক্কর-ঝক্কর গাড়ি চালাতেন, তাদের এখন দুই-তিনটা গাড়ি আছে। তবে আমি যখন গাড়ি চালাই, যারা এখন বিএনপির বড় বড় নেতা হয়েছেন, তারা তখন গাড়ি চালায়নি। তখন তারা সিএনজি অটোরিকশায় চলাফেরা করতেন।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সোহেল রানা মেসার্স নাহার এন্টারপ্রাইজ নামের একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের স্বত্ত্বাধিকারী। সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারিতে অবস্থিত এই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে স্ক্র্যাপ জাহাজের মালামাল বেচাকেনা হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সোহেল রানা রাজনীতি সংবাদকে বলেন, ‘২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে তিনি (মঞ্জুর আলম) আমার কাছ থেকে প্রোটন গাড়িটি নিয়ে ফেলেন। তবে আমাদের মধ্যে কী লেনদেন আছে তা আপনাকে বলতে চাই না।’
জানা গেছে, তখন প্রোটন এক্স৭০ মডেল গাড়ির বাজারমূল্য ছিল ৪৩ লাখ টাকা। মালয়েশিয়ার বিখ্যাত গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান প্রোটন ব্র্যান্ডের এই গাড়ি তখন বাংলাদেশে পিএইচপি অটোমোবাইলস তৈরি করেছিল।
মঞ্জুর আলম মঞ্জু বিএনপির দুই প্রভাবশালী নেতার অনুসারী। অর্থমন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আসলাম চৌধুরীর সঙ্গে রাজনীতি করেন তিনি।
চট্টগ্রাম নগর বিএনপির একজন যুগ্ম আহ্বায়ক নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাজনীতি সংবাদকে বলেন, আমীর খসরু ও আসলাম চৌধুরীর মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব থাকলেও মঞ্জুর আলম অত্যন্ত কৌশলে দুই নেতার সাথে ভারসাম্য রক্ষা করে চলেন।
এদিকে মঞ্জুর আলমের হঠাৎ ৪৩ লাখ টাকার বিলাসবহুল গাড়িতে চলাফেরা করা নিয়ে চট্টগ্রাম নগর বিএনপি নেতাকর্মীদের অনেকে বিস্মিত।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে নগরীর আকবর শাহ এলাকার এক যুবদল নেতা রাজনীতি সংবাদকে বলেন, বিএনপি সরকার গঠনের পর মঞ্জুর আলমকে আমরা বিলাসবহুল গাড়িতে চলাফেরা করতে দেখছি। মাত্র ছয় মাসের মধ্যে তিনি হুট করে কী এমন পেয়ে গেলেন? অথচ দল ক্ষমতায় আসার পরও তৃণমূলের অনেক নেতাকর্মী দুঃখ-কষ্টে জীবনযাপন করছেন।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব নাজিমুর রহমান রাজনীতি সংবাদকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের ১৬ বছরের শাসনামলে বিএনপির নেতাকর্মীরা স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেননি। অনেকে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারেননি। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিএনপির নেতাকর্মীরা ব্যবসা-বাণিজ্য করে হয়তো এখন কিছুটা স্বাচ্ছন্দবোধ করছেন। তবে কোনো নেতা যদি ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে অনৈতিক কাজ করেন তাতে দল ও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হবে।’
আরও পড়ুন:
চট্টগ্রাম সিটির মেয়র পদে বিএনপিতে আলোচনায় দুই নাম
চট্টগ্রামের বিএনপির ১৪ প্রার্থীকে কাউন্সিলর ঘোষণা না করায় হাইকোর্টের রুল
