চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতার বাস্তব চিত্রকে উপেক্ষা করায় স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে সোশ্যাল মিডিয়ায় একহাত নিয়েছেন নেটিজেনরা। তাকে নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রল করছেন নেটিজেনরা।
বুধবার (২৯ এপ্রিল) সন্ধ্যায় স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী নগরীর প্রবর্তক মোড়ের জলাবদ্ধ এলাকা পরিদর্শন করতে যান। গত সোমবার (২৮ এপ্রিল) ও পরদিন মঙ্গলবার (২৯ এপ্রিল) প্রবর্তক মোড়ে ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছিল। তবে শুধু প্রবর্তক মোড় নয়, নগরীর মুরাদপুর, জিইসি মোড়, চকবাজার, তিন পুলের মাথা, কাতালগঞ্জ, আগ্রাবাদ ও হালিশহরের সড়কগুলো পানিতে তলিয়ে যায়। অনেক সড়কে বুকসমান হওয়ায় বন্ধ হয়ে যায় যানবাহন চলাচল। অনেক এলাকায় ড্রেন উপচে পানি সড়ক ও বাসাবাড়িতে ঢুকে পড়ে।
কিন্তু প্রতিমন্ত্রী কেবল প্রবতর্ক মোড় এলাকা সরেজমিন পরিদর্শন করেন। এরপর ওই স্থানে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন।
চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতা নিয়ে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত রিপোর্ট নিয়ে প্রশ্ন তোলে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা যেভাবে নিউজটি করেছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে চট্টগ্রাম শহর পানির ওপর ভাসছে। আমি সন্ধ্যার পর থেকে চট্টগ্রাম ঘুরে দেখলাম। চট্টগ্রাম শহর পানির ওপর ভাসছে না। চট্টগ্রাম নগরী শুষ্ক মৌসুমে যে রকম থাকে সে রকমই আছে। চট্টগ্রাম শহর সুন্দর আছে, যে রকম ছিল সে রকমই আছে। হঠাৎ করে অতিবৃষ্টির কারণে কিছুটা পানি জমাট বাঁধলেও সঠিক সময়ে পানিটি নিষ্কাশন হয়ে গেছে। প্রবর্তক মোড়ের এখানে খাল নির্মাণের কারণে একটু জলাবদ্ধতা হয়েছিল। এখন নিষ্কাশন হয়েছে।’
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী যখন সাংবাদিকদের এ কথা বলছিলেন, তখন তার পাশে দাঁড়ানো সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন হাসিতে ফেটে পড়েন!
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের এ বক্তব্যের পর সোশ্যাল মিডিয়ায় সমালোচনার ঝড় উঠছে। চট্টগ্রামের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ তার এই বক্তব্যে ফুঁসে উঠেছেন। তাকে নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রল করছেন।
সাংবাদিক তাসনিম হাসান স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর এই বক্তব্য নিয়ে ফেসবুকে একটি দীর্ঘ পোস্ট দিয়েছেন। পোস্টের একাংশে তিনি লেখেন, ‘‘যাকে প্রধানমন্ত্রী পাঠালেন মানুষের পাশে দাঁড়াতে, কিন্তু তার কথাতে যেন ফুটে উঠল এক ধরনের অসংবেদনশীলতা। বন্দরনগরীর মানুষ-‘চট্টগ্রামের রাস্তা ইউরোপের মতো’ এই মন্তব্যের জন্য রিয়াজকে আজও ‘মাফ’ করতে পারেনি। শহর তলিয়ে গেলেই বেচারাকে নিয়ে শুরু হয় যায় ট্রল। কেউ কেউ তো কাতাল মাছ হাতে তাকে পানিতে নামিয়ে দেন আর লেখেন-‘নায়ক রিয়াজের তেলে, চট্টগ্রাম ডুবল জলে! আজকে প্রতিমন্ত্রীর এই বক্তব্যে শুনে মনে হলো-তিনি যেন চট্টগ্রামের মানুষের পাশে নয় বরং রিয়াজের প্রতিই সহমর্মিতা জানালেন…।’’
সাংবাদিক শৈবাল আচার্য লেখেন, ‘চট্টগ্রামে এসে পানিই দেখেননি প্রতিমন্ত্রী!!! চট্টগ্রাম শহর নাকি পানির ওপর ভাসছে না!!! গত দুইদিন আপনি, আমি, নগরবাসী যে পানি দেখেছি তা সবই ভুল। কেবল প্রতিমন্ত্রীর দুই চোখই সত্য!!! হায়রে মানুষ!!! এত মানুষের সামনে এভাবেও মিথ্যা কথা বলা যায়??? এসব জনভোগান্তির ছবি তাহলে মিথ্যা, বানানো জনাব তেলবাজ???’
