স্বামী সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। আজ বুধবার বিকেল ৪টা ৪০ মিনিটে রাজধানীর শের-এ-বাংলা নগরে জিয়া উদ্যানে তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়।
খালেদা জিয়ার কবরে সবার আগে নামেন বড় ছেলে ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। মায়ের কবরে সবার আগে মাটিও দেন তারেক রহমান।

এছাড়া তিন বাহিনীর প্রধান, বিএনপির শীর্ষ নেতারাও কবরে মাটি দেন। কবর থেকে কিছুটা দূরে অবস্থান করেন তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান, আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শর্মিলা রহমান, তারেক রহমানের মেয়ে জাইমা রহমানসহ পরিবারের নারী সদস্যরা। দোয়া পড়ে একটি পাত্রে নেওয়া মাটিতে স্পর্শ করতে দেখা যায় তাদের।
এর আগে বিকেল ৩টা ৫ মিনিটে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় খালেদা জিয়ার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে সংসদ ভবন থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কড়া নিরাপত্তায় লাল-সবুজের পতাকায় মোড়া গাড়িতে করে খালেদা জিয়ার মরদেহ জিয়া উদ্যানে নেওয়া হয়।
জানাজার আগে খালেদা জিয়ার একমাত্র ছেলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান পরিবারের পক্ষ থেকে বক্তব্য দেন এবং মায়ের জন্য দোয়া প্রার্থনা করেন।
জানাজায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস, জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর প্রধানরা জানাজায় অংশ নেন। বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরাও জানাজায় উপস্থিত ছিলেন।
দুপুর ১২টা বাজার আগেই পুরো মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। জানাজা জনসমুদ্রে পরিণত হয়। জানাজায় মিলিয়নের (দশ লাখে এক মিলিয়ন) বেশি মুসল্লি অংশ নিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। জানাজায় অংশগ্রহণকারীরা বলেছেন, এটাই বাংলাদেশের স্মরণকালের সবচেয়ে বড় জানাজা। ৪৪ বছর আগে ১৯৮১ সালের ২ জুন এই মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতেই শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জানাজায় লাখো মানুষ অংশ নিয়েছিলেন।
এর আগে আজ দুপুর পৌনে ১২টার দিকে লাল-সবুজ রঙের জাতীয় পতাকায় মোড়ানো ফ্রিজার ভ্যানে করে খালেদা জিয়ার মরদেহ জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় নিয়ে আসা হয়। সেনাবাহিনী হিউম্যান চেইন তৈরি করে রাষ্ট্রীয় প্রোটকলে তার মরদেহ আনা হয়।
এর আগে বেলা ১১টার দিকে ছেলে তারেক রহমানের গুলশান অ্যাভিনিউয়ের ১৯৬ নম্বর বাসা থেকে খালেদা জিয়ার মরদেহ বহনকারী ফ্রিজার ভ্যানটি যাত্রা শুরু করে। তারও আগে সকাল ৯টার দিকে খালেদা জিয়ার মরদেহ রাজধানীর এভার কেয়ার হাসপাতাল থেকে বের করে গুলশানে নেওয়া হয়। শুরুতে তার দীর্ঘদিনের বাসভবন ‘ফিরোজা’য় নেওয়ার কথা থাকলেও পরে গাড়িটি তারেক রহমানের গুলশান অ্যাভিনিউয়ের ১৯৬ নম্বর বাসায় নেওয়া হয়। সেখানে পৌঁছানোর পর বেলা ১১টা পর্যন্ত খালেদা জিয়ার স্বজন এবং বিএনপির নেতাকর্মীরা শেষবারের মতো তাকে শ্রদ্ধা জানান।
রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে ৩৭ দিন ধরে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৬টায় মৃত্যুবরণ করেন বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।
গত ২৩ নভেম্বর বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে দ্রুত তাকে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তার ফুসফুসে ইনফেকশন ধরা পড়ে। পরে কিডনি জটিলতা, হৃদরোগ ও নিউমোনিয়ায় তার অবস্থার আরও অবনতি হয়। ১ ডিসেম্বর তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। সেখানে মেডিকেল বোর্ডের দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে তার চিকিৎসা চলছিল।
আওয়ামী লীগের দীর্ঘ ১৬ বছরের শাসনামলে দীর্ঘদিন নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন খালেদা জিয়া, করেছেন কারাভোগ। চিকিৎসার সুযোগও দেওয়া হয়নি তাকে। ফলে ধীরে ধীরে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, আর্থ্রাইটিস, লিভার সিরোসিস, কিডনির জটিলতাসহ নানা শারীরিক অসুস্থতা দেখা দেয় খালেদা জিয়ার।
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ৫ আগস্ট আওয়ামী সরকারের পতনের পরদিন ৮০ বছর বয়সী খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেন রাষ্ট্রপতি। এরপর উন্নত চিকিৎসার জন্য চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি লন্ডনে যান খালেদা জিয়া। ১১৭ দিন লন্ডনে অবস্থান শেষে গত ৬ মে তিনি দেশে ফেরেন। এরপর একাধিকবার শারীরিক নানা জটিলতায় সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীকে হাসপাতালে যেতে হয়েছে।
আরও পড়ুন: জনসমুদ্রে খালেদা জিয়ার জানাজা সম্পন্ন
