, | |

মূলপাতা চট্ট-মেট্টো

সীতাকুণ্ডে অভিযানে গিয়ে সন্ত্রাসীদের হামলায় র‍্যাব কর্মকর্তা নিহত


সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে র‌্যাবের গাড়িতে হামলা চালায় সন্ত্রাসীরা। ইনসেটে নিহত র‌্যাব কর্মকর্তা মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া।
রাজনীতি সংবাদ প্রতিবেদক প্রকাশের সময় :১৯ জানুয়ারি, ২০২৬ ৯:১৪ : অপরাহ্ণ

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের গহীন পাহাড়ি এলাকা জঙ্গল সলিমপুরে অভিযানে গিয়ে সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার হয়েছে র‌্যাব-৭-এর একটি দল। মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে ৪০০-৫০০ জন সন্ত্রাসী হামলা করে র‍্যাবের ওপর। এ সময় র‌্যাবের এক কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও তিন সদস্য।

আজ সোমবার বিকেল ৪টার দিকে সলিমপুরের ছিন্নমূল এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

নিহত র‌্যাব কর্মকর্তার নাম নায়েব সুবেদার মো. মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া। তিনি র‌্যাব-৭-এ উপ-সহকারী পরিচালক (ডিএডি) পদে কর্মরত ছিলেন। তিনি র‍্যাবে ডেপুটেশনে বিজিবি থেকে যোগ দিয়েছিলেন।

আহতদের উদ্ধার করে চট্টগ্রাম সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

আহতরা হলেন-ল্যান্সনায়েক এমাম, কনস্টেবল রিফাত ও নায়েক আরিফ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জঙ্গল সলিমপুরের শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াছিন বাহিনীর প্রধান ইয়াছিনকে গ্রেপ্তার করতে র‌্যাব সেখানে অভিযান চালায়। এ সময় সেখানে ছিন্নমূল এলাকায় বিএনপির একটি সাংগঠনিক কার্যালয় উদ্বোধনী অনুষ্ঠান চলছিল। এমন সময় র‌্যাবের চার সদস্য কার্যালয়ের দরজা আটকে দিয়ে ইয়াছিনসহ কয়েকজনকে আটকের চেষ্টা করে। তখন সেখানে স্থানীয় একটি মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ জন লোক জড়ো করা হয়। এ সময় ২০-২৫ জন সন্ত্রাসী বিএনপি কার্যালয়ে প্রবেশ করা র‌্যাব সদস্যদের চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। প্রথমে তারা সুবেদার মোতালেব হোসেনের অস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে তার পায়ে গুলি করে। এতে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়তেই চারদকি থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে হামলাকারীরা। এরপর লাঠি, রড, কাঠ যা পেয়েছে তাই দিয়ে তাকে পিটিয়ে ঘটনাস্থলে হত্যা করে।

এরপর সন্ত্রাসীরা র‍্যাবের একজন সোর্সসহ তিনজনকে আলী নগরের পাহাড়ে তুলে নিয়ে যায়। পরে তাদের ওপর ব্যাপক নির্যাতন চালানো হয়। একপর্যায়ে থানা পুলিশ গিয়ে তাদেরকে উদ্ধার করে।

জানা গেছে, র‍্যাবের দলটি সেখান থেকে ফিরে আসার সময় তাদের ওপর আবার হামলা হয়।

ঘটনাস্থলের একটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, সড়কের দুই পাশ থেকে ১৫-২০ জন সন্ত্রাসী লাঠিসোঁটা ও অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে র‌্যাব সদস্যদের বহনকারী দুটি সাদা মাইক্রোবাস গতিরোধ করে এবং গাড়ির কাচ ভাঙচুর করতে থাকে। একপর্যায়ে সাদা পোশাকে থাকা চারজন র‌্যাব সদস্য গাড়ি থেকে নেমে সন্ত্রাসীদের প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেন। তখন মাইক্রোবাস দুটি ঘটনাস্থল ত্যাগের জন্য ঘুরিয়ে নিতে দেখা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ইয়াছিন বাহিনীর সদস্য কালা ইয়াছিন, নুরুল হক ভান্ডারী, ওমর ফারুক, মো. কাজী ফারুকসহ একটি সন্ত্রাসী দল র‍্যাবের ওপর এই অতর্কিত হামলা চালায়।

চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের এসপি মোহাম্মাদ নাজির আহমেদ খান বলেন, ‘র‌্যাবের একটি দল একজন শীর্ষ সন্ত্রাসীকে ধরতে ওই এলাকায় অভিযানে গিয়েছিলো। এ সময় সন্ত্রাসীরা তাদের ওপর অতর্কিত হামলা করে। সন্ত্রাসীদের গুলিতে চারজন র‌্যাব সদস্য গুরুতর আহত হয়েছে। খবর পেয়ে র‌্যাবের অতিরিক্ত ফোর্স এবং আমি নিজে ও থানা পুলিশ গিয়ে তাদের উদ্ধার করে। হাসপাতালে নেওয়ার পর ডিএডি মোতালেব হোসেনকে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। বাকি তিনজন সিএমএইচ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।’

স্থানীয়রা জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় জঙ্গল ছলিমপুর এলাকাটি নিয়ন্ত্রণ করতেন শীর্ষ সন্ত্রাসী মশিউর ও গফুর মেম্বার বাহিনী। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর জঙ্গল ছলিমপুর নিয়ন্ত্রণে নেন স্থানীয় যুবদল নেতা রোকন উদ্দিন মেম্বার। পরে গত বছরের বছরের জুলাইয়ে রোকন উদ্দিন বাহিনী ও ইয়াছিন বাহিনীর আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। এতে অন্তত ২ জন মারা যায়। পরে ৩১ আগস্ট সেনাবাহিনী অভিযান পরিচালনা করে রোকন বাহিনীর সেকেন্ড ইন কমান্ড রেদোয়ানকে গ্রেপ্তার করে। রোকন বাহিনীর পতনের পর পরের দিন ইয়াছিন বাহিনী প্রায় দুই হাজার অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী নিয়ে জঙ্গল ছলিমপুর নিয়ন্ত্রণে নেয়।

উল্লেখ্য, সীতাকুণ্ড থানার আওতাধীন জঙ্গল সলিমপুর এলাকাটি সন্ত্রাসপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত। এখানে প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর সরকারি খাস জমি দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে ভূমিদস্যু ও সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের দখলে রয়েছে। প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা মূল্যের এই বিশাল জমির দখল নিয়ে এলাকায় নিয়মিত খুনোখুনি ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গাড়ি এলাকায় ঢুকলেই পাহারাদাররা আগাম খবর পৌঁছে দেয়। এরপর পাহাড়ের ওপর থেকে গুলি, ককটেল ও ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। ফলে অভিযান চালিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

এর আগেও একাধিকবার জঙ্গল সলিমপুরে অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ ও পাহাড় কাটা বন্ধে অভিযান চালাতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছিল প্রশাসনের লোকজন।

২০২৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর উচ্ছেদ অভিযান শেষে ফেরার পথে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, থানার ওসি ও পুলিশ সদস্যসহ অন্তত ২০ জন আহত হন। ২০২২ সালেও একাধিকবার র‌্যাব, পুলিশ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। গত বছরের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় সরকারি সশস্ত্র সংঘর্ষের ঘটনা আরও বেড়ে যায়।

সর্বশেষ গত বছরের ৪ অক্টোবর জঙ্গল সলিমপুরের আলিনগর এলাকায় ইয়াছিন ও রোকন-গফুর বাহিনীর মধ্যে বন্দুকযুদ্ধ হয়। এতে গুলিবিদ্ধ হয়ে রোকন বাহিনীর এক সদস্য নিহত হন। আহত হন বেশ কয়েকজন। এর পরদিন সেখানে সংবাদ সংগ্রহে গেলে সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার হন দুই সাংবাদিক।

আরও পড়ুন: তারেক রহমানের গাড়িতে খাম সেঁটে পালালো বাইকার, কী ছিল তাতে?

মন্তব্য করুন
Rajniti Sangbad


আরও খবর