, | |

মূলপাতা চট্ট-মেট্টো

বিতর্কের কেন্দ্রে চট্টগ্রামের মেয়র ডা. শাহাদাত


রাজনীতি সংবাদ প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম প্রকাশের সময় :১০ অক্টোবর, ২০২৬ ৭:০৯ : অপরাহ্ণ

২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১১ আসন (বন্দর-পতেঙ্গা) থেকে এম এ লতিফ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর একের পর এক বিতর্কে জড়িয়েছিলেন। এমপি হতে না হতেই তিনি রুদ্রমূর্তিতে আবির্ভূত হন। চট্টগ্রাম বন্দরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে খবরের শিরোনাম হয়েছিলেন লতিফ। এরপর পতেঙ্গায় দুই পুলিশ কর্মকর্তাকে লাঞ্ছিত এবং বিমানের ফ্লাইটে পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছিলেন তিনি। আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি লতিফের মতো চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনও হঠাৎ রুদ্রমূর্তিতে আবির্ভূত হয়েছেন। একের পর এক বিতর্কের জন্ম দিচ্ছেন তিনি।

মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন সম্প্রতি একটি প্রাইভেট কারের চালককে কান ধরে ওঠবস করান এবং একই সময়ে এক ট্রাফিক সার্জেন্টকে শাসান। এরপর ওয়াকিল হোসেন বগা নামের পুলিশের তালিকাভুক্ত এক সন্ত্রাসী কিশোর গ্যাং নেতাকে ‘জুলাইযোদ্ধা’ হিসেবে আখ্যায়িত করে সমালোচনার মুখে পড়েন। বিতর্কের শেষ নেই তার। চট্টগ্রাম সিটির মেয়র হয়ে বাঁশখালীর মানুষদের ‘মামলাবাজ’ ও ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন তিনি। এই চারটি বিতর্কিত ঘটনায় মেয়র ডা. শাহাদাতের বিরুদ্ধে তুমুল সমালোচনা করছেন চট্টগ্রামের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ।

গত ৬ অক্টোবর নগরীর চকবাজার এলাকায় উচ্ছেদ অভিযানে যান মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। তখন ওই এলাকায় অবৈধভাবে সড়কে পার্কিং করেছিলেন এক কারচালক। অভিযানে গিয়ে বিষয়টি দেখে ক্ষুব্ধ হন মেয়র। তখন তিনি ওই গাড়িচালককে বের হতে নির্দেশ দেন।

একটি ভিডিওতে দেখা যায়, কারচালককে উদ্দেশ করে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘বাইর হ। এই শোন, তুই এখানে গাড়ি রাখছস আজকে জরিমানা হবে তোর। কান ধরো, ১০ বার ওঠাবসা করো। টাকা না দিলে…টাকা যে দিতে চাইবে না কান ধরে ওঠাবসা করান।’

অভিযানের সময় গাড়িচালককে কান ধরে ওঠবস করানোর বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মেয়রের সমালোচনা করেছেন নেটিজেনরা। প্রকাশ্যে একজন নাগরিককে কান ধরে ওঠবস করানো নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।

মেহেদী হাসান জুয়েল নামের এক নেটিজেন লিখেন, ‘‘একজন ড্রাইভার ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করলে প্রচলিত আইনে তার বিরুদ্ধে মামলা, জরিমানা কিংবা আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু একজন মেয়র কোন আইনের ক্ষমতাবলে প্রকাশ্যে একজন ড্রাইভারকে কান ধরে ওঠবস করাতে পারেন? আইন ভঙ্গের শাস্তি দেওয়ার দায়িত্ব আইন প্রয়োগকারী সংস্থার-কোনো জনপ্রতিনিধির ব্যক্তিগত এখতিয়ার নয়। আইন যদি সবার জন্য সমান হয়, তাহলে মেয়রও আইনের ঊর্ধ্বে নন। নাকি ক্ষমতার চেয়ার পেলেই আইন নিজের মতো করে প্রয়োগ করার লাইসেন্সও পাওয়া যায়?’’

