, | |

মূলপাতা চট্ট-মেট্টো

চট্টগ্রামের ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ বাবর ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে দুদকের মামলা


চট্টগ্রামের শীর্ষ ‘সন্ত্রাসী’ হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর
প্রকাশের সময় :২০ আগস্ট, ২০২৫ ৫:০৫ : অপরাহ্ণ

চট্টগ্রামের ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ যুবলীগ নেতা হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর ও তার স্ত্রী জেসমিন আক্তারের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের দায়ে পৃথক দুটি মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এর মধ্যে একটি মামলায় একমাত্র আসামি বাবর এবং অন্য মামলায় স্বামী-স্ত্রী দুজনকে আসামি করা হয়েছে।

আজ বুধবার সকালে দুদকের প্রধান কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. নওশাদ আলী মামলা দুটি দায়ের করেন।

দুদক চট্টগ্রামের উপ-পরিচালক সুবেল আহমেদ গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর কেন্দ্রীয় যুবলীগের সাবেক উপ-অর্থ বিষয়ক সম্পাদক। তিনি নগরীর নন্দনকানন বৌদ্ধ মন্দির সড়ক এলাকার মৃত জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর ছেলে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি বর্ষণের অভিযোগে বাবরের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। মামলা হওয়ার পর থেকে পলাতক রয়েছেন তিনি।

দুদক চট্টগ্রাম কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, হেলাল আকবর ও তার স্ত্রীকে সম্পদ বিবরণী জমা দিতে ২০২২ সালে নোটিশ দেয় দুদক। পরে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি তারা সম্পদ বিবরণী জমা দেন।

দুদকের দায়ের হওয়া মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, সম্পদ বিবরণীতে বাবর ৯ লাখ ৯ হাজার ২৫০ টাকা স্থাবর এবং ১ কোটি ৬৮ লাখ ৩৪ হাজার ৯৯০ টাকা অস্থাবর সম্পদের তথ্য দিয়েছিলেন। তবে যাচাইকালে তার স্থাবর সম্পদ ৩০ লাখ ৮৮ হাজার ৩৯০ টাকা বেশি পায় দুদক।

এছাড়া আয়কর নথিতে বাবর ২০১২-১৩ থেকে ২০২০-২১ করবর্ষ পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য আয় ১ কোটি ৪১ লাখ ৩০ হাজার ২৭০ টাকা উল্লেখ করেছেন। অপরদিকে ব্যয়সহ তার স্থাবর-অস্থাবর মোট সম্পদের পরিমাণ ২ কোটি ৩০ লাখ ১৭ হাজার ৬৩০ টাকা। অর্থাৎ তিনি ৮৮ লাখ ৮৭ হাজার ৩৬০ টাকা জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করেছেন। সেই হিসাবে অবৈধ ৩০ লাখ ৮৮ হাজার ৩৯০ টাকার স্থাবর সম্পদসহ হেলাল আকবর চৌধুরী বাবরের মোট অবৈধ সম্পদের পরিমাণ ১ কোটি ১৯ লাখ ৭৫ হাজার ৭৫০ টাকা।

অপরদিকে বাবরের স্ত্রী জেসমিন আক্তার সম্পদ বিবরণীতে ২ কোটি ১০ লাখ ১৮ হাজার ৪২০ টাকা স্থাবর এবং ২৪ লাখ ৬০ হাজার টাকা অস্থাবর সম্পদ অর্জনের তথ্য দিয়েছিলেন। অর্থাৎ বিবরণী অনুযায়ী তার মোট সম্পদ ২ কোটি ৩৪ লাখ ৭৮ হাজার ৪২০ টাকা। তবে দুদক অনুসন্ধান করে জেসমিনের মোট সম্পদ পেয়েছে ২ কোটি ৫০ লাখ ২৯ হাজার টাকার। অর্থাৎ তিনি ১৫ লাখ ৫০ হাজার ৫৮০ টাকা সম্পদ অর্জনের তথ্য গোপন করেছেন।

