গুম-খুনের ঘটনায় মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার সাক্ষীর জবানবন্দিতে জেনারেল (অব.) ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেছেন, আমি সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে জানতে পারি, মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিকের ছত্রছায়ার ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ এর কিছু ব্যক্তি নিয়মিত ডিজিএফআইয়ের অফিস পরিদর্শন করতো। সেখানে সাতটি মিটিং রুম ছিল। এর একটিতে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ কে কাজ করতে দেওয়া হতো।
আজ সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলে ইকবাল করিম ভূঁইয়ার সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়। প্যানেলের অপর সদস্য হলেন-বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ।
‘জঙ্গি’ বানাতে ডিজিএফআইকে তালিকা দিতো ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’
ইকবাল করিম ভূঁইয়া তার জবানবন্দিতে বলেন, ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ বিভিন্ন সময়ে কিছু ব্যক্তিকে জঙ্গি হিসেবে চিহ্নিত করে তালিকা দিতো ডিজিএফআইয়ের কাছে। এ তালিকার ওপর নির্ভর করে ডিজিএফআই কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নিয়েছে কিনা, তা আমার জানা নেই।
ছয়জনকে হত্যা করার কথা জানান র্যাব-ফেরত দুই সেনা কর্মকর্তা
ইকবাল করিম ভূঁইয়া জবানবন্দিতে বলেন, একজন কনিষ্ঠ কর্মকর্তা র্যাব থেকে প্রত্যাবর্তনের পরে আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য আমার অফিসে আসেন। র্যাব থেকে যারা ফিরে আসত, তাদেরকে আমি প্রথম প্রশ্ন করতাম-তারা কতজন মানুষ হত্যা করেছে? আমি এ অফিসারকে একই প্রশ্ন করেছিলাম। সে উত্তরে বললো, ছয়জন। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ছয়জনকে কি তুমি সরাসরি হত্যা করেছো? উত্তরে সে বলল, দুজনকে সে সরাসরি হত্যা করেছে এবং বাকি চারজনকে হত্যার সময় সে উপস্থিত ছিল। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, প্রতিটি হত্যার জন্য কত টাকা করে পেয়েছো? উত্তরে সে বলল, ১০ হাজার টাকা। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, টাকা নিয়ে কী করেছো? উত্তরে সে বললো, তার গ্রামের মসজিদে অনুদান হিসেবে টাকাগুলো দিয়েছে। আমি অনুধাবন করতে পারলাম, এই কাজগুলো সে ইচ্ছার বিরুদ্ধে করেছে এবং অপরাধবোধ থেকে সে টাকাগুলো মসজিদে দান করেছে।
সাবেক এই সেনাপ্রধান বলেন, দ্বিতীয় ঘটনাতে একজন লে. কর্নেল আমার সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য অফিসে আসে। আমি তাকেও জিজ্ঞাসা করি, কতজনকে হত্যা করেছো? সে বললো, ছয়জন। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম কেন করেছো? উত্তরে সে বললো, ঊর্ধ্বতন অফিসারের আদেশ পালন করেছি। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, আমি তোমার ঊর্ধ্বতন অফিসার কিনা? সে বললো, হ্যাঁ। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, আমি যদি আমার হাগু তোমাকে খেতে বলি খাবে কিনা? সে বললো, না। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম নিরস্ত্র বেসামরিক ব্যক্তিকে হত্যা করা এবং হাগু খাওয়ার মধ্যে কোনটা নিকৃষ্ট? সে বললো, নিরস্ত্র বেসামরিক ব্যক্তিকে হত্যা করা। আমি তাকে বললাম, তাহলে কেন করেছো? উত্তরে সে নিশ্চুপ থেকেছে।
জবানবন্দিতে ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেন, তৃতীয় ঘটনাতে একজন মেজর, যিনি আগে আমার সঙ্গে চাকরি করেছেন। র্যাবে পোস্টিং হওয়ার কিছুদিন পর তিনি আমার সঙ্গে সেনাভবনে দেখা করেন। তার আগের একটি ঘটনা আমার কর্ণপাত হওয়ার কারণে আমি তাকে ওই বিষয়ে জিজ্ঞাসা করি। ঘটনাটি ছিল-হোটেল রেডিসনে চাকরিরত একটি মেয়েকে কিছু দুর্বৃত্ত রাতে বাড়ি ফেরার সময় ধর্ষণ ও হত্যা করে। র্যাব পরে সেই ব্যক্তিদের হত্যা করে, যাদের মধ্যে উক্ত মেজরও ছিল। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করি, তুমি আইন নিজের হাতে কেন তুলে নিয়েছো? সে বললো, এই ব্যক্তিগুলো সমাজবিরোধী এবং তাদের বেঁচে থাকার অধিকার নেই। আমি তাকে বললাম, তুমি যে আইন ভঙ্গ করে তাদেরকে হত্যা করেছো, তুমিওতো সমাজবিরোধী। সে এরপর নিশ্চুপ হয়ে যায়। পরবর্তীতে আমি তাকে প্রতিজ্ঞা করাই যেন সে র্যাবে আর এই ধরনের কাজ না করে। তবে হতাশার সঙ্গে দেখি, কিছুদিন পর ওই মেজর ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়েছে। এতে দেখা যায়, শাপলা চত্বরের ধোঁয়াটে পটভূমিতে সে ও কর্নেল জিয়া একে অপরের কাঁধে হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে। অসংখ্য ইন্টারভিউয়ের (সাক্ষাৎকারের) মধ্যে এগুলো ছিল অল্প কয়েকটি উদাহরণ। শাপলা চত্বরের ঘটনাটি আমরা সবাই জানি।

র্যাব হত্যা করার পর পেট চিরে নাড়িভুড়ি কেটে ইট-পাথর বেঁধে নদীতে ডুবিয়ে দিতো
সাক্ষী ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেন, এবার র্যাবের কথা বলছি। সেনাপ্রধান হওয়ার পূর্ব থেকেই অন্যান্য সামরিক সদস্যদের মতোই র্যাব সদস্যদের অবৈধ ও বিচার বহির্ভূত কার্যক্রম সম্পর্কে অবহিত ছিলাম। সেনাপ্রধান হবার পর পরই আমি র্যাবের এডিজি তৎকালীন কর্নেল (পরবর্তীতে লে. জেনারেল) মুজিবকে আমার অফিসে ডেকে পাঠাই এবং এসব ক্রসফায়ার বন্ধ করতে বলি। আমি তাকে র্যাব ইন্টেলিজেন্সের প্রধান লে. কর্নেল জিয়াউল আহসানকে নিয়ন্ত্রণ করতে বলি। তিনি আমাকে কথা দেন আর এ ধরনের ঘটনা ঘটবে না। পরবর্তীতে কিছুদিন আমি পত্রিকাতে ক্রসফায়ারের ঘটনা দেখিনি। কিন্তু অচিরেই উপলব্ধি করতে পারি ঘটনা ঘটছে, কিন্তু তা চাপা দেওয়া হচ্ছে। পরিস্থিতি আরও বদলে যায়, যখন বেনজীর আহমেদ র্যাবের ডিজি হয়ে আসেন এবং জিয়াউল আহসান এডিজি হন।
