ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শহীদ শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড নিয়ে প্রথমবার প্রকাশ্যে মুখ খুললেন মামলার অন্যতম প্রধান আসামি শুটার ফয়সাল করিম মাসুদ। তার দাবি, সিসিটিভি ফুটেজে তাকে গুলি করতে দেখা যায়নি। তবে ঘটনার সময় বাংলাদেশে ছিলেন বলে স্বীকার করেছেন তিনি।
আজ রোববার হাদি হত্যা মামলার প্রধান দুই আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ও আলমগীর হোসেনকে পশ্চিমবঙ্গের স্থানীয় আদালতে পাঠানো হয়। ১৪ দিনের পুলিশ রিমান্ড শেষে উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার বিধাননগর মহকুমার বিশেষ আদালতে তোলা হয় তাদের। আদালত থেকে বের হলে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে পড়েন ফয়সাল।
হাদি হত্যাকাণ্ডের সময় আপনি বাংলাদেশে ছিলেন কি না, এর উত্তরে তিনি বলেন, হ্যাঁ ছিলাম।
এসময় সিসিটিভি ফুটেজের প্রসঙ্গে প্রশ্ন করলে ফয়সাল বলেন, আমাকে গুলি করতে দেখা যায়নি।
তাহলে গুলি কে করলো-এর উত্তরে তিনি বলেন, সেটা আমি জানি না।
এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত না হলে ভারতে পালিয়ে এসেছেন কেন-সাংবাদিকদের এই প্রশ্নের কোনো জবাব দেননি হাদি হত্যা মামলার এই আসামি।
গত ৭ মার্চ বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী বনগাঁ এলাকায় অভিযান চালিয়ে ফয়সাল ও আলমগীরকে গ্রেপ্তার করে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের বিশেষ টাস্কফোর্স (এসটিএফ)। এরপর তাদের ১৪ দিনের রিমান্ডে পাঠায় পশ্চিমবঙ্গের একটি আদালত।
৩৭ বছর বয়সী ফয়সাল করিম মাসুদের বাড়ি বাংলাদেশের পটুয়াখালী এলাকায় এবং ৩৪ বছর বয়সী আলমগীর হোসেনের বাড়ি ঢাকায়।
তাদের গ্রেপ্তারের পর এসটিএফ সূত্র জানিয়েছিল, ফয়সাল ও আলমগীর দুজনই হাদিকে হত্যার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তারা উভয়ই মেঘালয় সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করে ও গত কয়েক মাস ধরে বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান করছিলেন।
এদিকে, মেঘালয় সীমান্ত দিয়ে এ দুই আসামিকে ভারতে অনুপ্রবেশে সহায়তা করায় গত ১৩ মার্চ ফিলিপ সাংমা নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে এসটিএফ। তাকে সাতদিনের রিমান্ড দেয় আদালত। রিমান্ড শেষে শনিবার ফিলিপকে আদালতে তোলা হয়।
প্রসঙ্গত, ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান হাদি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। গত বছরের ১২ ডিসেম্বর জুমার নামাজের কিছু পর রাজধানীর পুরানা পল্টনের কালভার্ট রোডে মোটরসাইকেল থেকে ব্যাটারিচালিত রিকশায় থাকা ওসমান হাদিকে গুলি করে দুর্বৃত্তরা। তাঁকে মাথায় গুলি করার পর আততায়ীরা মোটরসাইকেল নিয়ে পালিয়ে যায়। পরে হাদিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। সেখানে ১৮ ডিসেম্বর মারা যান তিনি।
হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর গত ১৪ ডিসেম্বর ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আবদুল্লাহ আল জাবের বাদী হয়ে হত্যাচেষ্টার মামলা করেন। পরে মামলাটিতে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারা যুক্ত হয়। এরপর থানা-পুলিশের হাত ঘুরে মামলার তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় ডিবি পুলিশকে। তদন্ত শেষে সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পি, সাবেক ছাত্রলীগ কর্মী ফয়সাল করিম মাসুদসহ ১৭ জনকে আসামি করে গত ৬ জানুয়ারি হাদি হত্যা মামলার অভিযোগপত্র জমা দেয় গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। ডিবির চার্জশিটে ১৭ আসামির মধ্যে প্রধান আসামি ছিলেন ফয়সাল করিম মাসুদ ও আলমগীর হোসেন ছিলেন দ্বিতীয়।
তবে ডিবির দেওয়া চার্জশিটে অসন্তোষ প্রকাশ করে গত ১৫ জানুয়ারি আদালতে নারাজি আবেদন দাখিল করেন মামলার বাদী। আদালত সেই আবেদন গ্রহণ করে মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য সিআইডিকে নির্দেশ দেন।
ডিবির দাখিল করা চার্জশিটে মোট ১৭ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে, যাদের মধ্যে ১১ জন বর্তমানে কারাগারে এবং প্রধান আসামি ফয়সালসহ ছয়জন পলাতক রয়েছেন। অধিকতর তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ার পর সিআইডি নতুন করে মো. রুবেল নামের একজনকে গ্রেপ্তার করে। রুবেলকে দ্বিতীয় দফায় তিন দিনের রিমান্ডে নেওয়ার পর তিনি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি ইতিমধ্যে দিয়েছেন। পরে তাঁকেও কারাগারে পাঠানো হয়েছে। অর্থাৎ এই মামলায় মোট ১২ জন কারাগারে আছেন।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজপথ, ক্যাম্পাস ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসেন ওসমান হাদি। জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে অভ্যুত্থানের ইতিহাস ধরে রাখতে তিনি গড়ে তোলেন ইনকিলাব মঞ্চ। রাজনৈতিক এই প্লাটফর্মের মাধ্যমে হাদি দেশের মানুষের কাছে একজন পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। তার কর্মকাণ্ড দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
আরও পড়ুন: হাদি হত্যা মামলার প্রধান আসামি ফয়সালসহ দুজন ভারতে গ্রেপ্তার
