রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর চট্টগ্রাম নগরীতে জমি দখল ও চাঁদাবাজিতে বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন মহানগর যুবদলের সাবেক সহসভাপতি শাহেদ আকবর। সম্প্রতি নগরীর উত্তর কাট্টলীর নিকুঞ্জ আবাসিক এলাকায় এই যুবদল নেতা অভিনব কায়দায় এক ব্যবসায়ীর জমি দখলের চেষ্টা করেছেন। এই যুবদল নেতা ওই ব্যবসায়ীর কাছ থেকে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা নেওয়ারও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
জানা গেছে, শাহেদ আকবরের বাড়ি নগরীর উত্তর কাট্টলী এলাকায়। তিনি মহানগর যুবদলের আসন্ন কমিটিতে সভাপতি প্রত্যাশী।
ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী হলেন হাজী মাহাবুব আলম। তিনি নিকুঞ্জ আবাসিক এলাকার একাংশের মালিক। তার বাড়ি নগরীর ডবলমুরিং ঈদগাহ এলাকায়। তিনি নগরীর ১২ নম্বর সরাইপাড়া ওয়ার্ড বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।
জানা গেছে, নিকুঞ্জ আবাসিক এলাকার জমির পরিমাণ হলো ৬০ কানি। এর মধ্যে সেখানে ১০তলা বিশিষ্ট দুটি আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হয়েছে। বাকি জায়গায় এখনো কোনো স্থাপনা নির্মাণ করা হয়নি। সেখানে সম্প্রতি সড়ক নির্মাণের কাজ চলছে।
অভিযোগ পাওয়া গেছে, যুবদল নেতা শাহেদ আকবর দীর্ঘ দিন ধরে এই আবাসিক এলাকার জমি দখলের চেষ্টা চালিয়ে আসছেন। তিনি দলীয় প্রভাব খাটিয়ে নিকুঞ্জ আবাসিক এলাকার একাংশের মালিক হাজী মাহাবুব আলমকে বিভিন্ন সময় হুমকিও দেন। শাহেদ আকবর গত ৪ ফেব্রুয়ারি হাজী মাহাবুব আলমের ওপর চাপ প্রয়োগ করে ইঞ্জিনিয়ার তপন দত্ত নামের এক ব্যক্তির মাধ্যমে ৫ লাখ টাকা চাঁদাও নিয়েছেন। মহানগর যুবদলের আসন্ন কমিটিতে পদ পেতে যুবদলের কেন্দ্রীয় নেতাদের ঘুষ দেওয়ার কথা বলে তিনি এই চাঁদা নেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইঞ্জিনিয়ার তপন দত্ত রাজনীতি সংবাদকে বলেন, ‘হাজী মাহাবুব আলম আমার মাধ্যমে শাহেদ আকবরের জন্য ৫ লাখ টাকা দিয়েছেন। তবে এটাকে আমি চাঁদা বলতে পারি না। আপোষ মতে টাকাটা দেওয়া হয়েছে।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মহানগর যুবদলের সাবেক সহসভাপতি শাহেদ আকবর রাজনীতি সংবাদকে বলেন, ‘ইঞ্জিনিয়ার তপন দত্ত আমাকে কোনো টাকা দেননি। আমাকে টাকা দেওয়ার বিষয়ে তার কাছে কি কোনো ডকুমেন্ট আছে?’