সাবেক এই সেনাপ্রধান তার জবানবন্দিতে বলেন, আমি শুনেছি, র্যাব যাদেরকে হত্যা করতো, তাদের পেট চিরে নাড়িভুড়ি বের করে ইট পাথর বেঁধে নদীতে ডুবিয়ে দিত। র্যাবের এসব কর্মকাণ্ড দেখতে আমি বিভিন্ন ডিভিশন ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান ভিজিট করতে থাকি এবং অফিসারদেরকে এসব কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতে মোটিভেট করতে শুরু করি। একপর্যায়ে সেনাবাহিনীর যত কমান্ডিং অফিসার আছে, তাদেরকে ঢাকায় এনে জুনিয়র অফিসারদের প্রতি তাদের কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন করি। তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেই, শেখ মুজিব ও জিয়া হত্যার সঙ্গে সম্পৃক্ততার কারণে অনেক অফিসারের ফাঁসি হয়েছে। ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলায় আরও কিছু সামরিক অফিসার ফাঁসির দণ্ড মাথায় নিয়ে হাজতবাস করছে। এতকিছুর পরও যখন বুঝতে পারি-ক্রসফায়ার থামছে না, তখন আমি ডিজিএফআই, বিজিবি ও র্যাব থেকে অফিসার নিয়ে আসা এবং পোস্টিং করা বন্ধ করে দেই। এ সময় অনেকে আমাকে মনে করিয়ে দেন, আমি যা করছি তা বিদ্রোহের শামিল। আমার উত্তর একটাই ছিল-হাশরের ময়দানে আমাকে আল্লাহর কাছে জবাব দিতে হবে।
সেনাবাহিনী র্যাবে গিয়ে পেশাদার খুনি হয়ে ফেরত আসছে
ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেন, আমাকে যে জিনিসটা সবচেয়ে ব্যথিত করতো, তা হলো আমরা সেনাবাহিনী থেকে র্যাবে পেশাদার অফিসার পাঠাচ্ছি, আর তারা পেশাদার খুনি হয়ে ফেরত আসছে। এরপর আমি সিদ্ধান্ত দেই র্যাব, ডিজিএফআই ও বিজিবিতে কোনো অফিসার পোস্টিংয়ে যাওয়ার পূর্বে এবং পরে আমার ইন্টারভিউতে আসবে। যারা র্যাবে যেত তাদেরকে আমি এই বলে মটিভেট করতাম, নরহত্যা মহাপাপ এবং কাউকে হত্যা করলে তার পরিবারের অভিশাপ তোমার পরিবারের ওপর পড়বে।
সাবেক এই সেনাপ্রধান ট্রাইব্যুনালকে বলেন, একজনকে হাত-পা বেঁধে হত্যা করা অত্যন্ত কাপুরুষোচিত কাজ। সত্যিকারের সাহস হচ্ছে, হাত-পা খুলে তার হাতে একটি অস্ত্র দিয়ে সম্মুখ যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া। যারা ফেরত আসত, তাদের কাছে বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডের রোমহর্ষক বর্ণনা শুনে আমি সেনাবাহিনীর ভবিষ্যত নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লাম। আমি (তৎকালীন) প্রধানমন্ত্রীর (শেখ হাসিনা) সঙ্গে দেখা করে সেনাবাহিনীর র্যাব সদস্যদেরকে সেনাবাহিনীতে ফেরত আনার জন্য আবেদন জানাই। তিনি স্বীকার করেন, র্যাব রক্ষীবাহিনীর চেয়েও খারাপ। তিনি কোনো কথা দেননি এবং পরবর্তীতে এ নিয়ে আর কোনো পদক্ষেপ নেননি।
র্যাব-ডিজিএফআই বিলুপ্ত করা হোক
ইকবাল করিম ভূঁইয়া ট্রাইব্যুনালকে বলেন, আমরা যতই অস্বীকার করার চেষ্টা করি না কেন, সেনাবাহিনী কলুষিত হয়েছে। আত্মশুদ্ধির যে সুযোগ এসেছে তা কোনো অবস্থাতেই হেলায় হারানো আমাদের উচিত হবে না। এতে সেনাবাহিনীর গৌরব ক্ষুণ্ণ হবে না বরং সেনাবাহিনী গৌরবের উচ্চ শিখরে আসীন হবে। পুরো জাতি জানবে, সেনাবাহিনী কখনো দোষী ব্যক্তিদের ছাড় দেয় না। আমি চাই, র্যাব অবিলম্বে বিলুপ্ত করা হোক। সেটি সম্ভব না হলে সামরিক সদস্যদেরকে সামরিক বাহিনীতে ফিরিয়ে আনা উচিত। আমি আরও চাই, ডিজিএফআইকেও বিলুপ্ত করা হোক। কারণ, এই সংস্থাটি আয়নাঘরের মতো অপসংস্কৃতি জন্ম দেওয়ার পরে টিকে থাকার বৈধতা হারিয়েছে।
আরও পড়ুন: পিলখানা হত্যাকাণ্ডের পর সেনাবাহিনীতে ভারত-আ.লীগ বিদ্বেষ তীব্র হয়
