চিটাগাং চেম্বার অব কমার্সের নির্বাচন নিয়ে এফবিসিসিআইয়ের আর্বিট্রেশন ট্রাইব্যুনাল মামলার যে রায় দিয়েছে তা নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। বাণিজ্য বিধিমালা-২০২৫ অনুযায়ী নতুন তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন করার আদেশ দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল। অর্থাৎ নতুন তফসিলে চেম্বারের সদস্যদের সরাসরি ভোটে সভাপতি, সিনিয়র সহসভাপতি ও সহসভাপতি এবং পরিচালক নির্বাচিত হবে। কিন্তু চেম্বারের নির্বাচন বোর্ড এখন কোন প্রক্রিয়ায় নির্বাচন করবে? চেম্বারের আর্টিকেলস অব অ্যাসোসিয়েশন নাকি বাণিজ্য বিধিমালা অনুযায়ী?
চিটাগাং চেম্বারের অ্যাসোসিয়েট সদস্য এস এম নুরুল হক এবং দুই অর্ডিনারি সদস্য মোহাম্মদ বেলাল হোসেন ও মুহাম্মদ আজিজুল হক পৃথকভাবে আর্বিট্রেশন ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করেন। গত ৮ ও ১২ এপ্রিল দুই দফা তিনটি মামলার একত্রে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। এরপর গতকাল বুধবার (২২ এপ্রিল) এফবিসিসিআইয়ের আর্বিট্রেশন ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান নাসরিন বেগম এবং সদস্য এ.এস.এম. কামাল উদ্দিন ও ছায়েদ আহম্মদের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ রায় দেন।
গত বছরের ৪ সেপ্টেম্বর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে নির্দেশ দিয়েছিল। এরপর ১৩ সেপ্টেম্বর চেম্বারের নির্বাচন আপিল বোর্ড টাউন-ট্রেডের প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও নির্বাচন আপিল বোর্ডের এ সিদ্ধান্ত বাতিলের জন্য চেম্বারের এই তিন সদস্য আর্বিট্রেশন ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করেন। কিন্তু ট্রাইব্যুনাল তাদের অভিযোগ আমলে না নিয়ে তা খারিজ করে দিয়েছে। ফলে নির্বাচনে চিটাগাং চেম্বারের টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপের ছয়টি প্রতিষ্ঠান নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে।
আর্বিট্রেশন ট্রাইব্যুনালের পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, ট্রাইব্যুনালে অভিযোগকারী চিটাগাং চেম্বারের তিন সদস্যের কেউ টাউন ও ট্রেড গ্রুপের সদস্য নয় বিধায় তাদের অভিযোগ দায়েরের আইনগত কোনো অধিকার নেই। তারা প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হননি।
এক মামলার বাদী মোহাম্মদ বেলাল হোসেনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে ট্রাইব্যুনাল। তার ভূমিকা নিয়ে রায়ের পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, বেলাল হোসেন একই সাথে হাইকোর্ট ও ট্রাইব্যুনালে একের পর এক মামলা, আবেদন, অভিযোগ ও আপিল দায়ের করেছেন। তিনি ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দাখিল করার পর হাইকোর্টে রিট পিটিশনের বিরুদ্ধে আপিল করেন। এরপর ট্রাইব্যুনালের মামলা প্রত্যাহারের জন্য আবেদন করেন। কিন্তু আবার সেই মামলা প্রত্যাহারের আবেদন বাতিলের জন্য তিনি আবেদন করেন।
তবে ট্রাইব্যুনাল গত ১১ আগস্ট ঘোষিত চেম্বারের নির্বাচনী তফসিল বাণিজ্য বিধিমালা অনুযায়ী না হওয়ায় এবং মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার কারণে তা বাতিল করে দিয়েছে। বাণিজ্য বিধিমালা-২০২৫ অনুযায়ী নতুন তফসিল ঘোষণার নির্দেশ দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল।
কোন প্রক্রিয়ায় নির্বাচন করবে নির্বাচন বোর্ড?