আ ন ম আমান নামের এক আইনজীবী লেখেন, ‘নায়ক রিয়াজের আপডেট ভার্সন চলে এসেছে।’
কাউসার বিন সারওয়ার নামের এক যুবক লেখেন, ‘‘পুরো শহর যখন পানিতে ডুবুডুবু, তখন মন্ত্রী মহোদয় সেখানে ‘শুষ্ক মৌসুমের সৌন্দর্য’ খুঁজে পাচ্ছেন! ওবায়দুল কাদেরের কাব্যিক কথা আর হাসান মাহমুদের আজব যুক্তি এই দুইয়ের এক অপূর্ব মিশ্রণ দেখা যাচ্ছে উনার মধ্যে। পাশে দাঁড়িয়ে মেয়র শাহাদাত সাহেব হয়তো ভাবছেন, প্রতিযোগিতা তো দেখি বেশ কঠিন!’’
জিয়া উদ্দিন নামের একজন লেখেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনি এই প্রতিমন্ত্রীকে চট্টগ্রাম এসে দ্বায়িত্ব অবহেলা এবং ভুল তথ্য প্রচারের জন্য শোকজ করে জবাবদিহিতার আওতায় এনে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করুন।’
উল্লেখ্য, ২০২১ সালের ২৪ জানুয়ারি সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী রেজাউল করিম চৌধুরীর পক্ষে প্রচারণায় এসে বাংলা সিনেমার একসময়কার জনপ্রিয় নায়ক রিয়াজ বলেছিলেন, ‘চট্টগ্রামে এতো উন্নয়ন হয়েছে-চোখে না দেখলে বিশ্বাস হয় না। মনে হয়েছে বিদেশের কোনো রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি। ইউরোপ-আমেরিকার যে ধরনের রাস্তা, সেই রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি।’
বৃষ্টিতে যখনই চট্টগ্রাম পানির নিচে তলিয়ে যায়, তখনই জলাবদ্ধতার সঙ্গে উচ্চারিত হয় নায়ক রিয়াজের নাম। চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতার সঙ্গে রিয়াজের নামটি সমার্থক হয়ে গেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় তাকে নিয়ে হয় ঠাট্টা, তামাশা, মজা ও বিদ্রূপ করেন নেটিজেনরা।
বুধবার (২৯ এপ্রিল) দুপুরে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা ইস্যু সংসদে তুলে ধরেন চট্টগ্রাম-১০ (পাহাড়তলী-হালিশহর) আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ২৪তম দিনে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে তিনি চট্টগ্রাম নগরীর জলবদ্ধতা নিরসনে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
সাঈদ আল নোমান বলেন, ‘এই মুহূর্তে চট্টগ্রামের মানুষ পানিতে ভাসছে। আমাদের পানি গলা পর্যন্ত। মানুষ ভাবতে শুরু করেছে, চট্টগ্রামের এই সমস্যা কোনোদিন সমাধান হবে না।’
প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে এই সংসদ সদস্য বলেন, ‘চট্টগ্রামের জন্য যদি প্রথম একটি কাজ করতে হয় তাহলে আমাদের এই জলাবদ্ধতার সমস্যা নিরসন করতে হবে।’
চট্টগ্রাম নগরীর ভয়াবহ জলাবদ্ধতা নিরসনে সংসদে একটি প্রস্তাব তুলে ধরে সাঈদ আল নোমান বলেন, ‘বিভিন্ন গণমাধ্যমে চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতার বিষয়টা যেভাবে আমরা দেখছি, সেটাকে যদি চিন্তায় আনি, তাহলে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে কয়েক বছরের মধ্যে একটি ব্যবস্থা নিতে হবে।’
এরপর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘সংবাদমাধ্যমে আমিও দেখেছি অতিবৃষ্টির কারণে চট্টগ্রাম শহরের একটি বড় অংশে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এই কষ্টের জন্য আমি আমার অবস্থান থেকে চট্টগ্রাম শহরে বসবাসকারী সব নাগরিকের কাছে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি। আমরা চেষ্টা করছি যত দ্রুত সম্ভব এই সমস্যাটা থেকে মানুষকে বের করে নিয়ে আসা যায়।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এরইমধ্যে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের যে প্রশাসক আছেন, উনার সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। উনি এর মধ্যেই সমস্যা সমাধানে চেষ্টা করছেন। কিন্তু এখন তো এটি অনেক বড় একটি জলাবদ্ধতা হয়ে গেছে, স্বাভাবিকভাবেই এটি নিরসনে একটু সময় লাগবে।’
জানা গেছে, সংসদ অধিবেশন শেষ হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বন্দরনগরীর জলাবদ্ধ এলাকা পরিদর্শন করতে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে চট্টগ্রামে পাঠান।
আরও পড়ুন: চট্টগ্রাম সিটির মেয়র পদে বিএনপিতে আলোচনায় দুই নাম
