রাজনীতি সংবাদ প্রতিবেদক
প্রকাশের সময় : ২০ জুলাই ২০২৬, ৪:১৫ পূর্বাহ্ণ
পাসিং, প্রেসিং, বলের দখল, আক্রমণ-সবকিছুতেই যোজন যোজন এগিয়ে থেকেও গোল আদায় করতে পারছিল না স্প্যানিশরা। একজন এমিলিয়ানো মার্টিনেজ দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তাদের সামনে। ওদিকে পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে আলো ঝলমলে পারফরম্যান্স করা আর্জেন্টিনাকে এদিন বোতলবন্দি করে রাখে স্পেন। গোলখরার ম্যাচটি নির্ধারিত নব্বই মিনিট শেষে গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। আর অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয়ার্ধেই দুর্দান্ত আক্রমণ থেকে নিকো উইলিয়ামসের পাসে বল পেয়ে দারুণ এক ভলিতে গোল করেন বদলি নামা ফেরান তোরেস। তার এই গোলেই দশজনের আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছে স্পেন। কীর্তি গড়েছে দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের।
এর আগে ২০১০ সালে প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল স্পেন। এতে দীর্ঘ ১৬ বছর পর নিজেদের দ্বিতীয় শিরোপা ঘরে তুললো স্প্যানিশরা।
আজ রোববার বাংলাদেশ সময় দিবাগত রাত ১টায় যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে শিরোপা নির্ধারণের লড়াইয়ে মুখোমুখি হয়েছিল আর্জেন্টিনা আর স্পেন।
ম্যাচের প্রথম মিনিট থেকে স্পেন দারুণ আত্মবিশ্বাস আর পরিকল্পনা নিয়ে বলের দখল ধরে রেখে আধিপত্য বজায় রাখে। ম্যাচের ৫ মিনিটেই ভালো সুযোগ তৈরি করে তারা। ইয়ামাল বক্সে ক্রস বাড়ানোর চেষ্টা করেন এবং বলটি ডিফ্লেক্ট হয়ে ওলমোর কাছে চলে যায়। ওলমো দারুণভাবে বলটি আবার তার দিকেই বাড়িয়ে দেন। ইয়ামাল বলটি নিয়ন্ত্রণে নেন। কিন্তু লিসান্দ্রো মার্টিনেজ ও এমিলিয়ানো মার্টিনেজের যৌথ প্রচেষ্টায় বলটি জালে জড়াতে পারেনি!
ম্যাচের সময় যত বেড়েছে ততই ম্যাচ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে স্পেন। ৪১ মিনিটে ওয়ারজাবালকে ফাউল করে বিশ্বকাপ ফাইনালের প্রথম হলুদ কার্ড দেখেন লিসান্দ্রো মার্টিনেজ। দুই মিনিট পর ইনজুরির লক্ষণ নিয়ে তিনি নিকোলাস ওতামেন্দির বদলি হন। একই সময়ে কুকুরেয়ার দারুণ একটি প্রচেষ্টা ডানপাশের পোস্টের সামনে দিয়ে মাঠের বাইরে যায়।
প্রথমার্ধে ৫ শতাংশ বল পজেশনে রেখেছিল স্পেন। মাত্র ৩৫ শতাংশ আর্জেন্টিনা। পাসেও দ্বিগুণ ব্যবধানে এগিয়ে ছিল স্পেন। আর্জেন্টিনার ১৫৫ নিখুঁত পাসের বিপরীতে তাদের ৩১৩!
