আগামী চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক) নির্বাচনে মেয়র পদে চমক দিতে পারেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। নানা অভিযোগের কারণে এবার কপাল পুড়তে পারে বর্তমান মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের। তার পরিবর্তে এবার মেয়র পদে নতুন মুখ আসতে পারে। নতুন মুখ হিসেবে বিএনপির কেন্দ্রে আলোচনায় আছেন চিটাগাং চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি আমির হুমায়ুন মাহমুদ চৌধুরী। তিনি অর্থমন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ছোট ভাই। এছাড়া চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব নাজিমুর রহমানের নামও আলোচনায় আছে।
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র রাজনীতি সংবাদকে এ তথ্য জানিয়েছে।
২০২৪ সালের ১ অক্টোবর চট্টগ্রামের নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল বিএনপির প্রার্থী ডা. শাহাদাত হোসেনকে মেয়র নির্বাচিত ঘোষণা করে। এরপর নির্বাচন কমিশনের গেজেটে রেজাউল করিমের পরিবর্তে ডা. শাহাদাতের নাম প্রতিস্থাপন করা হয়। আইন অনুযায়ী, সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের মেয়াদ ধরা হয় প্রথম সাধারণ সভা থেকে পরবর্তী পাঁচ বছর। মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরীর নেতৃত্বে চসিকের প্রথম সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০২১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি। সে হিসেবে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি মেয়র ডা. শাহাদাতের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচন কমিশন এখন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইতোমধ্যে জামায়াতে ইসলামী চট্টগ্রাম সিটির মেয়র পদে অধ্যক্ষ মুহাম্মদ শামসুজ্জামান হেলালীকে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দিয়েছে। এ ছাড়া জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে সাবেক সিটি মেয়র মোহাম্মদ মনজুর আলম মেয়র প্রার্থী হচ্ছেন। বিএনপি এখনো তাদের মেয়র প্রার্থীর নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেনি।
বিএনপির উচ্চপর্যায়ের একটি সূত্র থেকে জানা গেছে, দলটি চট্টগ্রাম সিটির মেয়র প্রার্থী চূড়ান্ত করতে বিভিন্নভাবে জরিপ চালাচ্ছে। একটি গোয়েন্দা সংস্থা বিএনপির উপযুক্ত মেয়র প্রার্থীর সন্ধানে গোপনে তথ্য সংগ্রহ করছে।
বিএনপির উচ্চপর্যায়ের সূত্রটি জানিয়েছে, মেয়র প্রার্থীর যোগ্যতার মানদণ্ড হিসেবে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে। প্রথমত প্রার্থীকে উচ্চ শিক্ষিত হতে হবে। এরপর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। সৎ হতে হবে। পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি থাকতে হবে এবং দল ও জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা থাকতে হবে।
বিএনপি চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, ট্রাইব্যুনালের রায়ে ডা. শাহাদাত মেয়র নির্বাচিত হওয়া নিয়ে অসন্তুষ্ট হয়েছেন তারেক রহমান। ডা. শাহাদাত আদালতের রায়ে মেয়র নির্বাচিত হওয়ার নেপথ্যের তথ্য শুনে তারেক রহমান হতবাক হয়েছেন। ডা. শাহাদাত গত বছরের ১৬ নভেম্বর লন্ডনে গিয়ে তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। কিন্তু তারেক রহমান তাকে অভিনন্দন জানাননি।
