পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে প্রতিপক্ষের রক্ষণে ভীতি ছড়ানো ফ্রান্সকে যেন এদিন বোতল বন্দি করে রাখলো স্পেন। কিলিয়ান এমবাপ্পে-ওসমান দেম্বেলেরা সেভাবে সুযোগই তৈরি করতে পারলো না। বিপরীতে বল দখলে রেখে ফ্রান্সের রক্ষণে চাপ তৈরি করলো স্পেন। সুযোগ কাজে লাগিয়ে দুই অর্ধে দু’বার বল জড়ালো ফ্রান্সের জালে। সেই ব্যবধান ধরে রেখেই জয়ের হাসি হাসলো স্পেন।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) বাংলাদেশ সময় দিবাগত রাত ১টায় যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসে প্রথমে সেমিফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল ফ্রান্স আর স্পেন। ফ্রান্সের বিপক্ষে আধপিত্য করে ২-০ গোলের জয় তুলে নিয়েছে স্পেন।
সর্বশেষ ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে শিরোপা জয়ের পর আর কোনো আসরে কোয়ার্টার ফাইনালই খেলতে পারেনি স্পেন। সেই বাঁধা পেরিয়ে এক যুগেরও বেশি সময় পরে বিশ্বকাপের ফাইনালে জায়গা করে নিলো তারা। যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ হবে দ্বিতীয় সেমিফাইনালে ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনার মধ্যকার জয়ী দল।
অন্যদিকে, ফ্রান্সের সামনে সুযোগ ছিল তৃতীয় দেশ হিসেবে টানা তিনটি বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলার। কিন্তু নিষ্প্রভ পারফরম্যান্সে সেই আশা পূরণ হলো না তাদের। এখন আগামী ১৯ জুলাই রাত ১টায় তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে অংশ নেবে তারা।
ম্যাচের শুরুর দিকে দুই দলই সমানভাবে আক্রমণের চেষ্টা করছিল। তবে ২০তম মিনিটে প্রথম বড় সুযোগ তৈরি হয় স্পেনের। বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে নিজের পেছনে থাকা লামিনে ইয়ামালকে বক্সের ভেতর অজান্তে লাথি মেরে বসেন লুকা দিনিয়ে। রেফারি পেনাল্টির বাঁশি বাজান, ভিএআরও সিদ্ধান্ত বদলায়নি। ২২ মিনিটে স্পটকিক থেকে গোল করতে ভুল করেননি মিকেল ওইয়ারসাবাল। বিশ্বকাপে এটি ছিল তাঁর পঞ্চম গোল। ১৯৮৬ সালে এমিলিও বুত্রাগেনিও ও ২০১০ সালে ডেভিড ভিয়ার পর স্পেনের হয়ে এক বিশ্বকাপে পাঁচ গোল করা তৃতীয় ফুটবলার হয়ে যান তিনি। বিশ্বকাপ ইতিহাসে ফ্রান্স হজম করল ১৬টি পেনাল্টি, কোনো দলের যা সর্বোচ্চ।
গোলের পর স্পেন আরও ধৈর্য নিয়ে খেলেছে। ফ্রান্সের তাড়া বেড়েছে, কিন্তু তাদের আক্রমণে ধার বাড়েনি। উল্টো প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার আগে ম্যানিয়াঁর ভুল পাস থেকে ব্যবধান বাড়ানোর সুযোগও পেয়েছিল স্পেন। দানি ওলমোর ব্যাকহিল পাসে ইয়ামাল বল বাড়িয়ে দেন লুইসকে। শেষ পর্যন্ত ডিফেন্ডারের বাধায় সেই সুযোগ নষ্ট হয়। এর মধ্যেই চোটে মাঠ ছাড়েন উইলিয়াম সালিবা, যা ফরাসি রক্ষণকে আরও অস্বস্তিতে ফেলে।
প্রথমার্ধের পরিসংখ্যানও বলছিল, ম্যাচটা স্পেনের নিয়ন্ত্রণেই। ফ্রান্স দুটি শট নিলেও এমবাপ্পে প্রতিপক্ষের বক্সে বল ছুঁয়েছেন একবার, অথচ অফসাইড হয়েছেন দুবার। লাপোর্তে-কুবার্সির সেন্টারব্যাক জুটি তাঁকে প্রায় পুরো ম্যাচেই বিচ্ছিন্ন রাখতে সফল হয়।
দ্বিতীয়ার্ধে দিদিয়ের দেশম একের পর এক বদলি নামান। কোনে, দেজিরে দুয়ে, রায়ান শেরকি, থিও এর্নান্দেজ—একজনের পর একজন মাঠে নামলেও বদলায়নি ম্যাচের গতি। বরং ৫৮ মিনিটে ব্যবধান দ্বিগুণ করে স্পেন। দ্রুত আক্রমণে অলমোর সঙ্গে ওয়ান-টু পাস খেলে বক্সে ঢুকে ডান পায়ের শটে গোল করেন পেদ্রো পোরো। বিশ্বকাপে এটি তাঁর দ্বিতীয় গোল। ফার্নান্দো হিয়েরোর পর স্পেনের দ্বিতীয় ডিফেন্ডার হিসেবে এক বিশ্বকাপে একাধিক গোল করার কীর্তিও গড়েন তিনি।
দুই গোলে এগিয়ে যাওয়ার পর স্পেন আর অযথা ঝুঁকি নেয়নি। বলের দখল ধরে রেখে সময় গড়িয়েছে। ইয়ামাল একবার বল জালে পাঠিয়েছিলেন, কিন্তু অফসাইডে গোলটি বাতিল হয়। অন্যদিকে এমবাপ্পের একটি শট কুকুরেয়া ব্লক করেন, দুয়ের সামনে উনাই সিমন নিজের ভুলও সামলে নেন। ম্যাচে ফেরার মতো আর কোনো মুহূর্ত তৈরি করতে পারেনি ফ্রান্স।
শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই ডালাসের গ্যালারি লাল-হলুদ উৎসবে মেতে ওঠে। ২০১০ সালের পর আবার বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন থেকে এখন মাত্র এক ধাপ দূরে স্পেন। এই জয়ে তারা শুধু ১৬ বছর পর বিশ্বকাপের ফাইনালেই ফিরল না, ছুঁয়ে ফেলল ইতালির ২০১৮ থেকে ২০২১ সালের টানা ৩৭ ম্যাচ অপরাজিত থাকার বিশ্বরেকর্ডও। একইসঙ্গে ইউরো ও বিশ্বকাপ মিলিয়ে টানা আটটি নকআউট ম্যাচ জেতা প্রথম ইউরোপিয়ান দলও তারা।
আরও পড়ুন: অতিরিক্ত সময়ের গোলে সুইসদের হারিয়ে সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা
