আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর-পতেঙ্গা-ডবলমুরিং) আসনে প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে ‘চাপের মুখে’ পড়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এই আসনটি নিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে নানাভাবে ‘চাপাচাপি’ করছেন। এই আসনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য তার ছেলেকে প্রার্থী করতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। কিন্তু এবার সংসদ নির্বাচনে বিএনপি এক নেতার পরিবার থেকে একজনকে প্রার্থী করার নীতি অবলম্বন করেছে।
চট্টগ্রাম-১১ আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী রয়েছেন দুজন। এরা হলেন-নাজিমুর রহমান ও ইসরাফিল খসরু। নাজিমুর রহমান চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব। আর ইসরাফিল খসরু বিএনপির র স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ছেলে। তিনি বিএনপির আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক উপদেষ্টা কমিটির সদস্য। গত ৩ নভেম্বর ও ৪ ডিসেম্বর বিএনপি দুই দফায় ২৭২টি আসনে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। কিন্তু দুই ধাপে চট্টগ্রাম-১১ আসনে কাউকে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়নি। বন্দরনগরীর গুরুত্বপূর্ণ এই আসনে এখনো পর্যন্ত কাউকে প্রার্থী ঘোষণা না করায় বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে কৌতূহল দেখা দিয়েছে।
মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে কতটা আশাবাদী জানতে চাইলে নাজিমুর রহমান রাজনীতি সংবাদকে বলেন, ‘আমি তৃণমূল থেকে আজকের অবস্থানে উঠে এসেছি। আমার দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ার পর্যালোচনা করে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আমাকে নগর বিএনপির সদস্য সচিবের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়েছেন। তিনি একজন দূরদর্শী নেতা। তাই আমি আশা করছি, তিনি চট্টগ্রাম-১১ আসনে উপযুক্ত নেতার হাতেই ধানের শীষের প্রতীক তুলে দেবেন।’
এ বিষয়ে জানতে ইসরাফিল খসরুর মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
২০০৮ ও ২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১১ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হয়েছিলেন আমীর খসরু। কিন্তু এবারের সংসদ নির্বাচনে তিনি চট্টগ্রাম-১০ (হালিশহর-পাহাড়তলী-খুলশী) আসনে প্রার্থী হয়েছেন। ছেলে ইসরাফিল খসরুর জন্য চট্টগ্রাম-১১ আসনটি ছেড়ে দিয়েছেন তিনি। কিন্তু এবারের সংসদ নির্বাচনে বিএনপি এক নেতার পরিবার থেকে একজনকে প্রার্থী করেছে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. আব্দুল মঈন খান, মির্জা আব্বাস ও সালাহউদ্দিন আহমদ এবং ভাইস চেয়ারম্যান নিতাই রায় চৌধুরীর মতো সিনিয়র নেতাদের উত্তরসূরী কাউকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি।
ঠাকুরগাঁও-২ আসনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ভাই মির্জা ফয়সাল আমিন মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। তিনি জেলা বিএনপির সভাপতি। কিন্তু এই আসনে তাকে মনোনয়ন দেয়নি বিএনপি।
কুমিল্লা-২ আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের ছেলে ড. খন্দকার মারুফ হোসেন। কিন্তু তিনি মনোনয়নবঞ্চিত হন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য ড. আব্দুল মঈন খানের মেয়ে নরসিংদীর একটি আসনে মনোনয়ন চেয়েছিলেন। কিন্তু কপালে মনোনয়ন জুটেনি।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য মির্জা আব্বাসের স্ত্রী ও বিএনপির মহিলা দলের সভানেত্রী আফরোজা আব্বাস ঢাকা-৯ আসনে মনোনয়নের আশায় বুক বেঁধেছিলেন। কিন্তু মনোনয়ন তালিকায় স্থান পাননি তিনি।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদের স্ত্রী হাসিনা আহমদও মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। তিনি ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনে কক্সবাজার-১ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু এবারের সংসদ নির্বাচনে তিনি মনোনয়ন পাননি।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান নিতাই রায় চৌধুরীর মেয়ে ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের পুত্রবধূ নিপুণ রায় চৌধুরী ঢাকা-৩ আসন থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। কিন্তু মনোনয়নবঞ্চিত হন তিনি।
তবে বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে ব্যতিক্রম একটা ঘটনা ঘটেছে। টাঙ্গাইল-২ আসনে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুস সালাম পিন্টু ও টাঙ্গাইল-৫ আসনে তার ছোট ভাই বিএনপির কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকুকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। যা নিয়ে দলের নেতাকর্মীদের অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন।
বিএনপির কেন্দ্রীয় একজন নীতিনির্ধারক নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাজনীতি সংবাদকে জানিয়েছেন, আবদুস সালাম পিন্টু ও সুলতান সালাউদ্দিন টুকু দুজনই দলের জন্য সীমাহীন ত্যাগ স্বীকার করেছেন। এ কারণে তাদের ক্ষেত্রে এক নেতার পরিবার থেকে একজনকে প্রার্থী করার নীতি প্রযোজ্য হয়নি। আবদুস সালাম পিন্টু ১৭ বছর জেল কেটেছেন। আর ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ও যুবদলের সাবেক সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকু দলের আন্দোলন-সংগ্রাম করতে গিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের অমানবিক অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
দলীয় একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান চট্টগ্রাম-১১ আসনে ‘কৌশলগত কারণে’ প্রার্থী ঘোষণা করেননি। কারণ বিএনপির স্থায়ী কমিটির প্রভাবশালী এক সদস্য চট্টগ্রাম-১১ আসন নিয়ে তাকে বিভিন্ন মাধ্যমে চাপাচাপি করছেন। বিষয়টি নিয়ে তারেক রহমান ‘অস্বস্তিতে’ আছেন। চাপাচাপির বিষয়টা তিনি পছন্দ করছেন না। এক নেতার পরিবার থেকে একজনকে প্রার্থী করার নীতিতে তিনি অটল। দলের স্থায়ী কমিটির ওই সদস্যকে কোনো সুযোগ না দিতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শেষ মুহূর্তে ওই আসনে তার ‘গুডবুকে’ থাকা প্রার্থীর নাম ঘোষণা করবেন।
নির্ভরযোগ্য এই সূত্রটি জানায়, চট্টগ্রাম-১১ আসনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ‘গুডবুকে’ আছেন চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব ও এক সময়ের আলোচিত ছাত্রনেতা নাজিমুর রহমান। তিনি একজন পরিচ্ছন্ন, সজ্জন ও বিনয়ী নেতা। এ ছাড়া তিনি দক্ষ সংগঠকও। এসব ইতিবাচক গুণের কারণে তারেক রহমান তাকে পছন্দ করেন।
দলীয় আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, আমীর খসরুর ছেলে ইসরাফিল খসরুকে মনোনয়ন দিলে দলে তীব্র অর্ন্তকোন্দল সৃষ্টি হবে। বিএনপির যেসব সিনিয়র নেতা তাদের উত্তরসূরীদের জন্য মনোনয়ন চেয়ে বঞ্চিত হন তারা অসন্তুষ্ট হবেন। ইসরাফিল খসরুকে মনোনয়ন দিলে বিএনপির এসব সিনিয়র নেতারাও তাদের উত্তরসূরীদের জন্য মনোনয়ন চাইবেন। বিষয়টা অনুধাবন করে তারেক রহমান চট্টগ্রাম-১১ আসনের ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স অবস্থান নিয়েছেন। ফলে স্থায়ী কমিটির ওই সদস্য দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে চাপাচাপি করলেও টলাতে পারবেন না।
এদিকে ইসরাফিল খসরুর মনোনয়ন চাওয়া নিয়ে চট্টগ্রাম-১১ আসনের বিএনপির সিনিয়র নেতাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। আমীর খসরুর সাথে তাদের দূরত্ব তৈরি হয়েছে। এসব নেতারা কেউ এখন আমীর খসরুর মেহেদীবাগের বাসায় যাতায়াত করছেন না। তারা ইসরাফিল খসরুর কোনো সভায় অংশ নিচ্ছেন না। গত ৫ ডিসেম্বর বন্দর উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে ইসরাফিল খসরু যে ‘শোডাউন’ করেছিলেন সেখানে চট্টগ্রাম-১১ আসনের বিএনপির সিনিয়র নেতাদের কাউকে দেখা যায়নি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে চট্টগ্রাম-১১ আসনের বিএনপির এক সিনিয়র নেতা রাজনীতি সংবাদকে বলেন, আমীর খসরু নিঃসন্দেহে দলের জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন। কিন্তু তার ছেলে ইসরাফিল খসরু দলের জন্য কী ত্যাগ স্বীকার করেছেন? দলের আন্দোলন-সংগ্রামে তার তেমন কোনো ভূমিকা ছিল না। যে কারণে তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা হয়নি, জেলও খাটেননি। তাহলে কী কারণে দল তাকে মনোনয়ন দেবে? উত্তরাধিকার সূত্রে যদি এমপির ছেলে এমপি হয়, তাহলে আন্দোলন-সংগ্রামে ত্যাগ স্বীকার করা নেতাকর্মীরা কোথায় যাবে?
এদিকে চট্টগ্রাম-১১ আসনে পরীক্ষিত ও ত্যাগী নেতা হিসেবে নাজিমুর রহমানের সাথে ইসরাফিল খসরুর কোনো তুলনা হয় না বলে মনে করছেন বিএনপি নেতারা।
ইপিজেড থানা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক সরফরাজ কাদের চৌধুরী রাসেল রাজনীতি সংবাদকে বলেন, ‘নাজিমুর রহমান নিঃসন্দেহে তৃণমূল থেকে উঠে আসা একজন ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতা। তিনি দীর্ঘ দিন ধরে রাজপথে সক্রিয় থাকা একজন নেতা। তার অবদান ও অবস্থান আমি অন্য কারও সাথে তুলনা করতে চাই না।’
জানা গেছে, নাজিমুর রহমান ১৯৯৩ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রদলের নেতৃত্ব দিয়েছেন। এর আগে ১৯৮৩ সালে তিনি ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। সে হিসাবে তার রাজনীতির বয়স এখন ৪২ বছর।

অপরদিকে ইসরাফিল খসরু রাজনীতিতে প্রকাশ্যে এসেছেন ২০২২ সালের ২৩ এপ্রিল। ওই দিন তিনি নগরীর আগ্রাবাদ এলাকায় স্বেচ্ছাসেবক দলের এক ইফতার অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে অংশ নেন।
আরও পড়ুন:
সেদিন গণসংযোগে কেন ছিলেন ‘সন্ত্রাসী’ বাবলা, জানালেন এরশাদ উল্লাহ
চট্টগ্রামে পল্টি নিয়ে খসরুর দলে ভিড়লেন নোমানের তিন শিষ্য
