, | |

মূলপাতা চট্ট-মেট্টো

চট্টগ্রামের বিএনপির ১৪ প্রার্থীকে কাউন্সিলর ঘোষণা না করায় হাইকোর্টের রুল


রাজনীতি সংবাদ প্রতিবেদক প্রকাশের সময় :১২ এপ্রিল, ২০২৬ ৭:১৫ : অপরাহ্ণ

২০২১ সালে অনুষ্ঠিত চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক) নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা বিএনপির ১৪ কাউন্সিলর প্রার্থী হাইকোর্টে পৃথকভাবে ১৪টি রিট দায়ের করেছেন। ডা. শাহাদাত হোসেনকে মেয়র নির্বাচিত ঘোষণা করা নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালের রায় ও আদেশের প্রেক্ষিতে এসব রিট দায়ের করেছেন তারা। গেজেট বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের মাধ্যমে কাউন্সিলর হিসেবে ঘোষণা ও নিয়োগ দেওয়ার জন্য রিটে আবেদন করেছেন এসব বিএনপি প্রার্থীরা। রিটকারী ১৪ প্রার্থীকে কাউন্সিলর ঘোষণা ও নিয়োগ না দেওয়ার কারণ জানতে চেয়ে চট্টগ্রামের সিটি মেয়রসহ সরকারি সাত কর্মকর্তার প্রতি রুল জারি করেছে হাইকোর্ট। তাদেরকে কারণ দর্শানোর নির্দেশও দিয়েছে হাইকোর্ট।

২০২৪ সালের ১ অক্টোবর বিএনপি প্রার্থী ডা. শাহাদাত হোসেনকে মেয়র ঘোষণা করে রায় দিয়েছিল চট্টগ্রামের নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল। ডা. শাহাদাত মামলার আরজিতে সিটি কর্পোরেশনের ৪১টি ওয়ার্ডে নির্বাচনে নানা অনিয়ম ও ফলাফলে কারচুপির অভিযোগ করেন। এসব অভিযোগ আমলে নিয়ে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী রেজাউল করিমকে নির্বাচিত ঘোষণা বাতিল করে রায় দেয় ট্রাইব্যুনাল।

ট্রাইব্যুনালের এই রায় ও আদেশের ওপর ভিত্তি করে গত বছরের ২ জুলাই থেকে বিএনপির ১৪ কাউন্সিলর প্রার্থী পৃথক পৃথকভাবে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন। রিটের আবেদনে তারা বিএনপির মেয়র প্রার্থী ডা. শাহাদাত হোসেনের মতো ভোটের ফলাফলে কারচুপির শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন। নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালের রায় ও আদেশের প্রেক্ষিতে গেজেট বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের মাধ্যমে কাউন্সিলর হিসেবে ঘোষণা ও নিয়োগ দেওয়ার জন্য রিটে আবেদন জানান এসব বিএনপি প্রার্থীরা।

রিটকারী বিএনপির ১৪ কাউন্সিলর প্রার্থী হলেন-১ নম্বর দক্ষিন পাহাড়তলী ওয়ার্ডের মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম, ৯ নম্বর উত্তর পাহাড়তলী ওয়ার্ডের আব্দুস সাত্তার সেলিম, ১২ নম্বর সরাইপাড়া ওয়ার্ডের সামশুল আলম, ১৩ নম্বর পাহাড়তলী ওয়ার্ডের মো. জাহাঙ্গীর আলম, ১৪ নম্বর লালখান বাজার ওয়ার্ডের আবদুল হালিম শাহ আলম, ১৯ নম্বর দক্ষিণ বাকলিয়া ওয়ার্ডের ইয়াসিন চৌধুরী আছু, ২০ নম্বর দেওয়ান বাজার ওয়ার্ডের মো. লিয়াকত আলী, ২২ নম্বর এনায়েত বাজার ওয়ার্ডের এম এ মালেক, ২৮ নম্বর উত্তর আগ্রাবাদ ওয়ার্ডের এস এম জামাল উদ্দীন জসিম, ২৯ নম্বর পশ্চিম মাদারবাড়ী ওয়ার্ডের মো. সালাহ উদ্দিন, ৩৪ নম্বর পাথরঘাটা ওয়ার্ডের মোহাম্মদ ইসমাইল বালী, ৩৬ নম্বর গোসাইলডাঙ্গা ওয়ার্ডের মো. হারুন (ডক), ৩৭ নম্বর উত্তর মধ্যম হালিশহর ওয়ার্ডের মো. ওসমান এবং ৩৮ নম্বর দক্ষিণ মধ্যম হালিশহর ওয়ার্ডের হানিফ সওদাগর।

রিটকারী বিএনপির কাউন্সিলর প্রার্থীদের ভাষ্য, ভোটে শুধু মেয়র প্রার্থীর ফলাফলে নয়, কাউন্সিলর প্রার্থীদের ফলাফলেও কারচুপি হয়েছে। তাহলে একই নির্বাচনে বিএনপির মেয়র প্রার্থীকে নির্বাচিত ঘোষণা করা হলে কাউন্সিলর প্রার্থীদের কেন নির্বাচিত ঘোষণা করা হবে না?

গত বছরের ১১ ও ১৭ আগস্ট কাউন্সিলর প্রার্থীদের রিটের ওপর শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। রিটের পক্ষে শুনানি করেন সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন। ১১ ও ১৭ আগস্ট শুনানির পর ১৪টি রিটের পৃথক পৃথকভাবে আদেশ দেন বিচারপতি ফাতেমা নজীব ও বিচারপতি মো. হামিদুর রহমান সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ। তবে সব রিটের একই আদেশ দেওয়া হয়।

আদেশে রিটকারী প্রার্থীদের নির্বাচিত কাউন্সিলর হিসেবে ঘোষণা ও নিয়োগ করার ক্ষেত্রে নিস্ক্রিয় থাকায় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়রসহ সরকারি সাত কর্মকর্তাকে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। এ ছাড়া ২০২৪ সালের ১ অক্টোবর চট্টগ্রামের নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালের রায় ও আদেশের আলোকে গেজেট বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের মাধ্যমে রিটকারী প্রার্থীদের কাউন্সিলর হিসেবে ঘোষণা ও নিয়োগের নির্দেশনা কেন দেওয়া হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করা হয়েছে।

সিটি মেয়র ছাড়া যে ৭ সরকারি কর্মকর্তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে তারা হলেন-স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সচিব, নির্বাচন কমিশনের সচিব, প্রধান নির্বাচন কমিশনার, চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার, চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক, চট্টগ্রাম জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা এবং ২০২১ সালে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের সময় দায়িত্বপালনকারী রিটার্নিং অফিসার।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রিটের শুনানিতে হাইকোর্ট বেঞ্চ প্রশ্ন রাখেন, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র কেন এসব প্রার্থীদের কাউন্সিলর হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করলেন না? মেয়র চাইলে নিজ ক্ষমতাবলে তাদের কাউন্সিলর করতে পারতেন। তিনি করলে কাজটা সহজ হতো। রিটের প্রয়োজন হতো না।

জানা গেছে, তিন সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বিবাদীদের নির্দেশ দিয়েছিল হাইকোর্ট। কিন্তু জাতীয় সংসদ নির্বাচন, ঈদের ছুটি ও অবকাশকালীন ছুটির কারণে এখনো রুলের ওপর শুনানি অনুষ্ঠিত হয়নি। তবে চলতি মাসে রুলের ওপর শুনানি অনুষ্ঠিত হতে পারে।

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে,  রুলের শুনানিতে বিএনপি প্রার্থীদের কাউন্সিলর নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো আপত্তি করবে না বলে জানিয়েছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও নির্বাচন কমিশন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৩ নভেম্বর মেয়রের শপথ পড়ানোর পর ডা. শাহাদাত হোসেনকে তৎকালীন স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা এ এফ হাসান আরিফ নাগরিক সেবার জন্য কাউন্সিলর নিয়োগের একটা অনুমতিপত্র দিয়েছিলেন। কিন্তু ডা. শাহাদাত তা বাস্তবায়ন করেননি।

এসব বিষয়ে জানতে সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

জানা গেছে, শপথ গ্রহণের আগে ও পরে ডা. শাহাদাত হোসেনের সঙ্গে বিএনপির ৩৮ জন পুরুষ কাউন্সিলর ও ১৪ জন সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর প্রার্থী কয়েক দফা বৈঠক করেছিলেন। এসব বৈঠকে তিনি বিএনপি প্রার্থীদের কাউন্সিলরের দায়িত্ব দেওয়ার ‘অঙ্গীকার’ করেছিলেন।

জানতে চাইলে ২৯ নম্বর পশ্চিম মাদারবাড়ী ওয়ার্ডের বিএনপির কাউন্সিলর প্রার্থী মো. সালাহ উদ্দিন রাজনীতি সংবাদকে বলেন, ‘ মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের সঙ্গে আমাদের কয়েক দফা বৈঠক হয়েছিল। বৈঠকে তিনি আমাদেরকে কাউন্সিলর করার অঙ্গীকার করেছিলেন। কিন্তু তিনি আমাদের কথা দিয়ে কথা রাখলেন না। এটা খুবই দুঃখজনক।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির একজন কাউন্সিলর প্রার্থী রাজনীতি সংবাদকে বলেন, ডা. শাহাদাত মেয়রের চেয়ারে বসার পর ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গেছেন। কাউন্সিলর নিয়োগ দেওয়া হলে আমাদের কাছে মেয়রকে জবাবদিহি করতে হবে। কাউন্সিলর না থাকায় এখন তাকে জবাবদিহি করতে হচ্ছে না। মূলত এজন্য তিনি কাউন্সিলর নিয়োগ দিচ্ছেন না। তিনি এককভাবে কর্পোরেশন পরিচালনা করতে চান।

উল্লেখ্য, গত ১৫ ফেব্রুয়ারি সিটি কর্পোরেশন কার্যালয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানের তাগিদ দেন।

ডা. শাহাদাত নির্বাচন অনুষ্ঠানের তাগিদ দেওয়ার বিষয়ে বিএনপির একজন কাউন্সিলর প্রার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাজনীতি সংবাদকে বলেন, এটা তার রাজনৈতিক স্ট্যান্টবাজি। তিনি যেখানে কাউন্সিলর নিয়োগ দিতে চান না, সেখানে নির্বাচন চাইবেন?

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির আরেকজন কাউন্সিলর প্রার্থী রাজনীতি সংবাদকে বলেন, কাউন্সিলর নিয়োগ না দিতে ডা. শাহাদাতকে প্ররোচিত করেছেন তার দুই ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) মারুফুল হক চৌধুরী ও জিয়াউর রহমান জিয়া। কাউন্সিলর না থাকায় প্রত্যেকটি ওয়ার্ডে মেয়রের এই দুই পিএস দারোগাগিরি করছেন। কিন্তু কাউন্সিলর নিয়োগ হলে তারা দারোগাগিরি করতে পারবেন না। এজন্য তারা কাউন্সিলর নিয়োগ না দিতে মেয়রেকে প্ররোচিত করেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মেয়রের পিএস মারুফুল হক চৌধুরী রাজনীতি সংবাদকে বলেন, ‘এটা অবান্তর কথা। মেয়র সাহেব কাউন্সিলর প্রার্থীদের কাছে কী অঙ্গীকার করেছেন তা আমি জানি না।’

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর অন্তর্বর্তী সরকার চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সকল কাউন্সিলরদের অপসারণ করে। এরপর ৪১টি ওয়ার্ডে নাগরিক সেবা প্রদান করতে ১৩ জন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেয় চসিক। কিন্তু তারা গত দুই বছর ধরে নগরবাসীকে কাঙ্খিত সেবা দিতে পারছেন না। জন্মনিবন্ধন সনদ, নাগরিকত্ব সনদ, মৃত্যু সনদ ও চারিত্রিক সনদসহ বিভিন্ন সেবা পেতে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন নগরবাসী।

আরও পড়ুন: ডা. শাহাদাত এখন কীভাবে মেয়র পদে আছেন?

মন্তব্য করুন
Rajniti Sangbad


আরও খবর