, | |

মূলপাতা জাতীয়

শেখ হাসিনাকে অবশ্যই বিচারের মুখোমুখি হতে হবে: নাহিদ


অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
প্রকাশের সময় :১০ আগস্ট, ২০২৪ ৩:১৯ : অপরাহ্ণ

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম বলেছেন, ‘দেশে ফেরার পর শেখ হাসিনাকে অবশ্যই বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ের হত্যাকাণ্ডের জন্য।’

গতকাল শুক্রবার রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন।

নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘শেখ হাসিনা কেন বাংলাদেশ থেকে পালালেন তা জানতে আমি উৎসুক। শেখ হাসিনার সময়ে যেসব হত্যাকাণ্ড হয়েছে, আমরা সেসবের বিচার চাইবো। এটা আমাদের অন্যতম দাবি। যদি তিনি ফিরে না আসেন, তাহলে আমরা সে ব্যাপারে কাজ করবো।’

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এই সমন্বয়ক বলেন, ‘আমরা তাকে গ্রেপ্তার করতে চাই। তার বিচারের ইস্যুতে আলোচনাও চলছে।’

আরেক ছাত্র নেতা আবু বাকের মজুমদার বলেন, ‘আমরা চাই শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আসুক ও বিচারের সম্মুখীন হোক।’

প্রসঙ্গত, আন্দোলনের মুখে নির্বাহী আদেশে ২০১৮ সালে সরকারি চাকরি থেকে কোটা প্রথা বিলুপ্ত করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একটি সংগঠনের রিটের পরিপ্রেক্ষিতে এ বছর গত ৬ জুন হাইকোর্ট আবারও কোটা বহাল করে রায় দেয়। এর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। পরদিন ‘বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী আন্দোলনে’র ব্যানারে সারা দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সংগঠিত হতে থাকেন তারা।

এ ব্যাপারে সরকারপ্রধানের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে দেওয়া বক্তব্য, আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ও ছাত্রলীগের হুমকি আন্দোলনে গতি সঞ্চার করে। আন্দোলনকারীদের রাজাকারের নাতি-পুতি হিসেবে ইঙ্গিত করায় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফেটে পড়েন সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

অভিমানে নিজেদের রাজাকার আখ্যা দিয়ে তারা স্লোগান দেন সারাদেশের ক্যাম্পাসে। অবস্থা বেগতিক দেখে ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও পুলিশকে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার নির্দেশ দেয় আওয়ামী লীগ। সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে[ সংঘাত। ১৬ জুলাই রংপুরে সংঘর্ষ চলাকালে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানো শিক্ষার্থী আবু সাঈদ পুলিশের গুলিতে শহীদ হন।

এ দৃশ্য লাইভে দেখে হতভম্ব হয়ে যায় পুরো জাতি। ছড়িয়ে পড়ে ক্ষোভের আগুন সবখানে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দমন-পীড়নও বেড়ে যায় কয়েকগুণ। সমন্বয়কদের কয়েকজনকে গুম এবং পরে তুলে নিয়ে আটকে রাখা হয় ডিবি অফিসে। তাদের দিয়ে জোর করে আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা পাঠ করান সমালোচিত ডিবি পুলিশ কর্মকর্তা হারুন অর রশিদ।

এদিকে, আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগ দেয় অভিভাবক, শিক্ষক, নানা শ্রেণির পেশাজীবী ও সাধারণ মানুষ। ঢাকার আকাশে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হেলিকপ্টার মোতায়েন করা হয়। গুলিতে ঝাঁজরা হয়ে মারা যায় ফুটফুটে শিশু, মেধাবী শিক্ষার্থী, নিম্ন আয়ের মানুষ, পথচারীসহ অনেকে। প্রতিদিন রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় লাশ পড়তে থাকে। সাউন্ড গ্রেনেডের শব্দ, টিয়ার গ্যাসের শেল, বাতাসে বারুদের গন্ধে এক যুদ্ধ পরিস্থিতি দেখা দেয় দেশে।

আন্দোলনকারীদের ডাকে একের পর এক অভিনব কর্মসূচির সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করতে থাকে কবি-শিল্পী-সাংস্কৃতিক কর্মীসহ বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন। বিএনপিসহ বেশিরভাগ বিরোধী রাজনৈতিক দল শুরু থেকে সহযোগিতা করে আসছিল। শুরুতে কোটা বাতিল চাইলেও আস্তে আস্তে চার এবং ৯ দফায় ওঠে আন্দোলন।

