ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বেসরকারি ফলাফলে ভূমিধস বিজয় পেয়েছে বিএনপি। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে বিএনপি জোট। এর মাধ্যমে দীর্ঘ ২০ বছর পর চতুর্থবারের মতো সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিএনপি। সেইসাথে প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন তারেক রহমান।
সব জল্পনা-কল্পনা আর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মেঘ কাটিয়ে গতকাল অনুষ্ঠিত হয় বহুল কাঙ্ক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ ও গণভোট।
সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২৯৯টি আসনের মধ্যে বিএনপি এককভাবে ২০৮টি, বিএনপির শরিকদের মধ্যে গণঅধিকার পরিষদ ১টি, গণসংহতি আন্দোলন ১টি এবং বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) ১টি আসনে বিজয়ী হয়েছে। এরমধ্যে শেরপুর-২, চট্টগ্রাম-৪ ও ৬ আসনে বিএনপির জয়ী হওয়া তিন প্রার্থীর ফল মামলার কারণে স্থগিত আছে।
অপরদিকে জামায়াত এককভাবে ৭১টি, জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১০ দলীয় জোটের মধ্যে এনসিপি ৬টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২টি এবং খেলাফত মজলিস ১টি আসনে জয় পেয়েছে।
বিএনপি-জামায়াত জোটের বাইরে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ১টি আসনে বিজয়ী হয়। এ ছাড়া ৭টি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা বিজয়ী হয়। একজন প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে শেরপুর-৩ আসনে নির্বাচন হয়নি।
বাংলাদেশে সরকার গঠনের জন্য ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে অন্তত ১৫১টি আসনে জয়ের প্রয়োজন হয়। বেসরকারি ফলাফল অনুযায়ী বিএনপি এককভাবেই সেই সংখ্যা অতিক্রম করেছে।
অন্যদিকে, এবারই প্রথমবারের মতো সংসদে প্রধান বিরোধী দল হতে যাচ্ছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। এর আগে জামায়াত বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের অংশ হিসেবে সরকার ও বিরোধী দলে থাকলেও এবারই প্রথম তারা প্রধান বিরোধী শক্তির মর্যাদা পেতে যাচ্ছে।
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রথমবারের মতো ঢাকা-১৭ ও বগুড়া-৬ দুই আসনেই বিজয়ী হয়েছেন। ঢাকা-১৭ আসনে ১২৫টি কেন্দ্রে ৭২ হাজার ৬৯৯ ভোট পেয়েছেন তিনি। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী স ম খালিদুজ্জামান পেয়েছেন ৬৮ হাজার ৩০০ ভোট।
বগুড়া-৬ আসনে তারেক রহমান পেয়েছেন ২ লাখ ১৬ হাজার ২৮৪ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১০ দলীয় জোটের প্রার্থী ও জামায়াতের বগুড়া শহর শাখার আমীর আবিদুর রহমান দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে পেয়েছেন ৯৭ হাজার ৬২৬ ভোট।
তারেক রহমানের অভিষেক ও নেতৃত্ব বিএনপির পক্ষ থেকে আগেই ঘোষণা করা হয়েছিল, দল ক্ষমতায় গেলে বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমানই হবেন দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী।
বিগত ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে গত বছরের ২৫ নভেম্বর দেশে ফেরেন তারেক রহমান। বিএনপির ওয়েবসাইট ও মিডিয়া সেলের তথ্য অনুযায়ী, আশির দশকে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় থেকেই তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ১৯৮৮ সালে বগুড়ার গাবতলী উপজেলা বিএনপির সদস্য হিসেবে তার আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক যাত্রা শুরু। ১৯৯৩ সালে বগুড়ায় গোপন ব্যালটের মাধ্যমে নেতা নির্বাচনের সংস্কৃতি চালু করে তিনি তৃণমূল রাজনীতিতে সাড়া ফেলেন। ২০০২ সালে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব এবং ২০০৯ সালে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তিনি। ২০১৮ সালে বেগম খালেদা জিয়া কারান্তরীণ হওয়ার পর তিনি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে যুগপৎ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন।
গত ৩০ ডিসেম্বর বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া মৃত্যুবরণ করেন। এরপর ৯ জানুয়ারি দলের স্থায়ী কমিটি তারেক রহমানকে চেয়ারম্যান হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়।
উল্লেখ্য, বিএনপির ক্ষমতার ইতিহাস সর্বশেষ ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করেছিল। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া রাষ্ট্রপতির কাছে ইস্তফাপত্র প্রদানের মাধ্যমে সেই মেয়াদের সমাপ্তি ঘটে। এর আগে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের গড়া এই দলটিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া জনপ্রিয়তার শীর্ষে নিয়ে যান। দীর্ঘ ৯ বছর স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনে রাজপথে নেতৃত্ব দিয়ে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া ১৯৯৬ সালেও স্বল্প সময়ের জন্য সরকার গঠন করেছিল বিএনপি।
আরও পড়ুন: গণভোটে ‘হ্যাঁ’ এগিয়ে
