অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে কয় দিন টিকতে পারবে বাংলাদেশ-সিরিজ শুরুর আগে এমন আলোচনা হচ্ছিল ক্রিকেটাঙ্গনে। তার ওপর প্রস্তুতি ম্যাচে ব্যাটারদের বাজে পারফরম্যান্স। সবমিলে বেশ চাপেই ছিল সফরকারীরা। চাপের মুখে ইতিহাস গড়েই সবকিছুর জবাব দিলো নাজমুল হোসেন শান্তর দল। যে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এতদিন জয় বা ড্র ছিল অধরা, সেই অস্ট্রেলিয়াকেই ডারউইনে হারিয়ে ইতিহাস লিখলো টাইগাররা।
সিরিজের প্রথম টেস্টে অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়েছে বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এটাই বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয়। শুধু একটি ম্যাচের জয় নয়, বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। টানা চারদিন অসিদের অহংকার চূর্ণ করে দাপুটে ক্রিকেট উপহার দিয়েছে টাইগাররা।
ম্যাচের তৃতীয় দিনেই নাজমুল হোসেন শান্তর দল পাচ্ছিল জয়ের সুবাস। চতুর্থ দিনে জয়টা কত দ্রুত ধরা দেয়, সেটাই ছিল দেখার বিষয়। ঐতিহাসিক জয়ের ক্ষুধায় উন্মুখ মেহেদী হাসান মিরাজ ও হাসান মাহমুদরা কোনো আত্মতুষ্টিতে ভোগেননি, বরং অসিদের ছুঁড়ে দেওয়া সব চ্যালেঞ্জ দারুণভাবে মোকাবিলা করে অনবদ্য এক পারফরম্যান্স উপহার দিয়েছেন। আর তাতেই ধরা দিলো ঐতিহাসিক সাফল্য-অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম টেস্ট জয়ের ইতিহাস লিখল বাংলাদেশ।
আজ শনিবার জয়ের জন্য বাংলাদেশের সামনে লক্ষ্য ছিল ৫৭ রানের। ১৪.২ ওভারে ১ উইকেট হারিয়েই সেই লক্ষ্যে পৌঁছে যায় বাংলাদেশ।
এর আগে নিজেদের প্রথম ইনিংসে ১৯৮ রানে অলআউট হয়েছিল অস্ট্রেলিয়া। বিপরীতে, নিজেদের প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশ করেছিল ৪২৬ রান। এরপর নিজেদের দ্বিতীয় ইনিংসে অস্ট্রেলিয়া তুলতে পেরেছিল ২৮৪ রান।
জয়ের জন্য বাংলাদেশের সামনে লক্ষ্যটাই ছিল মামুলি; মাত্র ৫৭ রানের। রান তাড়ায় শুরুতেই তানজিদ হাসান তামিমকে হারায় বাংলাদেশ। প্রথম ইনিংসে ১০১ রান এনে দেওয়া এই ব্যাটার এবার ফেরেন রানের খাতা খোলার আগেই। তামিমের বিদায় অবশ্য জয়ের পথে বাধা হতে পারেনি। সাদমান ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে বাকি কাজটুকু সারেন মুমিনুল হক।