এরই মধ্যে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে যোগ দিয়ে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় স্থাপনা ধ্বংস করে দুর্বৃত্তরা। প্রধানমন্ত্রী সেসব পরিদর্শনে গিয়ে সম্পদের জন্য কান্নাকাটি করেন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কঠোর হওয়ার নির্দেশ দেন। কারফিউ জারি করার মধ্য দিয়ে সরকার নিজের কফিনে নিজেই শেষ পেরেক ঠুকে দেন।

শিক্ষার্থীদের দাবি মানা হবে বললেও তাদের ওপর হামলা-মামলা-গ্রেপ্তার চলতেই থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করলেও আন্দোলন দমনে সরকারের ব্যর্থতা প্রকাশিত হতে থাকে। দিন দিন দানা বেঁধে ওঠে গণঅভ্যুত্থানের ডাক।

অনেক দেরিতে টনক নড়ে সরকারের। আলোচনার প্রস্তাব দেন সরকারপ্রধান। কিন্তু আন্দোলনকারীরা সে প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয়। ৩ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বিকেলে আন্দোলনকারীদের ডাকে সর্বস্তরের মানুষ জড়ো হলে এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হয়। স্বতঃস্ফূর্ত এক অভ্যুত্থান থেকে সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম ৪৮ ঘণ্টা সময় বেঁধে দিয়ে একদফা ঘোষণা করেন। হাজারও জনতা সমস্বরে প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিকে সমর্থন করেন এক আঙুল দেখিয়ে। বাঙালির অহংকারের শহীদ মিনার, মুক্তির সোপানতল আবারও একটি আবেগের সাক্ষী হয়ে রইল।

পরদিন ৪ আগস্ট ঢাকাসহ সারা দেশে আওয়ামী লীগ প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। এ দিন সারা দেশে ১৪ পুলিশ, শিক্ষার্থী, আওয়ামী লীগ-বিএনপির নেতাকর্মীসহ শতাধিক মানুষ প্রাণ হারায়। সমন্বয়করাও চাইছিলেন আন্দোলনকে দ্রুত পূর্ণতা দিতে। তাই পূর্বঘোষিত কর্মসূচি একদিন এগিয়ে আনেন। ৫ আগস্ট ঠিক হয় ‘মার্চ টু ঢাকা’। ওদিকে, তিন বাহিনী ও অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে ঘন ঘন বৈঠক করেন শেখ হাসিনা।

বারবার ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বন্ধ করেও গুজব আটকাতে ব্যর্থ হয় সরকার। শেষ মুহূর্তে জনগণ মুক্তির আভাস পেলেও বুঝতে পারেনি আওয়ামী লীগ। ৪ আগস্টও আন্দোলনকারীদের জঙ্গি, বিএনপি-জামায়াত, সন্ত্রাসী উল্লেখ করে হামলা অব্যাহত রাখে।।

রাতভর নানা গুঞ্জনের পর ৫ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির সময় লাখো মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। ছাত্র-জনতার অবিস্মরণীয় অভ্যুত্থানের মুখে পতন হয় শেখ হাসিনা সরকারের। ওই দিন বেলা আড়াইটার দিকে শেখ হাসিনা গণভবন থেকে হেলিকপ্টারে করে বঙ্গভবনে যান। সেখানে রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন তিনি। এরপর বিমানবাহিনীর একটি হেলিকপ্টারে করে ছোট বোন শেখ রেহানাকে সঙ্গে নিয়ে দেশ থেকে ভারতে পালিয়ে যান শেখ হাসিনা। তার দেশত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে গণভবন লুট হয় যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাপিটল হিল আক্রমণের স্টাইলে।

শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর তার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকারের টানা সাড়ে ১৫ বছরের ক্ষমতার অবসান ঘটে। এরপর বদলে যেতে শুরু করে দেশের সার্বিক চিত্র।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ও জেলা-উপজেলার বিভিন্ন কার্যালয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। এ ছাড়া নেতাদের মারধর, হত্যা, বাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে।

দেশজুড়ে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যে গত ৬ আগস্ট দুপুরে জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। এরপর ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়।

আরও পড়ুন:

মা পদত্যাগ করেননি, তিনি এখনো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী: জয়

ভারতেই থাকছেন শেখ হাসিনা

কবে দেশে ফিরছেন শেখ হাসিনা, জানালেন জয়

আ.লীগের কেন্দ্রীয় অফিস এখন ছাত্র-জনতার কার্যালয়

সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে আ.লীগকে নিষিদ্ধ করার দাবি

শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছাড়ার শেষ চার ঘণ্টা যা ঘটেছিল

আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী মন্ত্রী-এমপিরা কে কোথায়

মন্তব্য করুন
Rajniti Sangbad


আরও খবর