অন্যদিকে, আয়কর নথি অনুযায়ী জেসমিনের আয় ২ কোটি ৬৬ লাখ ৫০০ টাকা। তবে আয়কর নথি পর্যালোচনা করে দুদক গ্রহণযোগ্য আয় পেয়েছে মাত্র ৮৬ লাখ ৪৫ হাজার ১২০ টাকা। যার বিপরীতে পারিবারিক ব্যয়সহ তিনি সম্পদ উল্লেখ করেছেন ২ কোটি ৬৯ লাখ ৫৫ হাজার টাকার। অর্থাৎ ১ কোটি ৮৩ লাখ ৯ হাজার ৮৮০ টাকার জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করেছেন তিনি।

সেই হিসাবে স্থাবর-অস্থাবর সম্পদসহ জেসমিন আক্তারের মোট অবৈধ সম্পদের পরিমাণ ১ কোটি ৯৮ লাখ ৬০ হাজার ৪৬০ টাকা। আর এসব অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং সম্পদ অর্জনের সহায়তার দায়ে বাবর ও তার স্ত্রী জেসমিন আক্তারের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুদক।

হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর চট্টগ্রাম নগরীর ওমরগণি এমইএস কলেজ ছাত্রসংসদের সাবেক জিএস। সাবেক সিটি মেয়র ও নগর আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি প্রয়াত এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারী ছিলেন তিনি। তার মৃত্যুর পর ছেলে ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের ‘আশীর্বাদের হাত’ মাথায় পড়ে বাবরের।

২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার আমলে হেলাল আকবর বাবর ছিলেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) তালিকাভুক্ত ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’। ওই সরকার ক্ষমতায় আসার এক বছরের মাথায় র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার ও ক্রসফায়ার এড়াতে বাবর পাড়ি জমান থাইল্যান্ড। সেখানে গড়ে তোলেন হোটেল ব্যবসা।

২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার এক বছর পর আবারও দেশে ফেরেন বাবর। একপর্যায়ে থাইল্যান্ডের ব্যবসা-বাণিজ্য ছেড়ে দেশে ব্যবসা শুরু করেন। শুরু করেন বেনামে ঠিকাদারি।

২০১১ সালে জেল থেকে বের হয়ে ব্যাংককের আদালতের মাধ্যমে ট্যুরিস্ট পাস নিয়ে পাড়ি জমান দুবাই। সেখানে বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে পাসপোর্ট বানিয়ে দেশে ফেরেন ২০১২ সালে। এরপর আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাদের ম্যানেজ করে যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যপদ বাগিয়ে ফের বেপরোয়া হয়ে ওঠেন।

২০১৩ সালের ২৪ জুন চট্টগ্রামের সিআরবিতে রেলওয়ের কোটি টাকার টেন্ডার নিয়ে বিরোধের জেরে বাবর এবং সাবেক কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নেতা সাইফুল আলম লিমন গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে এক শিশুসহ দুজন নিহত হয়।

এ ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় ৬৪ নম্বর আসামি করা হয় বাবরকে। ঘটনার পরদিন ২৫ জুন ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার হন তিনি। আড়াই মাস জেল কাটার পর জামিনে মুক্তি পান।

বাবরের বিরুদ্ধে রাউজানের আকবর-মুরাদ হত্যা, বিএনপিকর্মী আজাদ হত্যা, মির্জা লেনে ডাবল মার্ডার, সিটি কলেজ ছাত্রলীগ নেতা আশিককে গোলপাহাড় মোড়ে হত্যা, তামাকুমুণ্ডি লেনে রাসেল হত্যা, এমইএস কলেজ থেকে ফরিদ নামের একজনকে ডেকে নিয়ে ষোলশহর ২ নম্বর গেটে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।

কোটা সংস্কারের দাবিতে চট্টগ্রাম নগরের মুরাদপুরে ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে যুবলীগ ও ছাত্রলীগ কর্মীদের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে তিনজন প্রাণ হারান। বাবরের সরবরাহ করা অস্ত্র দিয়েই চট্টগ্রামের মুরাদপুর ও চান্দগাঁও এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর যুবলীগ-ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা হামলা চালানো হয় সেদিন। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর আত্মগোপনে চলে যান বাবর।

আরও পড়ুন: বাবরের নাম শুনলে মানুষ কেন আতঙ্কিত হয়?

মন্তব্য করুন
Rajniti Sangbad


আরও খবর