চট্টগ্রাম মহানগর যুবদলের আসন্ন নতুন কমিটির নেতৃত্বে কে আসছেন তা নিয়ে সংগঠনটির তৃণমূল নেতা-কর্মীদের মধ্যে চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা। নেতৃত্বে কি পুরোনো মুখ নাকি নতুন মুখ আসবে তা নিয়ে নেতা-কর্মীদের মধ্যে কৌতূহল দেখা দিয়েছে।
‘বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের’ কারণে ২০২৪ সালের ২১ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম মহানগর যুবদলের মোশাররফ হোসেন দীপ্তি ও মোহাম্মদ শাহেদের নেতৃত্বাধীন কমিটি ভেঙ্গে দেওয়া হয়।
২০২৪ সালের ২১ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম নগরীর চান্দগাঁওয়ে টার্ফ মাঠ দখল নিয়ে যুবদলের দুপক্ষের কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সেদিন সংঘর্ষে জুবায়ের উদ্দিন বাবু নামের এক যুবক ছুরিকাঘাতে নিহত হন। নিহত জুবায়েরকে নিজের অনুসারী ও কর্মী দাবি করেন তৎকালীন নগর যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোশাররফ হোসাইন। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিহত জুবায়েরের আওয়ামী লীগের নেতাদের সাথে তোলা ছবি প্রকাশ পায়। সংঘর্ষের ঘটনায় জড়িত থাকার দায়ে তৎকালীন নগর যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোশাররফ হোসাইন ও কৃষি বিষয়ক সম্পাদক নুরুল আমিনকে প্রাথমিক সদস্য পদসহ দলীয় সকল পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। একই সাথে মোশাররফ হোসেন দীপ্তি-মোহাম্মদ শাহেদের নেতৃত্বাধীন নগর যুবদলের কমিটি কেন্দ্র থেকে ভেঙে দেওয়া হয়।
২০১৮ সালের ১ জুন মোশাররফ হোসেন দীপ্তিকে সভাপতি এবং মোহাম্মদ শাহেদকে সাধারণ সম্পাদক করে চট্টগ্রাম মহানগর যুবদলের পাঁচ সদস্যের আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয় কেন্দ্র থেকে। এরপর ওই বছরের ৩ অক্টোবর কেন্দ্র থেকে ২৩১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়। দীপ্তি-শাহেদ দায়িত্ব নেওয়ার পর নগরীর ১৫ থানা ও ১৭টি ওয়ার্ডে আহ্বায়ক কমিটি গঠন করেন। কিন্তু বাকি ২৬টি ওয়ার্ডে তারা কমিটি করতে পারেননি।
দীপ্তি-শাহেদের নেতৃত্বাধীন কমিটি ভেঙে দেওয়ার পর নতুন কমিটির আশায় মাসের পর মাস অপেক্ষার প্রহর গুনছেন যুবদলের পদপ্রত্যাশী নেতারা।
নেতা-কর্মীদের অনেকে বলছেন, প্রায় ৬ মাস ধরে নেতৃত্বশূন্য চট্টগ্রাম মহানগর যুবদল। এতে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়েছে। ঝিমিয়ে পড়েছেন তৃণমূল নেতা-কর্মীরা। সংগঠনকে চাঙ্গা করতে দ্রুত সময়ে কেন্দ্র থেকে কমিটি ঘোষণা করা উচিত।
যুবদলের কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক নুরুল ইসলাম সোহেল রাজনীতি সংবাদকে জানিয়েছেন, চট্টগ্রাম মহানগর শাখার আসন্ন নতুন কমিটির আহ্বায়ক ও সদস্যসচিব পদের জন্য ৫৮ জন নেতা গত ১৭ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রে এসে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুবদলের কেন্দ্রীয় একজন নেতা রাজনীতি সংবাদকে জানিয়েছেন, আহ্বায়ক ও সদস্যসচিব হওয়ার জন্য যোগ্যতার একটা মাপকাঠি আছে। কিন্তু পদপ্রত্যাশী ৫৮ জনের মধ্যে অনেক নেতার সেই মাপকাঠি নেই। কারও বিরুদ্ধে জমি দখল, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজিসহ নানা অপকর্মের অভিযোগ রয়েছে।
যুবদলের এই কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও আহ্বায়ক ও সদস্যসচিব পদের জন্য অধিকাংশ নেতা আবেদন করেছেন একটা কৌশলগত কারণে। সেটা হলো, আহ্বায়ক ও সদস্যসচিব শীর্ষ দুটি পদে স্থান না পেলেও কমিটির অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদে যেন তাদের বিবেচনা করা হয়।
দলীয় বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম মহানগর যুবদলের আসন্ন নতুন কমিটির নেতৃত্বে নতুন মুখ আসার সম্ভাবনা বেশি। নতুন নেতৃত্বের আলোচনায় আছে চার নেতার নাম। এর মধ্যে আহ্বায়ক পদে আলোচনায় আছেন-নগর যুবদলের বিগত কমিটির সিনিয়র সহসভাপতি ইকবাল হোসেন, নগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও নগর ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি গাজী সিরাজ উল্লাহ, সদস্যসচিব পদে আলোচনায় আছেন নগর যুবদলের সাবেক সহসভাপতি এ কে এম ফজলুল হক সুমন এবং নগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি এইচ এম রাশেদ খান।
জানতে চাইলে ইকবাল হোসেন রাজনীতি সংবাদকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের ১৬ বছরের শাসনামলে দলের আন্দোলন-সংগ্রাম করতে গিয়ে আমার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়েছে। জেলও খেটেছি। কিন্তু জেল-জুলুম, হামলা-মামলা উপেক্ষা করে রাজপথে সবসময় সক্রিয় ছিলাম। আওয়ামী লীগের অত্যাচার-নির্যাতনের কারণে মাসের পর মাস পরিবার, বাড়িঘর ছেড়ে থাকতে হয়েছে। কিন্তু দলের সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করিনি। আশা করছি, দল আমার ত্যাগের মূল্যায়ন করবে।’
গাজী মো. সিরাজ উল্লাহ বলেন, ‘জুলাই-আগস্টের ছাত্র আন্দোলনে আমি নগরীর বিভিন্ন স্থানে নেতৃত্ব দিয়েছি। দলের আন্দোলন-সংগ্রামে চট্টগ্রাম বিভাগে বিএনপি নেতাদের মধ্যে সর্বোচ্চ মামলা হয়েছে আমার নামে। আমি একদিনের জন্যও রাজপথ ছাড়িনি। আমি ছাত্রদলের নেতৃত্ব ছাড়ার পর যুবদলের কমিটি না হওয়াতে বিএনপির কমিটিতে আমাকে স্থান দেওয়া হয়। কিন্তু আমি যুবদলের নেতৃত্ব দিতে আগ্রহী। তাই এখন যুবদলের নতুন কমিটিতে পদপ্রত্যাশী।’
এ কে এম ফজলুল হক সুমন বলেন, ‘আওয়ামী লীগের ১৬ বছরের শাসনামলে দলের আন্দোলন-সংগ্রামে সবসময় সরব ছিলাম। রাজপথে অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছি। আমার পরিবারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আশা করছি, নতুন কমিটিতে আমার ত্যাগের মূল্যায়ন হবে। আমি চাই, কমিটিতে এবার নতুন নেতৃত্ব আসুক। মোশাররফ হোসেন দীপ্তি ও মোহাম্মদ শাহেদ দীর্ঘ সময় যুবদলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাই এবার নতুনদের সুযোগ দেওয়া হোক।’
এইচ এম রাশেদ খান বলেন, ‘আমি দলের দুঃসময়ে আওয়ামী লীগের ব্যাপক দমন-পীড়নের মুখে নগর স্বেচ্ছাসেবক দলকে নেতৃত্ব দিয়েছি। নেতৃত্বে এসে ঘুণে ধরা স্বেচ্ছাসেবক দলকে আমি সুসংগঠিত করেছি। এর আগে ছাত্রদলের দায়িত্বে থাকাকালেও আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে সবসময় সক্রিয় ছিলাম। তাই যুবদলের আসন্ন কমিটিতে নেতৃত্ব প্রত্যাশী।’
যুবদলের তৃণমূল নেতাকর্মীরা বলছেন, ‘সংগঠনকে গতিশীল করতে নতুন নেতৃত্ব প্রয়োজন। গত ১৬ বছর দলের আন্দোলন-সংগ্রামে যেসব নেতারা সক্রিয় ছিল তাদের মূল্যায়ন করা উচিত। তবে যাদের হাতে নেতৃত্ব দেওয়া হবে তারা যেন ত্যাগী, সৎ ও পরিচ্ছন্নভাবমূর্তির হয়। জমি দখল, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজিসহ নানা অপকর্মের সঙ্গে যুক্ত বিতর্কিত নেতাদের হাতে যেন নেতৃত্বের ভার তুলে দেওয়া না হয়। কারণ এতে সংগঠনের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হবে।’
‘বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের’ কারণে নেতৃত্বে ফেরার সম্ভাবনা ক্ষীণ দীপ্তি-শাহেদের

নতুন কমিটিতে মোশাররফ হোসেন দীপ্তি ও মোহাম্মদ শাহেদ আহ্বায়ক পদপ্রত্যাশী। কিন্তু ‘বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের’ কারণে তাদের নেতৃত্বে ফেরার সম্ভাবনা ক্ষীণ।
দলীয় একটি সূত্র জানিয়েছে, বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ছাড়াও দীপ্তি-শাহেদ দীর্ঘ ৬ বছর নগর যুবদলের নেতৃত্ব দেওয়ায় তাদের হাতে আর নেতৃত্বের ভার তুলে দিতে আগ্রহী নয় কেন্দ্র। মোশাররফ হোসেন দীপ্তি ২০১১ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত নগর যুবদলের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। এরপর ২০১৮ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত তিনি নগর যুবদলের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি একটানা দীর্ঘ ১৩ বছর নগর যুবদলের নেতৃত্বে ছিলেন।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, নগর যুবদলের নতুন কমিটির নেতৃত্ব পেতে দীপ্তি নানা তৎপরতা চালাচ্ছেন। তবে মোহাম্মদ শাহেদের তেমন তৎপরতা নেই।
দলীয় একটি সূত্র জানিয়েছে, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিনের হাত ধরে রাজনীতিতে উত্থান হয় মোশাররফ হোসেন দীপ্তির। বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির চট্টগ্রাম বিভাগের দায়িত্বে থাকা একজন নেতা দীপ্তির ওপর চরম অসন্তুষ্ট। দীপ্তি নগর যুবদলের সভাপতি থাকাকালে ওই বিএনপি নেতাকে দলীয় কর্মকাণ্ডে কোনো সহযোগিতা করেননি, বরং এড়িয়ে চলেছেন। ২০২৪ সালের ২১ সেপ্টেম্বর দীপ্তি এর ফল পেয়েছেন।
সূত্রটি জানিয়েছে, নগর যুবদলের নেতৃত্ব হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার পর দীপ্তির বোধোদয় হয়েছে। যুবদলের আসন্ন কমিটিকে ঘিরে তিনি বিএনপির ওই কেন্দ্রীয় নেতাকে গত ১৯ ফেব্রুয়ারি রাতে নোয়াখালীতে নিজের গ্রামের বাড়িতে ফোন করে ডেকে নিয়ে যান। ওই বিএনপি নেতা সেদিন নোয়াখালীতে বিএনপির একটি সমাবেশে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। ওই বিএনপি নেতার মন গলানোর জন্য দীপ্তি সেদিন সুযোগ কাজে লাগান। কিন্তু ওই বিএনপি নেতা দীপ্তির চালাকি বুঝতে পেরেছেন। তিনি দীপ্তিকে আর বিশ্বাস করেন না।
এদিকে বিগত কমিটিতে দীপ্তি-শাহেদের ভূমিকা নিয়ে নগর যুবদলের নতুন কমিটির পদপ্রত্যাশী অনেক নেতা প্রশ্ন তুলছেন।
আহ্বায়ক পদপ্রত্যাশী গাজী সিরাজ উল্লাহ রাজনীতি সংবাদকে অভিযোগ করে বলেন, ‘দীপ্তি-শাহেদের কারণে চান্দগাঁওতে একজন যুবক হত্যার শিকার হয়েছে। একজন মায়ের বুক খালি হয়েছে। তারা এমনভাবে চাঁদাবাজি করেছে বলার মতো না। তাদের অপকর্মের কারণে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বাধ্য হয়ে মহানগর কমিটি তো বটেই, থানা-ওয়ার্ড কমিটিও বিলুপ্ত করে দিয়েছেন। এটা নজিরবিহীন ঘটনা। আজ পর্যন্ত দেশের কোথাও যুবদলের একসাথে মহানগর, থানা ও ওয়ার্ড কমিটি বিলুপ্ত হয়নি।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মোশাররফ হোসেন দীপ্তি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এ বিষয়ে নগর যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শাহেদ রাজনীতি সংবাদকে বলেন, ‘দলের যে কেউ আমাদের সমালোচনা করতেই পারে। ব্যর্থতার দায় আমাদের নিতে হবে। যুবদলের দুই নেতাকে বহিস্কার করার ঘটনায় আমরা দায় এড়াতে পারি না। তারা ওই ঘটনায় সম্পৃক্ত না থাকলে কেন্দ্র তাদের বহিস্কার করলো কেন? তবে দলের আন্দোলন-সংগ্রামে তাদের অনেক ভূমিকা ছিল। যিনি এখন আমাদের সমালোচনা করছেন তিনি কি বহিস্কৃত দুই যুবদল নেতার মতো রাজপথে সক্রিয় ছিলেন?’
আরও পড়ুন: চট্টগ্রামে অভিনব কায়দায় যুবদল নেতার চাঁদাবাজি ও জমি দখলের চেষ্টা
