ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি আসনে জয়লাভ করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি। তবে অনেক আসনে আলোচনায় থেকেও পরাজয় বরণ করেছেন বিভিন্ন দলের অনেক প্রার্থী।
জি এম কাদের
জাতীয় পার্টির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত রংপুর-৩ (সিটি কর্পোরেশনে ও সদর) আসনে ভরাডুবি হয়েছে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদেরের। ২০২৪ সালে তিনি এই আসন থেকে নির্বাচিত হয়ে সংসদে বিরোধী দলের নেতা হয়েছিলেন। কিন্তু এবার তিনি এই আসনে তৃতীয় স্থানে সীমাবদ্ধ থাকেন। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাহবুবুর রহমান বেলাল পেয়ছেন ১ লাখ ৭৫ হাজার ৮২৭ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী সামসুজ্জামান সামু পেয়েছেন ৮৪ হাজার ৫৭৮ ভোট। আর লাঙ্গল প্রতীকে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের পেয়েছেন ৪৩ হাজার ৩৮৫ ভোট।
মাহমুদুর রহমান মান্না
বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না হেভিওয়েট প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় ছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত তিনি প্রত্যাশিত ফল করতে পারেননি। কেটলি প্রতীকে তার প্রাপ্ত ভোটসংখ্যা মাত্র ৩ হাজার ৪২৬। ফলে তিনি জামানত হারিয়েছেন। আসনটিতে বিএনপির প্রার্থী মীর শাহে আলম ১ লাখ ৪৫ হাজার ২৪ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত প্রার্থী মাওলানা শাহাদাতুজ্জামান পেয়েছেন ৯৩ হাজার ৫৪৮ ভোট পেয়েছেন।
মিয়া গোলাম পরওয়ার
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার খুলনা-৫ (ডুমুরিয়া–ফুলতলা) আসনে বিএনপির প্রার্থী মোহাম্মদ আলি আসগার লবির কাছে ২ হাজার ৭০২ ভোটে পরাজিত হন। ধানের শীষ প্রতীকে লবি পেয়েছেন ১ লাখ ৪৭ হাজার ৬৫৮ ভোট। অন্যদিকে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে মিয়া গোলাম পরওয়ার পেয়েছেন ১ লাখ ৪৪ হাজার ৯৫৬ ভোট। দুই প্রার্থীর মধ্যে ভোটের ব্যবধান ছিল ২ হাজার ৭০২।
আমিনুল হক
ঢাকা-১৬ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী ছিলেন আমিনুল হক। তিনি বিগত সময়ে রাজপথে আন্দোলন সংগ্রামে ছিলেন সরব। জেল-জুলম নির্যাতনের পাশাপাশি জনপ্রিয়তার কারণে জয়ের ব্যাপারে ছিলেন আশাবাদী। তবে জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী কর্নেল (অব.) আব্দুল বাতেনের কাছে তিনি পরাজিত হন। আব্দুল বাতেন মোট ভোট পেয়েছেন ৮৬ হাজার ৮২৩টি। আর আমিনুল হক পেয়েছেন মোট ৮৪ হাজার ২০৭ ভোট।
অ্যাডভোকেট শিশির মনির
জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের মধ্যে সবেচেয়ে ক্লিন ইমেজ ও জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থেকেও হেরে গিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী শিশির মনির। নেটিজেনদের ধারণা ছিল, জামায়াতের একজন প্রার্থী জয় হলে সেটি হবে শিশির মনির। কিন্তু তিনি ৩৯ হাজার ৯৩২ ভোটে বিএনপি প্রার্থী নাছির উদ্দিন চৌধুরীর কাছে হেরে যান। নাছির উদ্দিন চৌধুরী ধানের শীষ প্রতীকে পেয়েছেন ৯৭ হাজার ৭৯০ ভোট। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী শিশির মনির দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ৫৭ হাজার ৮৫৮ ভোট।
মামুনুল হক
ঢাকা-১৩ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ববি হাজ্জাজ এবং ১০ দলীয় নির্বাচনী জোট সমর্থিত প্রার্থী মাওলানা মামুনুল হকের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়েছে। এ আসনে আলোচনায় ছিলেন বাংলাদেশ খেলাফতে মজলিশের নেতা মামুনুল হক। আসনটিতে ধানের শীষ প্রতীকে বিনপির প্রার্থী ববি হাজ্জাজ পেয়েছেন ৮৮ হাজার ৩৮৭টি ভোট। অপরদিকে ৮৬ হাজার ৬৭টি ভোট পেয়েছেন মামুনুল হক। তাদের ভোটের ব্যবধান ২ হাজার ৩২০ ভোট।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী
এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রচারণায় সবচেয়ে আলোচনায় ছিল রাজধানীর ঢাকা-৮ আসন। এ আসনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের বিপরীতে প্রার্থী ছিলেন এনসিপির নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। প্রচারণার সময় বিভিন্ন ইস্যুতে আলোচনায় আসেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। মির্জা আব্বাসের সমালোচনা করে এবং বিভিন্ন কর্মকাণ্ড করে দেশের মানুষের মন কেড়ে নেন তিনি। হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পর ভোররাত ৪টার দিকে এ আসনের ফলাফল ঘোষণা করা হয়। এতে দেশের নির্বাচনের সবচেয়ে আলোচনায় থাকা ঢাকা-৮ আসনে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে পাঁচ হাজার ভোটে হারিয়ে মির্জা আব্বাসকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়।
সারজিস আলম
জুলাই যোদ্ধাদের সমন্বয়ক হিসেবে আলোচনায় ছিলেন সারজিস আলম। কিন্তু পঞ্চগড়-১ আসনে তিনি বিএনপি প্রার্থী ব্যারিস্টার মুহম্মদ নওশাদ জমিরের কাছে হেরে যান। নওশাদ জমির ধানের শীষ প্রতীকে পান ১ লাখ ৮৬ হাজার ১৮৯ ভোট। আর সারজিস পান ১ লাখ ৬৮ হাজার ৪৯ ভোট। তবে হেরে গিয়েও রাজনৈতিক সৌহার্দ্য ও পারস্পরিক সম্মানের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন সারজিস আলম। ফলাফল ঘোষণার পর তিনি বিজয়ী প্রার্থীকে অভিনন্দন জানান।
তাসনীম জারা
জুলাই যোদ্ধাদের মধ্যে ক্লিন ইমেজের অধিকারী এনিসিপির সাবেক নেত্রী ডা. তাসনীম জারা বিভিন্ন ইস্যুতে আলোচনায় ছিলেন। তবে জামায়াত জোটে এনসিপি প্রবেশ করায় তিনি পদত্যাগ করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন। ঢাকা-৯ আসনে বিএনপি প্রার্থী হাবীবুর রহমানের কাছে পরাজিত হন তাসনীম জারা। এ আসনে তিনি ফলাফলের দিক থেকে তিন নম্বরে ছিলেন। ধানের শীষ প্রতীকে হাবিবুর রশিদ পেয়েছেন ১ লাখ ১১ হাজার ২১২ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী জাবেদ মিয়া পেয়েছেন ৫৩ হাজার ৪৬০ ভোট। আর স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারা ফুটবল প্রতীকে পেয়েছেন ৪৪ হাজার ৬৮৪ ভোট।
আরও পড়ুন: বিএনপির ভূমিধস বিজয়, প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন তারেক রহমান