অভিযোগ পাওয়া গেছে, যুবদল নেতা শাহেদ আকবর দুজন যুবককে সঙ্গে নিয়ে গত ১২ ফেব্রুয়ারি আনুমানিক বিকেল ৩টার দিকে নিকুঞ্জ আবাসিক এলাকায় গিয়ে প্রকল্পের ঠিকাদারকে সড়ক নির্মাণের কাজ বন্ধ করার নির্দেশ দেন। এ সময় তারা রাজমিস্ত্রির কাছ থেকে নির্মাণ কাজের যন্ত্রপাতি ছিনিয়ে নিয়ে যায়।
জানতে চাইলে প্রকল্পের ঠিকাদার মিনহাজ আলম রনি রাজনীতি সংবাদকে বলেন, ‘গত ১২ ফেব্রুয়ারি আনুমানিক বিকেল ৩টার দিকে নিকুঞ্জ আবাসিক এলাকায় যুবদল নেতা শাহেদ আকবর দুজন যুবককে সঙ্গে নিয়ে হাজির হন। তখন তিনি আমাকে বলেন, এটা আমার জায়গা। এখানে কোনো কাজ করা যাবে না। এরপর তারা রাজমিস্ত্রির কাছ থেকে নির্মাণ কাজের যন্ত্রপাতি ছিনিয়ে নিয়ে যায়।’
জানা গেছে, এ ঘটনার পর নিকুঞ্জ আবাসিক এলাকার তিনটি স্থানে ‘জায়গার দখল মূলে মালিক-শাহেদ আকবর, যুবদল সহ-সভাপতি’ লেখা তিনটি সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দেওয়া হয়। পরদিন ১৩ ফেব্রুয়ারি সকালে প্রকল্পের লোকজন আবার সেখানে কাজ করতে গেলে সাইনবোর্ড তিনটি দেখতে পান। প্রকল্পের ঠিকাদার ঘটনাটি নিকুঞ্জ আবাসিক এলাকার একাংশের মালিক হাজী মাহাবুব আলমকে জানান। এরপর তিনি তাৎক্ষণিকভাবে বিভিন্ন মাধ্যমে লন্ডনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়াম্যান তারেক রহমান এবং যুবদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কাছে বিষয়টি অবহিত করেন। এর পরদিন ১৪ ফেব্রুয়ারি সকালে ওই এলাকায় সাইনবোর্ড তিনটি আর দেখা যায়নি।
এরপর ১৫ ফেব্রুয়ারি নগরীর আকবর শাহ থানায় এ ঘটনায় জিডি করেন যুবদল নেতা শাহেদ আকবর। নিকুঞ্জ আবাসিক এলাকায় সাইনবোর্ড টাঙানোর ঘটনায় তিনি হাজী মাহাবুব আলম ছাড়াও সাইফুল ইসলাম ও নাছির আহম্মদ নামের আরও দুজন ব্যক্তি এবং ঠিকাদার মিনহাজ আলম রনিকে দায়ী করেন। কিন্তু জিডিতে শাহেদ আকবর লুকোচুরির আশ্রয় নেন।

তিনি ওই এলাকায় যে তিনটি সাইনবোর্ড টাঙিয়েছেন তার মধ্যে একটির বিএস দাগ নম্বর হলো ৯১৫, দ্বিতীয়টির বিএস দাগ নম্বর হলো ৮৯৪/৯১৬ এবং তৃতীয়টির বিএস দাগ নম্বর হলো ৮৯৪/৯১৭। কিন্তু শাহেদ আকবর জিডিতে ৮৯৪/৯১৬ এবং ৮৯৪/৯১৭ বিএস দাগ নম্বর উল্লেখ করেননি। বিএস ৬৭৩ নম্বর খতিয়ানের ৯১৫ নম্বর দাগের দলিলমূলে মালিক হলেন আয়েশা আক্তার নামের এক মহিলা।
কেন জিডিতে ৮৯৪/৯১৬ এবং ৮৯৪/৯১৭ বিএস দাগ নম্বরে টাঙানো সাইনবোর্ডের বিষয়টি গোপন করেছেন শাহেদ আকবর?
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মহানগর যুবদলের সাবেক সহসভাপতি শাহেদ আকবর রাজনীতি সংবাদকে বলেন, ‘আমি যে সাইনবোর্ডের ছবি পেয়েছি, জিডিতে সেটা উল্লেখ করেছি। অপর দুটি সাইনবোর্ডের ছবি আমি পাইনি। আর মাহাবুব আলমের সঙ্গে বিষয়টা মীমাংসা হয়ে গেছে।’
অনুসন্ধানে জানা যায়, লতিফপুর মৌজার বিএস ৬৯৪ নম্বর খতিয়ানের ৮৯৪/৯১৬ ও ৮৯৪/৯১৭ দাগের দলিলমূলে মালিক হলেন ব্যবসায়ী হাজী মাহাবুব আলম ও প্যাসিফিক জিন্স গ্রুপের প্রয়াত চেয়ারম্যান মো. নাসির উদ্দিন। হাজী মাহাবুব আলম যেহেতু এই দুই দাগের মালিক, তাই এই দুটি দাগ নম্বরে টাঙানো সাইনবোর্ডের বিষয়টি কৌশলে জিডিতে উল্লেখ করেননি শাহেদ আকবর। কারণ হাজী মাহাবুব আলম মালিক হয়ে কেন শাহেদ আকবরের নামে নিজের জমিতে সাইনবোর্ড টাঙাবেন?
