, | |

মূলপাতা জাতীয়

পিলখানা হত্যাকাণ্ড: ১৭ বছরেও অমীমাংসিত প্রশ্ন


পিলখানায় বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি) সদর দপ্তরে ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
রাজনীতি সংবাদ প্রতিবেদক প্রকাশের সময় :২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ১১:৩২ : পূর্বাহ্ণ

পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ১৭ বছর আজ। ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি বিডিআরের (বর্তমানে বিজিবি) রাজধানীর পিলখানা সদর দপ্তরে বিদ্রোহের নামে তৎকালীন বিডিআর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদসহ ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জনকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। এ নির্মম, নৃশংস ও ভয়ংকর হত্যাযজ্ঞের মাধ্যমে রচিত হয় বাংলাদেশের ইতিহাসের এক কলঙ্কিত অধ্যায়।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গতবছর বাংলাদেশের ইতিহাসে বিভীষিকাময় ও শোকাবহ এ দিনটি ‘জাতীয় শহীদ সেনা দিবস’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত হয়।

দিবসটি উপলক্ষে আজ বনানীর সামরিক কবরস্থানে ফুল দিয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

বনানী সামরিক কবরস্থানে জাতীয় শহীদ সেনা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠান শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যথোপযুক্ত লোক দিয়েই তদন্ত কমিশন গঠন করেছিল। কমিশনের রিপোর্টে যে সুপারিশগুলো এসেছে, বিচারাধীন যে মামলাগুলো আছে, এই জুডিসিয়াল প্রসেসগুলো সমাপ্ত করা হবে। অন্যান্য সুপারিশগুলো ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে।

ক্ষমতার পালাবদলের পর ইতিহাসের ভয়ংকর এই হত্যাকাণ্ড নতুন করে তদন্ত এবং নেপথ্যের প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের দাবি ওঠে। ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়, আওয়ামী লীগ সরকার হত্যাকাণ্ডের মূল ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। কারণ এর সঙ্গে দলটির কেন্দ্রীয় নেতারা জড়িত, সে সঙ্গে ছিল বিদেশি ষড়যন্ত্রও। অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর ২০২৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর এ ঘটনায় সাত সদস্যের স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়। বিডিআরের সাবেক মহাপরিচালক আ ল ম ফজলুর রহমানকে কমিশনের প্রধান করা হয়। ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর তদন্ত কমিশন প্রতিবেদন জমা দেয়। তবে তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি অন্তর্বর্তী সরকার।

স্বাধীন তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে বর্বর হত্যাকাণ্ডের জন্য ৫১ জনকে দায়ী করা হয়। এদের মধ্যে আছেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৬ রাজনৈতিক নেতা, সাবেক ১২ সামরিক কর্মকর্তা, ৪ ডিজিএফআই, ২ এনএসআই, ৪ র‌্যাব, ৩ বিডিআর, ৫ পুলিশ কর্মকর্তা ও ৩ মিডিয়া কর্মী এবং তৎকালীন নৌ ও বিমানবাহিনী প্রধান।

পিলখানা মামলার নথি অনুযায়ী, ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি ছিল তৎকালীন বিডিআরের বার্ষিক দরবারের দিন। সকাল ৯টায় সদর দপ্তরের দরবার হলে অনুষ্ঠান শুরু হয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন মহাপরিচালক (ডিজি) মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদ, উপমহাপরিচালক (ডিডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম এ বারীসহ বিভিন্ন ইউনিটের কর্মকর্তারা। ওই দিন দরবারে প্রায় ২ হাজার ৫৬০ জন সদস্য উপস্থিত ছিলেন।

দরবার শুরুর পর সকাল ৯টা ২৬ মিনিটে ডিজির বক্তব্য চলাকালে মঞ্চের পেছন দিক থেকে দুজন বিদ্রোহী জওয়ান অতর্কিতে মঞ্চে প্রবেশ করেন, তাদের একজন ছিলেন সশস্ত্র। শুরু হয় বিদ্রোহ। এরপর লাল-সবুজ কাপড় দিয়ে মুখ বাঁধা বিদ্রোহীরা দরবার হল ঘিরে এলোপাতাড়ি গুলি চালাতে থাকে। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে কর্মকর্তাদের সারিবদ্ধভাবে বের করে আনা হয়। দরবার হলের বাইরে পা রাখা মাত্র বিডিআরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদকে লক্ষ্য করে ব্রাশফায়ার করা হয়। একে একে আরও কয়েকজন কর্মকর্তাকে হত্যা করা হয়। এরপর পিলখানার ভেতরে ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম চালাতে থাকে বিদ্রোহীরা। তারা সেনা কর্মকর্তাদের হত্যা করে তাদের পরিবারকে জিম্মি করে ফেলে। পুরো পিলখানায় এক ভীতিকর বীভত্স ঘটনার সৃষ্টি করে।

দুপুর সোয়া ১২টার দিকে বিমান বাহিনীর একটি হেলিকপ্টার থেকে অস্ত্র সমর্পণের আহ্বান জানিয়ে লিফলেট ছোড়া হলে সেটিকেও লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। এ সময় প্রায় আধা ঘণ্টা ধরে চলে এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ। সন্ধ্যার পর বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে নিহতদের লাশ গোপনে সরিয়ে ফেলা ও মাটিচাপা দেওয়ার ঘটনা ঘটে।

২৬ ফেব্রুয়ারি বেলা আড়াইটায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিদ্রোহীদের অস্ত্র সমর্পণ করে ব্যারাকে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান। এরপর বিদ্রোহীরা অস্ত্র সমর্পণের সিদ্ধান্ত নেন। সন্ধ্যা ৬টা থেকে বিদ্রোহীরা অস্ত্র সমর্পণ শুরু করেন।

২৭ ফেব্রুয়ারি পিলখানার ভিতরে সন্ধান মেলে একাধিক গণকবরের। সেখানে পাওয়া যায় তৎকালীন বিডিআরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদ, তার স্ত্রীসহ সেনা কর্মকর্তাদের লাশ।

পিলখানায় নারকীয় এই হত্যার ঘটনায় দুটি মামলা দায়ের করা হয়। এর মধ্যে সেনা কর্মকর্তাদের নিহতের ঘটনায় দণ্ডবিধি আইনে করা হয় হত্যা মামলা। অপরটি হয় বিস্ফোরক আইনে। হত্যা মামলায় ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর বিচারিক আদালতের রায়ে ১৫২ জনকে মৃত্যুদণ্ড, ১৬১ জনকে যাবজ্জীবন এবং সর্বোচ্চ ১০ বছরসহ বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয় ২৫৬ জনকে। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় খালাস পান ২৭৮ জন।

একই ঘটনায় করা বিস্ফোরকদ্রব্য আইনের মামলায় ৮৩৪ জন আসামির মধ্যে পলাতক রয়েছেন ২০ জন। বিচারিক আদালতে মামলাটির সাক্ষ্য গ্রহণ চলছে।

সর্বশেষ পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গত বছরের ১৯ জানুয়ারি ২৫০ জন বিডিআর জওয়ানকে জামিন দেয় আদালত। ২৩ জানুয়ারি ১৭৮ জনকে মুক্তি দেওয়া হয়।

আরও পড়ুন: পিলখানা হত্যাকাণ্ডের পর সেনাবাহিনীতে ভারত-আ.লীগ বিদ্বেষ তীব্র হয়

মন্তব্য করুন
Rajniti Sangbad


আরও খবর