বল দখলে রেখে পাসিংনির্ভর ফুটবলে প্রতিপক্ষের বক্স বারবার হানা-স্পেনের এই কৌশল জেনে শুরু থেকে আর্জেন্টিনা তাদের লো ব্লকে কৌশলে অনড় থেকেছিল। ৯০ মিনিটের শেষ দিকে ভালো একটা আক্রমণের সুযোগ পায় আর্জেন্টিনা। সেটি ঠেকিয়েই স্পেনের আবার প্রতি-আক্রমণ। এরপরই আর্জেন্টিনার বড় ধাক্কা। স্পেনের ডিফেন্ডার পাউ কুবারসিকে ফাউল করে দুই হলুদ কার্ডের সম্মিলিত লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয় আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডার এনসো ফার্নান্দেস। ৯০ মিনিটের খেলার শেষ মুহূর্তে ১০ জনের দলে পরিণত হয়ে যায় আর্জেন্টিনা। লিওনেল মেসি একটু চেষ্টা করেছিলেন রেফারিকে বোঝাতে, তবে কাজ হয়নি।
বিরতি থেকে ফিরে দ্বিতীয় মিনিটেই আক্রমণ শাণায় স্পেন। আক্রমণে উঠে বক্সের বাইরে থেকে শট নিয়েছিলেন অ্যালেক্স বায়েনা। তবে দারুণ দক্ষতায় সেটি আটকে দেন গোলরক্ষক মার্টিনেজ।
এরপর ৫৬তম মিনিটে আবারও আর্জেন্টিনার রক্ষণে ভীতি ছড়ায় স্পেন। সে যাত্রায় ক্লিয়ার করে আর্জেন্টিনাকে রক্ষা করেন গঞ্জালো মন্তিয়েল।
৬৪তম মিনিটে প্রায় ভুল করে বসেছিলেন মার্টিনেজ। বামপ্রান্ত দিয়ে আক্রমণে ওঠে স্পেন। বল নিয়ে বক্সের বাইরে থেকে আচমকা শট নেন দানি ওলমো। সামনেই বাউন্স করা বল ঠিকঠাক গ্লাভসবন্দি করতে পারেননি মার্টিনেজ। কাছেই থাকা স্পেনের ফুটবলার সেই বলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য ছুটে যান। তবে বল তার আগেই গোললাইনের বাইরে চলে যায়।
ম্যাচের ৭৬তম মিনিটে টানা তিনটি আক্রমণে আর্জেন্টিনার রক্ষণের পরীক্ষা নেয় স্পেন। প্রথম দফা বক্সের বাইরে থেকে নেওয়া প্রেদির শট আটকে দেন মার্টিনেজ। সেই বলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বিতীয় আক্রমণ শাণায় লুইস দে লা ফুয়েন্তের শিষ্যরা। বক্সের ডানপ্রান্ত থেকে নেওয়া পাউ কুবার্সির শটও আটকে দেন মার্টিনেজ।
৮০তম মিনিটে নিশ্চিত গোল আটকে দিয়ে আর্জেন্টিনাকে ম্যাচে রাখেন মার্টিনেজ। গোললাইনের কাছে থেকে ছয় গজ বক্সের মধ্যে ক্রস বাড়ান নিকো উইলিয়ামস। লাফিয়ে উঠে দারুণ হেড করেছিলেন আইমেরিক লাপোর্তে। তবে তারচেয়েও ভালো ছিল মার্টিনেজের সেভ। দারুণভাবে বল গ্লাভসবন্দি করেন তিনি।
দশজনের দল নিয়েও দারুণ লড়াই করে ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে নিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। তবে বেশি সময় আর ধরে রাখতে পারেনি স্পেনকে। ১০৬তম মিনিটে প্রতিরোধ ভাঙেন ফেরান তোরেস। নিকো উইলিয়ামসের পাস থেকে দারুণ শটে বল পাঠান তোরেস।

শেষদিকে বেশ কয়েকটি আক্রমণ করে আর্জেন্টিনা। তবে কোনোভাবেই স্পেনের প্রতিরোধ ভাঙতে পারেনি তারা।
লিওনেল মেসি একেবারই নিষ্প্রভ হয়ে গিয়েছিলেন। স্প্যানিশ কোচ লা ফুয়েন্তে ফাইনালের আগে মেসিকে আটকানোর কৌশল নিয়ে তাঁর এক মজার অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছিলেন সংবাদ সম্মেলনে। কোন কৌশলে ওপেন প্লেতে মেসিকে বোতলবন্দী করে রাখতে হয়, সে তো দেখাই গেল। লা ফুয়েন্তের কৌশলে মেসির কাছে বল সরবরাহ একেবারেই বন্ধ ছিল। প্রথমার্ধে মেসি বলই স্পর্শ করেছেন মোটে ১৫ বার। পরের অর্ধেও এই পরিসংখ্যান আর উজ্জ্বল হয়নি। দলের লো ব্লক কৌশলে মাঝমাঠে হেঁটে বেড়ানো তো মেসির জন্য নতুন কিছু নয়। রক্ষণ থেকে যে হঠাৎ আক্রমণে উঠে মেসি জাদুতে প্রতিপক্ষের জালে জড়ানো, সেটি ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে করতে পারেনি আর্জেন্টিনা।
রেফারি শেস বাঁশি বাজাতেই উল্লাসে মেতে ওঠে স্পেন শিবির। এ উল্লাস শিরোপা জয়েল উল্লাস। আর ২০২১ সাল থেকে টানা সাফল্যের একেকটা মুকুট মাথায় পরা লিওনেল মেসির কাছে নিউজার্সির ‘মেটলাইফ স্টেডিয়াম’ বেদনার এক টুকরো জমিনই হয়ে রইলো।
