, | |

মূলপাতা আঞ্চলিক রাজনীতি

এনসিপি থেকে মেয়র প্রার্থী হচ্ছেন মনজুর আলম


রাজনীতি সংবাদ প্রতিবেদক প্রকাশের সময় :১৬ এপ্রিল, ২০২৬ ৩:০৩ : অপরাহ্ণ

মোহাম্মদ মনজুর আলম। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র। তিনি চট্টগ্রামের একজন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী। রাজনীতিতে দলবদলে তিনি খুবই পারদর্শী। কখনো বিএনপির ডেরায়, আবার কখনো আওয়ামী লীগের ডেরায়। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে দ্রুত নিজের রং বদলে ফেলেন এই শিল্পপতি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে যান তিনি। এবার রাজনীতির তৃতীয় ইনিংস শুরু করতে যাচ্ছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সঙ্গে। আগামী চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে এনসিপি থেকে মেয়র প্রার্থী হচ্ছেন মোস্তফা-হাকিম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনজুর আলম। পহেলা বৈশাখের দিন এনসিপির কেন্দ্রীয় মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আবদুল্লাহর সঙ্গে নিজের বাসভবনে একান্ত বৈঠক করেন তিনি। সেই বৈঠকে এনসিপি থেকে মেয়র প্রার্থী হওয়ার বিষয়টি ‘প্রায় নিশ্চিত’ করে ফেলেছেন তিনি।

এনসিপি চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির যুগ্ম সমন্বয়কারী আরিফ মঈনুদ্দিন রাজনীতি সংবাদের কাছে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

এই এনসিপি নেতা বলেন, ‘মূলত মেয়র প্রার্থী নিয়ে আলোচনা করতে মনজুর আলমের বাসায় এসেছিলেন হাসনাত আবদুল্লাহ। তারা বিষয়টি নিয়ে একান্ত বৈঠক করেন। বৈঠকে মনজুর আলমের মেয়র প্রার্থীর বিষয়টা প্রায় চূড়ান্ত হয়েছে। দলীয়ভাবে একেবারে চূড়ান্ত হলে আমরা বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করবো।’

জানা গেছে, মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে এনসিপির কেন্দ্রীয় মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহর সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র মোহাম্মদ মনজুর আলম। বিকেল ৩টা থেকে সাড়ে ৫টা পর্যন্ত চট্টগ্রাম নগরীর উত্তর কাট্টলী এলাকায় মনজুর আলমের ‘এইচ এম ভিলা’ নামের বাসভবনে এই বৈঠক করেন হাসনাত আবদুল্লাহ।

এ বিষয়ে জানতে গতকাল বুধবার মোহাম্মদ মনজুর আলমের মোবাইল ফোনে কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। হাসনাত আবদুল্লাহর সঙ্গেও মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করে তাকে পাওয়া যায়নি।

হাসনাত আবদুল্লাহর সঙ্গে বৈঠকের পর মনজুর আলম গণমাধ্যমের কাছে এনসিপি থেকে মেয়র প্রার্থী হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেননি। তবে মনজুর আলম এনসিপি থেকে মেয়র প্রার্থী হতে চাওয়ার বিষয়টি তার পরিবারের এক সদস্য রাজনীতি সংবাদের কাছে স্বীকার করেছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মনজুর আলমের পরিবারের ওই সদস্য রাজনীতি সংবাদকে বলেন, তিনি (মনজুর আলম) এনসিপি থেকে মেয়র প্রার্থী হচ্ছেন এটা প্রায় নিশ্চিত। বিএনপি সরকারের রোষানলে পড়ার ভয়ে এখন কৌশলে তিনি এ বিষয়ে মুখ খুলছেন না। সিটি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হওয়ার পর তিনি এটা প্রকাশ করবেন।

এনসিপি মনজুর আলমকে কেন মেয়র প্রার্থী করছে-জানতে চাইলে এনসিপি চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির যুগ্ম সমন্বয়কারী আরিফ মঈনুদ্দিন বলেন, ‘তিনি (মনজুর আলম) একজন শক্তিশালী প্রার্থী, তাই আমরা তাকে বেছে নিয়েছি। আমরা বয়সে ছোট, রাজনীতিতেও আমাদের বয়স কম। আমরা পরিপক্ক হওয়ার আগে এবার সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ভোটের রাজনীতিতে অভিজ্ঞ ও আলোচিত ব্যক্তিকে মেয়র প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

মনজুর আলমের দলবদলের বিষয়ে জানতে চাইলে এই এনসিপি নেতা বলেন, ‘বিএনপির অনেক নেতা ছাত্র বয়সে কেউ ছাত্র ইউনিয়ন, কেউ ছাত্রলীগ করেছেন। দলটির নেতাদের কেউ কমিউনিস্ট পার্টি থেকে, কেউ আওয়ামী লীগ থেকে, কেউ জাতীয় পার্টি থেকে এসেছেন। কাজেই মানুষের রাজনৈতিক অবস্থান অবস্থা ও সময়ভেদে পরিবর্তন হতেই পারে।’

বিএনপির নেতাকর্মীরা মনজুর আলমকে ‘আওয়ামী লীগের দোষর’ আখ্যায়িত করা প্রসঙ্গে আরিফ মঈনুদ্দিন বলেন, ‘তারেক রহমান চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ) আসনে আওয়ামী লীগের দোষর জসিম উদ্দিনকে মনোনয়ন দিয়ে এমপি বানাইছেন না? আর গত সংসদ নির্বাচনে মনজুর আলম যখন সীতাকুণ্ড আসনের বিএনপি প্রার্থী আসলাম চৌধুরীর পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছিলেন তখন আওয়ামী লীগের দোষর ছিলেন না?’

বিএনপি থেকে ডা. শাহাদাত মেয়র প্রার্থী হলে মনজুর আলম কি বিজয়ী হতে পারবেন-এই প্রশ্নের জবাবে এই এনসিপি নেতা বলেন, ‘ডা. শাহাদাত মনজুর আলমের কাছে বিপুল ভোটে হারবেন। গত দেড় বছরে ডা. শাহাদাত কর্পোরেশনে লুটপাট করা ছাড়া কী করেছেন? তিনি পুরো শহর তার ছবি দিয়ে ঢেকে ফেলেছেন। ময়লার বিল নিয়ে মানুষকে হয়রানি করছেন। জন্মনিবন্ধন সনদ, জাতীয়তা সনদ, ওয়ারিশ সনদ নিয়ে মানুষকে চরম হয়রানি করা হচ্ছে। নগরবাসী কী কারণে তাকে ভোট দেবেন?’

জানা গেছে, হাসনাত আবদুল্লাহর সঙ্গে মনজুর আলমের বাসায় যান এনসিপির চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এ এস এম সুজা উদ্দিন ও এনসিপি চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা সমন্বয় কমিটির যুগ্ম সমন্বয়কারী মো. সাজ্জাদ হোসাইন। তবে মনজুর আলম একান্ত বৈঠক করেন হাসনাত আবদুল্লাহর সঙ্গে। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে তাদের মধ্যে বৈঠক চলে।

জানতে চাইলে এনসিপি চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা সমন্বয় কমিটির যুগ্ম সমন্বয়কারী মো. সাজ্জাদ হোসাইন রাজনীতি সংবাদকে বলেন, ‘এনসিপি গঠন হওয়ার পর থেকেই মনজুর আলম মেয়র প্রার্থী হওয়ার জন্য দলের কেন্দ্রীয় শীর্ষ নেতৃবৃন্দের সঙ্গে যোগাযোগ করে আসছেন। তিনি এনসিপি থেকে মেয়র প্রার্থী হবেন বলে আমরা আশাবাদী।’

বৈঠকে উপস্থিত একটি সূত্র রাজনীতি সংবাদকে জানিয়েছে, মনজুর আলম জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় হাসনাত আবদুল্লাহর নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করেন। এরপর এনসিপি নেতাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আমি পরিস্থিতির শিকার। দেশে তো তখন একনায়কতন্ত্র ছিল। আমি একজন ব্যবসায়ী। ব্যবসার স্বার্থে তখন আমি আওয়ামী লীগের সাথে সম্পর্ক রাখতে বাধ্য হয়েছিলাম। আমার ভাতিজা আওয়ামী লীগের এমপি হলেও আমি আওয়ামী লীগের রাজনীতি করিনি।