সূত্রটি আরও জানিয়েছে, মেয়র ডা. শাহাদাতের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অসন্তুষ্ট প্রধানমন্ত্রী। বিশেষ করে নগরীর বিভিন্ন স্থানে ডা. শাহাদাতের ছবি টাঙানোর বিষয়টি নিয়ে তার ওপর খুবই বিরক্ত তারেক রহমান। শুধু তাই নয়, কর্পোরেশনে ডা. শাহাদাত তার পছন্দের ব্যক্তিদের বিনা টেন্ডারে কাজ দেওয়া, ফুটপাত নিয়ে বাণিজ্য করা, ময়লার বিল নিয়ে মানুষকে হয়রানি করাসহ নানা অনিয়মের অভিযাগ শুনে তার ওপর আস্থা উঠে গেছে তারেক রহমানের। একটি গোয়েন্দা সংস্থা এ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে রিপোর্টও দিয়েছেন।
বিএনপির দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানিয়েছে, ২০২১ সালের জানুয়ারিতে রাজধানীর নয়াপল্টন কার্যালয়ে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক পুনর্গঠন টিমের সঙ্গে লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি বৈঠক করেছিলেন তারেক রহমান। নগর বিএনপির আহ্বায়ক ডা. শাহাদাত হোসেন ও আবুল হাশেম বক্করও ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। তখন সাংগঠনিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে শাহাদাত-বক্করের কাছে কৈফিয়ত চেয়েছিলেন তারেক রহমান। তখন ডা. শাহাদাত বিভিন্ন যুক্তি তুলে ধরেন। তার কথা শুনে রাগান্বিত হয়ে তারেক রহমান বলেছিলেন, আমি কি আপনার বন্ধু, ভাই নাকি আত্মীয় হই? এরপর লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি বৈঠকের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন তারেক রহমান।
বিএনপির উচ্চপর্যায়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনে ডা. শাহাদাত ভোটারদের সমর্থন পাবেন না। এনসিপি থেকে মনজুর আলম প্রার্থী হলে ডা. শাহাদাত তাকে মোকাবিলা করতে পারবেন না। ডা. শাহাদাত তার কাছে বিপুল ভোটে হারবেন। এ অবস্থায় এবার ডা. শাহাদাত হোসেনের মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। ডা. শাহাদাতের বিকল্প হিসেবে তারেক রহমান এবার একজন ক্লিন ইমেজ, সৎ ও গ্রহণযোগ্য লোককে মেয়র পদে মনোনয়ন দিতে চান।
সূত্রটি জানিয়েছে, চট্টগ্রাম সিটিতে ক্লিন ইমেজ, সৎ ও গ্রহণযোগ্য মেয়র প্রার্থী হিসেবে বিএনপির কেন্দ্রে আলোচনায় আছে দুজনের নাম। এরা হলেন-আমির হুমায়ুন মাহমুদ চৌধুরী ও নাজিমুর রহমান।
বনেদি পরিবারের সন্তান আমির হুমায়ুন মাহমুদ চৌধুরী চট্টগ্রামের একজন আলোচিত ব্যবসায়ী নেতা। তিনি চিটাগাং চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি ছিলেন। এ ছাড়া তিনি এফবিসিসিআই, বিজিএমইএ এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। চট্টগ্রাম ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি। এ ছাড়া বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিকে পুনর্বিন্যাস করে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি গঠনে তার ভূমিকা ছিল।
৭৪ বছর বয়সী আমির হুমায়ুন চৌধুরী এখনো বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। তিনি গ্রেটার চিটাগাং ইকোনমিক ফোরাম ও পোর্ট ইউজার্স ফোরাম নামে দুটি সংগঠনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়া তিনি দীর্ঘ ১৮ বছরেরও বেশি সময় ধরে চট্টগ্রামে থাইল্যান্ডের অনারারি কনসাল হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
আমির হুমায়ুন চৌধুরী একজন ব্যবসায়ী হলেও তিনি পরোক্ষভাবে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তার বড় ভাই আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সংসদ নির্বাচনে তিনি পর্দার আড়ালে ‘থিংক ট্যাংক’ হিসেবে কাজ করেছেন। চট্টগ্রাম-১১ আসনে ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালের সংসদ নির্বাচনে আমির খসরুর বিজয়ের পেছনে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিলেন আমির হুমায়ুন। শুধু তাই নয়, ২০১০ সালের সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিএনপির মেয়র প্রার্থী মনজুর আলমের ‘থিংক ট্যাংক’ ছিলেন আমির হুমায়ুন। সেই নির্বাচনে মহিউদ্দিন চৌধুরীকে প্রায় ১ লাখ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন মনজুর আলম।
মেয়র প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে আমির হুমায়ুন মাহমুদ চৌধুরী রাজনীতি সংবাদকে বলেন, ‘মেয়র প্রার্থী হিসেবে আমাকে নিয়ে আলোচনা করার বিষয়টি আমার জানা নেই। আমি যখন চিটাগাং চেম্বারের সভাপতি ছিলাম তখন চট্টগ্রামের জন্য অনেক কাজ করেছি। আমার বড় ভাই আমির খসরুর নির্বাচনে আমি নেপথ্যে ভূমিকা রেখেছিলাম। এ ছাড়া ২০১০ সালের মেয়র নির্বাচনে মনজুর আলমের বিজয়ের পেছনেও আমার ভূমিকা ছিল। তাই হয়তো মেয়র প্রার্থী হিসেবে আমাকে নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। বিএনপি থেকে যখন আমার কাছে মেয়র প্রার্থীর প্রস্তাব আসবে, তখন আমি বিষয়টি বিবেচনা করবো।’
এদিকে সজ্জন, বিনয়ী ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির কারণে মেয়র প্রার্থী পদে আলোচনায় আছেন চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব নাজিমুর রহমান। গত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১১ আসন থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন তিনি। কিন্তু বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু চট্টগ্রাম-১০ আসন ছেড়ে চট্টগ্রাম-১১ আসনে চলে আসায় কপাল পুড়ে যায় নাজিমুর রহমানের।
৫৯ বছর বয়সী নাজিমুর রহমান একজন ‘দক্ষ ও ত্যাগী’ নেতা হিসেবে পরিচিত। ২০২৪ সালের ৭ জুলাই তাকে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সদস্য সচিবের দায়িত্ব দেন তারেক রহমান। গত প্রায় দুই বছর ধরে এরশাদ উল্লাহর সাথে তিনি নগর বিএনপিকে দক্ষতার সঙ্গে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এর আগে ১৯৯৪ সালে চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রদলের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন নাজিমুর রহমান। ২০০২ সালে ছাত্রদলের সভাপতি পদ থেকে বিদায় নেন তিনি। এরপর তিনি মহানগর বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হন।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, এক সময়ের আলোচিত ছাত্রনেতা নাজিমুর রহমানকে ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ করেন বিএনপি চেয়ারম্যান। তাকে গত সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১১ আসনে মনোনয়ন দিতে চেয়েছিলেন তারেক রহমান। কিন্তু আমির খসরুকে নিয়ে জটিলতার কারণে বঞ্চিত হন নাজিমুর রহমান। তাই চট্টগ্রাম সিটির মেয়র প্রার্থী পদে তাকে বিবেচনা করতে পারেন তারেক রহমান।
মেয়র পদে মনোনয়ন চাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব নাজিমুর রহমান রাজনীতি সংবাদকে বলেন, ‘আমি মেয়র পদে মনোনয়ন চাইবো। আমি তৃণমূল থেকে রাজনীতি করে আসছি। আমার যোগ্যতা ও দক্ষতা দেখে দলের চেয়ারম্যান আমাকে নগর বিএনপির নেতৃত্বের আসনে বসিয়েছেন। এখন দলের চেয়ারম্যান যদি আমাকে মেয়র প্রার্থী হিসেবে উপযুক্ত মনে করেন, তাহলে ইনশাআল্লাহ মনোনয়ন পাবো বলে আশা করছি।’
আরও পড়ুন:
চট্টগ্রাম সিটির মেয়র পদে জামায়াতের প্রার্থী শামসুজ্জামান হেলালী
এনসিপি থেকে মেয়র প্রার্থী হচ্ছেন মনজুর আলম