বাণিজ্য বিধিমালা অনুযায়ী কিংবা সরাসরি ভোটে নির্বাচন করতে হলে চেম্বারের আর্টিকেলস অব অ্যাসোসিয়েশন সংশোধন করতে হবে। কিন্তু নির্বাচিত বোর্ড ছাড়া এখন তা সংশোধনের সুযোগ নেই। অপরদিকে আর্টিকেলস অব অ্যাসোসিয়েশন অনুযায়ী নির্বাচন করতে গেলে বাণিজ্য বিধিমালা লঙ্ঘন হবে।
এ অবস্থায় আর্বিট্রেশন ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে চিটাগাং চেম্বারের সদস্যদের মধ্যে। এ বিভ্রান্তি নিরসন হবে সুপ্রীম কোর্টের আপিল বিভাগে। গত ১১ মার্চ আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ এফবিসিসিআইয়ের আর্বিট্রেশন ট্রাইব্যুনালে চিটাগাং চেম্বারের তিন সদস্যের মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচন স্থগিত রাখার নির্দেশ দিয়েছিল। মামলা নিষ্পত্তি হওয়ায় এখন আপিল বিভাগ চিটাগাং চেম্বারের নির্বাচন নিয়ে চূড়ান্ত রায় দেবে। আগামী ২৬ এপ্রিল আপিল বিভাগে এ সংক্রান্ত শুনানি অনুষ্ঠিত হতে পারে বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চেম্বার নির্বাচন বোর্ডের প্রধান মনোয়ারা বেগম রাজনীতি সংবাদকে বলেন, ‘এফবিসিসিআইয়ের আর্বিট্রেশন ট্রাইব্যুনালের রায় নিয়ে আমরা দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়েছি। কারণ চেম্বারের আর্টিকেলস অব অ্যাসোসিয়েশন সংশোধন করা ছাড়া সরাসরি ভোটে নির্বাচন করা যাবে না। কিন্তু নির্বাচিত বোর্ড ছাড়া এখন আর্টিকেলস অব অ্যাসোসিয়েশন সংশোধনের সুযোগ নেই। এখন আপিল বিভাগের সিদ্ধান্তের জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।’
চিটাগাং চেম্বারের সকল কার্যক্রম পরিচালিত হয় আর্টিকেলস অব অ্যাসোসিয়েশন অনুযায়ী। বাণিজ্য বিধিমালায়ও জেলা চেম্বারগুলোর কার্যক্রম আর্টিকেলস অব অ্যাসোসিয়েশন অনুযায়ী পরিচালনার কথা বলা হয়েছে।
চিটাগাং চেম্বারের আর্টিকেলস অব অ্যাসোসিয়েশন অনুযায়ী, অর্ডিনারি গ্রুপের ১২ জন পরিচালক ও অ্যাসোসিয়েট গ্রুপের ৬ জন পরিচালক সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়। আর টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপের ৬ জন পরিচালক সমঝোতার ভিত্তিতে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়। এরপর নির্বাচিত ২৪ জন পরিচালকের ভোটাভুটিতে সভাপতি, সিনিয়র সহসভাপতি ও সহসভাপতি নির্বাচিত হয়।
পূর্বঘোষিত তফসিল অনুযায়ী গত ৪ এপ্রিল চেম্বারের ভোটগ্রহণের তারিখ ঘোষণা করা হয়েছিল। এর আগে গত ১ নভেম্বর চিটাগাং চেম্বারের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ভোটের দুই দিন আগে হাইকোর্টে রিট দায়ের করার ফলে নির্বাচন আটকে যায়। ২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর চিটাগাং চেম্বারের সকল পরিচালক পদত্যাগ করেছিলেন। এরপর গত দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে নেতৃত্বহীন অবস্থায় পড়ে আছে এই চেম্বার।
উল্লেখ্য, চিটাগাং চেম্বারের সর্বশেষ প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন হয়েছিল ২০১৩ সালের ৩০ মার্চ। ওই নির্বাচনে মাহবুবুল আলম-নুরুন নেওয়াজ সেলিম পরিষদ জয়লাভ করে। তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলো মোরশেদ মুরাদ ইব্রাহীম-আবদুস সালাম ঐক্য পরিষদ। নির্বাচনে মাহবুবুল আলম-নুরুন নেওয়াজ সেলিম পরিষদ থেকে ২০ জন এবং মোরশেদ-সালাম পরিষদ থেকে মাত্র চারজন পরিচালক নির্বাচিত হন।
আরও পড়ুন: চট্টগ্রাম সিটির মেয়র পদে বিএনপিতে আলোচনায় দুই নাম