দ্বিতীয় উইকেটে সাদমানের সঙ্গে ৫৩ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটি গড়েন মুমিনুল। বিউ ওয়েবস্টারের করা ১৫তম ওভারের দ্বিতীয় বলে বাউন্ডারি মেরে জয় নিশ্চিত করেন সাবেক অধিনায়ক। ২ চারের সাহায্যে ৩০ রান করেন তিনি। ৪ বাউন্ডারিতে সাদমানের অবদান ২৫ রান।
বাংলাদেশ ডারউইন টেস্ট জিতল সাড়ে তিন দিনেই। ব্যাটিং-বোলিং দুই বিভাগেই দারুণ ক্রিকেট খেলে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ইতিহাস গড়ল অতিথিরা। প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশের দাপুটে বোলিংয়ে ১৯৮ রানে গুটিয়ে যায় প্যাট কামিন্সরা। এ স্টিভ স্মিথ (৭১) ছাড়া অস্ট্রেলিয়ার আর কোনো ব্যাটারকে দাঁড়াতে দেয়নি বাংলাদেশ। ৫৫ রানে ৬ উইকেট নিয়ে সবচেয়ে সফল হাসান মাহমুদ।
জবাবে বাংলাদেশ থামে ৪২৬ রানে। তানজিদ সেঞ্চুরির (১০১) পাশাপাশি শান্ত ৮৪, মেহেদী হাসান মিরাজ ৬৫, মুমিনুল এনে দেন ৪৯ রান। প্রথম ইনিংসে ২২৮ রানের লিডই জয়ের ভীত গড়ে দেয় বাংলাদেশকে। পিছিয়ে থেকে দ্বিতীয় ইনিংসে অতি মানবীয় কিছু করতে পারেনি অস্ট্রেলিয়া। ২৮৪ রানে অলআউট হয় তারা। ৫ উইকেট নেন মিরাজ। তানকিনের শিকার তিনটি।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
অস্ট্রেলিয়া (প্রথম ইনিংস): ৫৩ ওভারে ১৯৮/১০ (হেড ২২, ওয়েদেরল্ড ২৩, লাবুশেন ১, স্মিথ ৭১, গ্রিন ১৩, কেয়ারি ১৯, ওয়েবস্টার ১২, কামিন্স ৯, স্টার্ক ১, লায়ন ৭, হেইজেলউড ৪*; তাসকিন ১৬-২-৫৫-২, হাসান মাহমুদ ১৭-৩-৫৫-৬, ইবাদত ১১-২-৩৯-২, মিরাজ ৪-০-১২-০, তাইজুল ৫-০-২৪-০)
বাংলাদেশ (প্রথম ইনিংস): ১৩৮ ওভারে ৪২৬/১০ (সাদমান ২০, তামিম ১০১, মুমিনুল ৪৯, শান্ত ৮৪, মুশফিক ৩৬, লিটন ০, মিরাজ ৬৫, হাসান ১৪, তাইজুল ১৭, ইবাদত ৭, তাসকিন ১৪*; স্টার্ক ২৬-৩-৭৯-২, হ্যাজলউড ২৮-৩-৮৯-৬, গ্রিন ১০-২-৩৪-০, কামিন্স ২৭-৪-৭৫-১, লায়ন ৩১-৪-১০২-১, ওয়েবস্টার ১০-১-২৮-০, হেড ২-০-৪-০, লাবুশেন ৪-১-৪-০
অস্ট্রেলিয়া (দ্বিতীয় ইনিংস): ৯৫.১ ওভারে ২৮৪/১০ (ওয়েদারাল্ড ০, হেড ১৭, লাবুশেন ৩১, স্মিথ ৪৪, ক্যারি ৩০, ওয়েবস্টার ৫, কামিন্স ৮, স্টার্ক ১৮, গ্রিন ১০৪, লায়ন ১৫, হ্যাজলউড ০*; তাসকিন ১৮-৩-৬৬-‘, হাসান ১৯-৩-৫৬-৩, ইবাদত ৮-০-৩৮-০, তাইজুল ১৭-১-৫১-১, মিরাজ ৩৩.১-৬-৬৬-৫)
বাংলাদেশ (দ্বিতীয় ইনিংস): ১৪.২ ওভারে ৫৭/১ (তামিম ০, সাদমান ২৫*, মুমিনুল ৩০*; স্টার্ক ৪-০-১৫-০, হ্যাজলউড ৩-১-৫-১, লায়ন ৫-০-২৩-০, ওয়েবস্টার ২.২-০-১২-০
ম্যাচ সেরা: হাসান মাহমুদ
সিরিজ: দুই ম্যাচ সিরিজে বাংলাদেশ ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে
