সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার স্মরণে আয়োজিত নাগরিক শোকসভায় বিশিষ্টজনেরা বলেছেন, খালেদা জিয়া সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে আজীবন লড়াই করেছেন। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় ছিলেন আপোসহীন। স্বৈরতন্ত্রবিরোধী সংগ্রামে তার অবদান অনন্য। তিনি সাধারণ রাজনীতিবিদ ছিলেন না। ছিলেন রাজনৈতিক আদর্শ। দেশপ্রেমকে তিনি আজীবন লালন করেছেন। এ দেশের মানুষ অনন্তকাল তাকে শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় স্মরণ করবেন। কারণ যদি বাংলাদেশকে ভালো থাকতে হয়, তাহলে বেগম খালেদা জিয়াকে ধারণ করতে হবে। তার আদর্শই হবে আগামীর বাংলাদেশের চালিকাশক্তি।
আজ শুক্রবার বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় ‘অপরাজেয় বেগম খালেদা জিয়া’ শীর্ষক নাগরিক শোকসভায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
স্মরণসভায় দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা, কূটনীতিক, সাংবাদিক, উন্নয়নকর্মী, শিক্ষাবিদ, গবেষক, সম্পাদক ও ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি–পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন।
শোকসভায় যোগ দেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান, তার স্ত্রী জোবাইদা রহমান, মেয়ে জাইমা রহমান, খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শর্মিলা রহমানসহ পরিবারের সদস্যরা।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ জে আর মোদাচ্ছির হোসেন বলেন, বাংলাদেশে রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের নাম বেগম খালেদা জিয়া। তিনি সাধারণ রাজনীতিবিদ ছিলেন না। ছিলেন রাজনৈতিক আদর্শ। ব্যক্তিগতভাবে ছিলেন অসাধারণ দৃঢ়চেতা। কঠিন সময়েও চরম ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছেন।
বিশষ্টি অর্থনীতিবিদ এবং পাবলিক পলিসি বিশ্লেষক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, জাতির এই সন্ধিক্ষণে যখন জাতীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার উপস্থিতি, পরামর্শ, দিকনির্দেশনা, সম্ভবত সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল, তখনই উনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন।
লেখক ও গবেষক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে সময় এবং আগামীর মৃত্যু হয়নি, বরং খালেদা জিয়া এবং তার আদর্শই হবে আগামীর বাংলাদেশের চালিকাশক্তি।
অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল বলেন, ওনার (খালেদা জিয়া) অদ্ভুত একটা বিচার হয়েছিল। তিনি আইনজীবীর কথা শুনে বিস্ময়ের সঙ্গে বলেছিলেন- কী, আমি এতিমের টাকা মেরে খেয়েছি! এই বাক্যটাকে বিচারক লিখেছিলেন- বেগম জিয়া নিজেই স্বীকার করেছেন, তিনি কাজটা করেছেন। এতো জঘন্য বিচার হয়েছে। এটার বিরুদ্ধে বিবৃতির জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরেছি। মানে ফোন করেছি। চারজনের বেশি রাজি হন নাই। চারজনের বেশি না হওয়ায় পত্রিকায় দিতে পারি নাই। উনি (খালেদা জিয়া) যখন মুমূর্ষু অবস্থায়, ওনাকে যেনো বিদেশে পাঠানো হয়, এজন্য অনেক মানুষকে অনুনয় করেছি। অনেকের হয়ত ইচ্ছা ছিল কিন্তু সাহস করেন নাই।
আসিফ নজরুল বলেন, বাংলাদেশে মানুষ এখন স্বাধীনভাবে ভালোবাসা ও ঘৃণা প্রকাশ করতে পারছে। এ কারণেই এক নেত্রীর ঠাঁই হয়েছে মানুষের হৃদয়ে, আরেকজনের বিতাড়িত ভূমিতে।
খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ডের অন্যতম সদস্য প্রফেসর এফএম সিদ্দিক বলেন, খালেদা জিয়ার চিকিৎসার তিনটি বিষয়ে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন- ১. সরকার গঠিত মেডিকেল বোর্ডে কারা ছিলেন? কোন দক্ষতার ভিত্তিতে তাকে মেডিকেলে চিকিৎসার জন্য সুপারিশ করে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা তাদের ওপর বর্তায় কিনা? ২. ভর্তিকালীন সময়ে কোন কোন চিকিৎসক উনার চিকিৎসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন? অবহেলা ছিল কিনা? ৩. মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনজীবীর মাধ্যমে তার ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছিলেন। তখন কী কারণে হয়নি, কারা বাধা দিয়েছিল?
শোকসভায় দ্য ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক মহানুভবতার কথা স্মরণ করে বলেন, বছরের পর বছর কারাবাস ও বিনা চিকিৎসায় ধুঁকতে হলেও তার মনে কোনো বিদ্বেষ ছিল না। ৭ আগস্টের বাণীতে তিনি ধ্বংসের বিপরীতে শান্তির বার্তা দিয়ে যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তা বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে বিরল।
গবেষক মহিউদ্দিন আহমেদ তার জীবনকে ত্যাগ ও উত্থানের এক মহাকাব্য হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আশির দশকে দলকে যেভাবে তিনি সুসংগঠিত করেছিলেন তা তাকে চিরকাল ‘আপসহীন’ নেত্রী হিসেবে অমর করে রাখবে। অন্যের অধিকার রক্ষায় তার নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগ বর্তমান প্রজন্মের কর্মীদের জন্য এক বড় অনুপ্রেরণা।
যায়যায়দিন সম্পাদক শফিক রেহমান ১২ ফেব্রুয়ারির আসন্ন নির্বাচন নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, খালেদা জিয়ার প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জানানো হবে যদি দেশের মানুষ উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট দিয়ে তাদের ভোটাধিকার পুনরুদ্ধার করতে পারে।
আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান শহীদ জিয়া ও খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরসূরি হিসেবে তারেক রহমানের ওপর ন্যস্ত দায়িত্ব ও চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, জিয়া দম্পতি বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন এক বিরল জনপ্রিয় যুগল যারা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মানুষের হৃদয়ে শীর্ষ স্থান দখল করে রেখেছিলেন।
নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীর খালেদা জিয়ার অসামান্য পরিমিতিবোধ ও রুচিশীলতার প্রশংসা করে বলেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ভয়াবহ নির্যাতনের মুখেও তিনি কখনো প্রকাশ্যে নিন্দাসূচক বা কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য দেননি।
আরও পড়ুন: প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সপরিবারে তারেক রহমানের সাক্ষাৎ