সূত্রটি জানায়, এরপর মনজুর আলম ২০১৫ সালের সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিএনপি থেকে মেয়র প্রার্থী পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা তুলে ধরে বলেন, ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা চর দখলের মতো কেন্দ্র দখল করেছিল। যদি সুষ্ঠু নির্বাচন হতো তাহলে আ জ ম নাছির আমার কাছে লক্ষাধিক ভোটের ব্যবধানে হারতো।

সূত্রটি জানিয়েছে, আগামী সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন প্রসঙ্গে এনসিপি নেতাদের উদ্দেশে মনজুর আলম বলেছেন, নির্বাচন সুষ্ঠু হলে নগরবাসী আবার আমাকে মেয়র নির্বাচিত করবেন। বিএনপি থেকে ডা. শাহাদাত মেয়র প্রার্থী হলে আমার কাছে লক্ষাধিক ভোটের ব্যবধানে হারবেন। ২০১০ সালের নির্বাচনে মহিউদ্দিন চৌধুরীর মতো নেতা আমার কাছে প্রায় ১ লাখ ভোটের ব্যবধানে হেরেছেন।

বৈঠকে উপস্থিত সূত্রটি জানিয়েছে, হাসনাত আবদুল্লাহসহ এনসিপি নেতাদের জন্য মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করেন মনজুর আলম। খাবারের মেন্যুতে ইলিশ মাছ, চিংড়ি, শুটকি মাছ, চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী মেজবানি গরুর মাংস, খাসির মাংসসহ ১৭ পদের আইটেম ছিল। হাসনাত আবদুল্লাহ মেজবানি গরুর মাংস তৃপ্তি সহকারে খান।

হাসনাত আবদুল্লাহসহ এনসিপি নেতারা বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে মনজুর আলমের বাসা থেকে বের হন। কিন্তু বাসা থেকে বের হয়ে স্থানীয় যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের তোপের মুখে পড়েন হাসনাত আবদুল্লাহ। মনজুর আলমের সাথে সাক্ষাতের বিষয় নিয়ে তার কাছে কাছে ব্যাখ্যা চান বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা। হাসনাত আবদুল্লাহকে প্রায় এক ঘণ্টার বেশি সময় অবরুদ্ধ করে রাখেন তারা। একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে উপস্থিত অন্য ব্যক্তিরা বিক্ষোভকারীদের শান্ত করার চেষ্টা করেন এবং হাসনাত আবদুল্লাহকে গাড়িতে তুলে দেন।

উল্লেখ্য, ২০১০ সালের সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে নিজের ‘রাজনৈতিক গুরু’ এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীকে প্রায় ৯৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে মেয়র হয়েছিলেন বিএনপি প্রার্থী মনজুর আলম। এরপর ২০১৫ সালের সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনেও তিনি বিএনপি থেকে মনোনয়ন পান। কিন্তু ভোট শুরুর তিন ঘণ্টার মাথায় ‘কারচুপির’ অভিযোগে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন তিনি। সেইসঙ্গে রাজনীতি থেকেও অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি।

কিন্তু এক বছর নীরব থাকার পর মনজুর আলম পরোক্ষভাবে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। এরপর ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১০ (পাহাড়তলী-হালিশহর) আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হতে দলীয় মনোনয়ন ফরম কিনেছিলেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ তাকে মনোনয়ন দেয়নি।

এরপর ২০২৩ সালে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনেও তিনি চট্টগ্রাম-১০ (হালিশহর-পাহাড়তলী) আসনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন চেয়ে বঞ্চিত হন। এরপর মনজুর আলম স্বতন্ত্র প্রার্থী পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মহিউদ্দিন বাচ্চু পেয়েছিলেন ৫৯ হাজার ২৪ ভোট। আর ফুলকপি প্রতীকে মনজুর আলম পেয়েছিলেন ৩৯ হাজার ৫৩৫ ভোট।

আরও পড়ুন:

চট্টগ্রামের বিএনপির ১৪ প্রার্থীকে কাউন্সিলর ঘোষণা না করায় হাইকোর্টের রুল

ডা. শাহাদাত এখন কীভাবে মেয়র পদে আছেন?

মন্তব্য করুন
Rajniti Sangbad


আরও খবর