কারচালককে কান ধরে ওঠবস করানোর পর নগরীর গোলপাহাড় মোড় এলাকায় গিয়ে দায়িত্বরত এক ট্রাফিক সার্জেন্টের ওপর চড়াও হন মেয়র। ট্রাফিক সার্জেন্টকে কড়া ভাষায় শাসান ডা. শাহাদাত। তাকে উদ্দেশ করে মেয়র বলেন, ‘এই মিয়া, এখানে মানুষ হাঁটতে পারতেছে? তাহলে তোমরা দেখো না এগুলি? তুমি কি ট্রাফিক বিভাগে চাকরি করো? এখানে দায়িত্ব তুমি?’

এ সময় ওই ট্রাফিক সার্জেন্ট সম্মতিসূচক মাথা নাড়েন।

এরপর মেয়র ক্ষিপ্ত হয়ে বলেন, ‘তোমার এখানে সব গাড়ি। এখানে গাড়ি কেন? কিসের চাকরি করতেছ? আমি তোমার চাকরিসহ নট করে দিবো। আমি বলে দিলাম। আমি লাস্ট ওয়ার্নিং দিচ্ছি তোমার এখানে যদি আমি গাড়ি দেখি।’

ট্রাফিক সার্জেন্টকে শাসানো নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেটিজেনরা মেয়র ডা. শাহাদাতের ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্ন তোলেন।

এ ঘটনা নিয়ে আরফিন জুয়েল নামের একজন নেটিজেন তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি পোস্ট দিয়েছেন। এতে তিনি লিখেন, ‘‘সার্জেন্টের সঙ্গে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র মহোদয় যেভাবে ‘তুমি’, ‘তোমার’ ‘এ মিয়া’ সম্বোধন করে কথা বলেছেন এবং বারবার চাকরি নিয়ে নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন, সেখানে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, কোন ক্ষমতাবলে একহন জনপ্রতিনিধি পুলিশ সদস্যের চাকরি ‘নট’ করে দেওয়ার কথা বলেন? তার কি আইনগতভাবে সেই ক্ষমতা রয়েছে? পুলিশের দায়িত্ব পালনের বিষয়ে আপত্তি থাকলে সেটি কি প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতিতে জানানো যেত না?’’

বিতর্কের শেষ নেই মেয়র ডা. শাহাদাতের! গত ৬ অক্টোবর রাত ৮টার দিকে নগরীর খুলশী এলাকার ওয়াকিল হোসেন বগা নামের পুলিশের তালিকাভুক্ত এক শীর্ষ ‘সন্ত্রাসী’ চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন কার্যালয়ে অবস্থান করার গুঞ্জন ছড়ায়। এ খবর শুনে খুলশী থানার ওসি আব্দুর রহিমের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল নগর ভবনে অভিযানে যান। ওই সময় নিজ কার্যালয়ে অবস্থান করছিলেন সিটি মেয়র। প্রায় এক ঘণ্টা অবস্থানের পর রাত ৯টার দিকে বগাকে গ্রেপ্তার না করেই নগর ভবন ত্যাগ করে পুলিশ। অভিযোগ উঠে, মেয়রের হস্তক্ষেপের কারণে গ্রেপ্তার এড়ান সন্ত্রাসী বগা।

ওয়াকিল হোসেন বগা কিশোর গ্যাং লিডার ও নগর স্বেচ্ছাসেবক দলের বহিষ্কৃত যুগ্ম আহ্বায়ক।

এ ঘটনার একদিন পর বগার পক্ষ নিয়ে ডা. শাহাদাত হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘ওয়াকিল কোনো আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী নয়। সে গত ১৭-১৮ বছর ধরে আন্দোলন সংগ্রামে ছিল। ওয়াকিল একজন জুলাইযোদ্ধা। গত ১৬ বছরে তাকে প্রায় ৭০-৮০ টা মামলা দিয়েছে আওয়ামী লীগ।’

মেয়রের এ বক্তব্য প্রসঙ্গে নগর স্বেচ্ছাসেবক দলের একজন শীর্ষ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাজনীতি সংবাদকে বলেন, বগা কীভাবে জুলাইযোদ্ধা হলো? সে ওই সময় কোথায় আন্দোলন করেছিল? একজন সন্ত্রাসীকে জুলাইযোদ্ধা বলার কারণে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে।

বিতর্ককে যেন সঙ্গী করে নিয়েছেন মেয়র ডা. শাহাদাত! গত ৭ অক্টোবর নগরীর ঈদগাঁহ এলাকায় সিটি কর্পোরেশনের মশক নিধন ও পরিচ্ছন্নতা অভিযানে গিয়ে বাঁশখালীর মানুষদের ‘সন্ত্রাসী’ ও ‘মামলাবাজ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন তিনি।

একটি ভিডিওতে দেখা যায়, মেয়র ডা. শাহাদাত স্থানীয় একজন দোকানদারের কথার জবাবে ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, ‘বাঁশখাইল্লা পোয়া-অল মামলা গরাত হাবিল, বাঁশখাইল্লা পোয়া-অল বেক সন্ত্রাস’ (বাঁশখালীর ছেলেরা সবাই সন্ত্রাস, বাঁশখালীর ছেলেরা মামলা করতে পটু)।

ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেশে ও প্রবাসে থাকা বাঁশখালীবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। তারা এ মন্তব্যের জন্য মেয়রকে ক্ষমা চাওয়ার হুঁশিয়ারি দেন। সমালোচনার মুখে ওই দিন (৭ অক্টোবর) দিবাগত রাত ১২টা ১২ মিনিটে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে এক স্ট্যাটাসে দুঃখ প্রকাশ করেন মেয়র ডা. শাহাদাত। বাঁশখালীবাসীকে ‘সাহসী’ বলতে চেয়েছিলেন দাবি করে তিনি লেখেন, এই মন্তব্যে বাঁশখালীর মানুষ কষ্ট পাওয়ায় তিনি আন্তরিকভাবে ব্যথিত ও ক্ষমাপ্রার্থী।

কিন্তু মেয়রের এই পোস্ট নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেটিজেনদের অনেক প্রশ্ন তোলেন। এম ডি মাহবুব নামের এক নেটিজেন পোস্টে লিখেন, ‘মেয়াদ উত্তীর্ণ মেয়র সাহেব, আপনি যদি বাঁশখালীর মানুষকে বোকা মনে করেন তাহলে আমি বলবো আপনি নিজেই বোকার স্বর্গে বাস করছেন। আচ্ছা কেউ যদি সাহসী হয়, তাকে কি সন্ত্রাসী বলা যায়?’

এসব বিতর্কিত ঘটনার বিষয়ে জানতে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের সঙ্গে আজ শনিবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

উল্লেখ্য, আইন অনুযায়ী, সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের মেয়াদ ধরা হয় প্রথম সাধারণ সভা থেকে পরবর্তী পাঁচ বছর। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ৬ষ্ঠ নির্বাচিত পরিষদের মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরীর নেতৃত্বে প্রথম সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০২১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি। সে হিসেবে চলতি বছরের গত ২৩ ফেব্রুয়ারি মেয়রের মেয়াদ শেষ হয়। কিন্তু ডা. শাহাদাত হোসেন এখনো মেয়র পদে আছেন। তিনি এখন কোন আইনের ভিত্তিতে মেয়র পদে আছেন তা নিয়ে নগরবাসীদের অনেকে প্রশ্ন তুলছেন।

আরও পড়ুন: ডা. শাহাদাত এখন কীভাবে মেয়র পদে আছেন?

Rajniti Sangbad


আরও খবর