জানতে চাইলে হাজী মাহাবুব আলম রাজনীতি সংবাদকে বলেন, ‘নিকুঞ্জ আবাসিক এলাকার তিনটি স্থানে শাহেদ আকবর নিজে তার নামে সাইনবোর্ড টাঙিয়েছেন। যখন আমি বিষয়টি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এবং যুবদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে অবহিত করি তিনি সাথে সাথে সাইনবোর্ডগুলো সেখান থেকে সরিয়ে ফেলেন। তিনি জমি দখলের চেষ্টা করে উল্টো আমার বিরুদ্ধে থানায় জিডি করেছেন। কিন্তু তিনি জিডিতে কৌশলে আমার মালিকানাধীন জায়গায় (দাগ নম্বর ৮৯৪/৯১৬ ও ৮৯৪/৯১৭) টাঙানো সাইনবোর্ডের বিষয়টি উল্লেখ করেননি। আমার মালিকানাধীন জায়গায় তার নামে কেন সাইনবোর্ড টাঙাবো? এজন্য তিনি জিডিতে অন্যের মালিকানাধীন জায়গায় (বিএস ৯১৫ নম্বর দাগ) টাঙানো সাইনবোর্ডের বিষয়টি উল্লেখ করে আমার নাম ঢুকিয়ে দিয়েছেন। এ ছাড়া তিনি ফেসবুকে আমাকে আওয়ামী লীগের নেতা হিসেবে তকমা লাগিয়ে দিয়েছেন। আমি এই চাঁদাবাজ ও দখলবাজ নেতার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে বিএনপি ও যুবদলের কেন্দ্রীয় শীর্ষ নেতৃবৃন্দের প্রতি অনুরোধ জানাচ্ছি।’
আপনি চাঁদাবাজি ও জমি দখলের বিষয়ে শাহেদ আকবরের বিরুদ্ধে কেন আইনগত ব্যবস্থা নেননি?-এ প্রশ্নের জবাবে হাজী মাহাবুব আলম বলেন, ‘শাহেদ আকবর চাপ প্রয়োগ করে উত্তর কাট্টলী এলাকার স্থানীয় ইঞ্জিনিয়ার তপন দত্ত নামের এক ব্যক্তির মাধ্যমে গত ৪ ফেব্রুয়ারি আমার কাছ থেকে ৫ লাখ চাঁদা নেয়। তপন দত্ত বলেছিলেন, চাঁদা দিলে শাহেদ আকবর আর ঝামেলা করবেন না। তাই আমি চাঁদা দিয়েছি। কিন্তু চাঁদা দেওয়ার পরও তিনি আবার জায়গা দখলের চেষ্টা করেন। তখন আমি বিষয়টি মৌখিকভাবে সিএমপির পশ্চিম জোনের ডিসিকে জানিয়েছি। এরপর গত ২২ ফেব্রুয়ারি শাহেদ আকবর তার ভাই আশরাফ আলী আছুকে আমার কাছে পাঠিয়ে এ ঘটনার জন্য ক্ষমা চান।’
গত ১৫ ফেব্রুয়ারি শাহেদ আকবর তার ফেসবুক আইডিতে ওই জায়গার বিএস ৯১৫ নম্বর দাগের সাইনবোর্ডের ছবি দিয়ে একটি পোস্ট দেন। সেখানে তিনি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ী হাজী মাহাবুব আলমকে ‘আওয়ামী লীগ নেতা, ভূমি দস্যু’ হিসেবে তকমা লাগিয়ে দেন।

অথচ হাজী মাহাবুব আলম ২০১৬ সালে বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে নগরীর ১২ নম্বর সরাইপাড়া ওয়ার্ড থেকে ডেলিগেট হয়ে যোগ দিয়েছিলেন।

মাহাবুব আলমকে আওয়ামী লীগ নেতার তকমা লাগানোর কারণ জানতে চাইলে যুবদল নেতা শাহেদ আকবর কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির চট্টগ্রাম বিভাগের সহসাংগঠনিক সম্পাদক মীর হেলাল উদ্দিন রাজনীতি সংবাদকে বলেন, ‘বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আমাদের সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, দলের কোনো নেতা-কর্মী অপকর্ম করলে ছাড় দেওয়া হবে না। এক্ষেত্রে দলের অবস্থান জিরো টলারেন্স। শাহেদ আকবরের বিরুদ্ধে অভিযোগের সতত্য পেলে আমরা তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেবো।’
আরও পড়ুন:
ইউনিভার্সিটি থেকে রাজনীতির মাঠে সাঈদ আল নোমান, নানা জল্পনা
চিটাগাং চেম্বারে মেম্বারশিপ নিয়ে ভয়াবহ জালিয়াতি
