একদিকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের আত্মবিশ্বাস, অন্যদিকে আশাবাদী জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান। দুই দলের শ্বাসরুদ্ধকর ভোটের লড়াই নিয়ে দেশজুড়ে টানটান উত্তেজনা। দুই দলের ব্যালট যুদ্ধে নির্ধারিত হবে আগামীর বাংলাদেশে নেতৃত্ব কারা দেবেন। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের জুলাই সনদের ভবিষ্যৎও চূড়ান্ত হবে এই লড়াইয়ে।
সব শঙ্কা দূর করে অবশেষে আজ বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহুল প্রত্যাশিত গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ। রাজধানীর অভিজাত এলাকা থেকে শুরু করে অলিগলি, চরাঞ্চল ও পাহাড়ের দুর্গম জনপদ-সব জায়গায় পড়েছে নির্বাচনের ছোঁয়া। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর একটি প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন প্রধান দলগুলোর মধ্যে তৈরি করেছে নতুন প্রাণচাঞ্চল্য। এবারের নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে তীব্র লড়াই হবে বলে মনে করছেন ভোটাররা।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিগত তিনটি পাতানো জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মানুষের ভোটাধিকার হরণ করা হয়েছিল। সেসব পাতানো নির্বাচনে মানুষের ভোটাধিকার হরণের কলঙ্ক মুছে গণতন্ত্রের নতুন পথযাত্রার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আজ বৃহস্পতিবার। সব অনিশ্চয়তা, আশঙ্কা পেছনে ফেলে উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে এই নির্বাচন সম্পন্ন করতে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
যে রাজপথে ঝরেছে বিপ্লবীদের রক্ত, সেই রাজপথে এখন মুক্তকণ্ঠের নির্বাচনি আমেজ। আজকের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট কেবল ভোটই নয়, বরং এটি নতুন প্রজন্মের লড়াইয়ের ফসল-যেখানে মানুষ কোনো ভয় ছাড়াই নিজের পছন্দের নেতা বেছে নেওয়ার অধিকার ফিরে পাচ্ছে।
ভয়হীন পরিবেশে ভোটাধিকার প্রয়োগের এই নতুন চর্চা বাংলাদেশকে নিয়ে যাবে এক নতুন গণতান্ত্রিক দিগন্তের দিকে। তবে এবারের নির্বাচন কেবল ক্ষমতা বদলের লড়াই নয়, বরং এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্ন, এক ঐতিহাসিক ‘গণভোট’।
আজ সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত শেরপুর-৩ আসন বাদে সারা দেশে ২৯৯টি সংসদীয় আসনে একযোগে স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সে ব্যালট পেপারের মাধ্যমে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। কয়েকটি স্তরে ভোটের নিরাপত্তায় আছে সেনাবাহিনী, পুলিশ, আনসার বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ৯ লাখ ৫৬ হাজার সদস্য। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনায় মাঠে রয়েছেন ১ হাজার ৫১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট।
ছাত্র-জনতার জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রায় দেড় বছর পর এই নির্বাচন ঘিরে ভোটারসহ দেশবাসীর উৎসাহের কমতি নেই। মুক্ত পরিবেশে নিজেদের মনমতো পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়ে এই অধিকার প্রয়োগের অপেক্ষার অবসান ঘটাতে উন্মুখ প্রায় ১৩ কোটি ভোটার।
বিগত নির্বাচনগুলোতে রাজপথে বিরোধী দলের অনুপস্থিতি দেখা গেলেও এবারের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় মাঠে প্রধান শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয় বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামী। যদিও সর্বমোট ৫০টি রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে।
বিএনপি এককভাবে ২৯২টি আসনে প্রার্থী দিয়ে জয়ের ব্যাপারে পূর্ণ আত্মবিশ্বাসী। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে নির্বাচনে জোটবদ্ধ হয়েছে ১০টি দল।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে ১১ দলীয় ঐক্যজোট বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। বিশেষ করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একাংশ ও তরুণদের নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ায় ভোটের সমীকরণে এসেছে নাটকীয় পরিবর্তন।
এবারের ভোটের সবচেয়ে বড় চমক ব্যালট বাক্সে দুটি ভিন্ন লড়াই। একদিকে সংসদ সদস্য নির্বাচন, অন্যদিকে সংবিধান সংস্কারের প্রশ্নে গণভোট। রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের সীমাবদ্ধতা এবং নির্বাচনকালীন স্থায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ভোটাররা তাদের রায় দেবেন।
নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, মোট ভোটারের প্রায় ২৫ শতাংশই তরুণ প্রজন্ম। ২০২৪ সালের বিপ্লবের মূল কারিগর এই তরুণরাই এবার ভোটের ভাগ্য নির্ধারণ করবেন বলে মনে করা হচ্ছে।
গত ১৫ বছর ভোট দিতে না পারার আক্ষেপ দূর করতে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলো থেকে গ্রামে ছুটে গেছেন বিপুল মানুষ। ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা সবার মাঝে।
এবারের মোট ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন। এর মধ্যে পুরুষ ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১ জন, নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ১ হাজার ২৩২ জন।
এবারের সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে ভোট দিতে ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপে নিবন্ধনকারী প্রবাসীদের পাঠানো ৪ লাখ ৮১ হাজার ১৮৫টি ব্যালট দেশে এসে পৌঁছেছে। অ্যাপের মাধ্যমে নিবন্ধনকারী প্রবাসীদের কাছে মোট ৭ লাখ ৬৬ হাজার ৮৬২টি ব্যালট পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে ৫ লাখ ২৮ হাজার ৫৭৯ জন ব্যালট গ্রহণ করেছেন। ইতোমধ্যে ভোট দিয়েছেন ৫ লাখ ১৫ হাজার ৬১৯ জন।
দেশের ৭৫টি কারাগারে থাকা প্রায় ৮৬ হাজার বন্দির মধ্যে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে ৫৯৯০ জন নিবন্ধন করেছিলেন। নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় ত্রুটির কারণে ৩৮০টি আবেদন বাতিল হয়। ফলে পাঁচ হাজার ৬১০ জন ভোটদানের যোগ্য হন। শেষ পর্যন্ত পাঁচ হাজার ৬৭ জন কারাবন্দি ভোট দেন, আর নিবন্ধিত ৫৪৩ জন ভোট দেননি। নিবন্ধিতদের মধ্যে ৬০ জন ‘গুরুত্বপূর্ণ‘ বন্দি রয়েছেন। কারা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের মধ্যে ৫৬ জন ভোট দিয়েছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই নির্বাচন কেবল সরকার গঠনের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়; বরং বিগত সরকারের বিতর্কিত নির্বাচনব্যবস্থার প্রতি রাজনৈতিক আস্থা পুনর্গঠনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। তাদের মতে, এটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার পাশাপাশি গণতান্ত্রিক বিশ্বাসযোগ্যতা পুনঃস্থাপনের এক সন্ধিক্ষণ।
আরও পড়ুন: কীভাবে জানবেন ভোটকেন্দ্র কোনটি, ভোটার নম্বর কত?
