পাকিস্তানের জাতির জনক মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ৭৬তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেছেন, ‘মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ না থাকলে পাকিস্তান সৃষ্টি হতো না, আর পাকিস্তান না থাকলে বাংলাদেশের সৃষ্টি হতো না। ১৯৭১ সালে ভারত যুদ্ধ করে আমাদের এ দেশকে দুই ভাগ করে দিয়েছে।’
গত বুধবার (১১ সেপ্টেম্বর) বিকেলে রাজধানীতে জাতীয় প্রেসক্লাবের তোফাজ্জল হোসেনে মানিক মিয়া হলে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ৭৬তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
নবাব সলিমুল্লাহ একাডেমি এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
ঢাকায় পাকিস্তান হাইকমিশনের বাইরে বাংলাদেশে পাকিস্তানের জাতির পিতার মৃত্যুবার্ষিকী পালনের ঘটনা এটিই প্রথম।
আলোচনা সভায় ঢাকায় পাকিস্তান হাইকমিশনারের প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও তিনি আসেননি। তবে ডেপুটি হাইকমিশনার কামরান ধাঙ্গাল অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন নবাব সলিমুল্লাহ একাডেমির প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ আব্দুল জাব্বার।
সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান। তার প্রবন্ধে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর জন্ম থেকে শুরু করে মৃত্যু পর্যন্ত জীবনের নানা ঘটনা বর্ণনা করা হয়। অনুষ্ঠানে জাফরুল হক জাফর জিন্নাহকে নিয়ে একটি উর্দু কবিতা পাঠ করেন।
বাংলাদেশে অধ্যয়নরত পাকিস্তানি শিক্ষার্থী মো. তাহির ও কামরান আব্বাস জিন্নাহকে নিয়ে উর্দুতে গান পরিবেশন করেন। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন নাগরিক পরিষদের আহ্বায়ক মো. সামসুদ্দিন, সাংবাদিক মোস্তফা কামাল মজুমদার, মো. শাখাওয়াত, সাইদুর রহমান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির আবু হানিফ, নজরুল ইসলাম, এসকে আজিম প্রমুখ।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি পাকিস্তানের ডেপুটি হাইকমিশনার কামরান ধাঙ্গাল বলেন, ‘মুসলিম লীগে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর নেতৃত্ব ছিল অসাধারণ। এটি ছিল সমগ্র ভারতের মুসলমানদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ গণআন্দোলনের সূচনা। তার স্বাস্থ্য ক্রমশ অবনতির দিকে গেলেও তিনি ছিলেন আলোচনার কেন্দ্রীয় ব্যক্তি, যার নেতৃত্বে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টি হয়েছিল।’
কামরান ধাঙ্গাল বলেন, ‘পাকিস্তান সৃষ্টির পর তিনি পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর-জেনারেল হন। নতুন জাতির জন্য তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সুস্পষ্ট। তিনি একটি প্রগতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রের কথা বলেছিলেন এবং স্বাধীনতা ও সহনশীলতার প্রতি অঙ্গীকারের প্রতিফলন ঘটিয়েছিলেন। তিনি শুধু পাকিস্তানেই না সারা বিশ্বে সমাদৃত।’
নাগরিক পরিষদের আহ্বায়ক মো. সামসুদ্দিন বলেন, ‘৫ আগস্ট আমাদের বিজয় দিবস, এটিই আমাদের স্বাধীনতা দিবস।’
এ সময় তিনি জিন্নাহকে স্মরণ করে বলেন, ‘১৯৪৭ সালে যদি বাংলাদেশ পাকিস্তানের সঙ্গে না থাকতো তবে আজ কাশ্মীরের মোতো ঘাড় ফেরানোর উপায় ছিল না, ভারতীয় জান্তারা ঘাড়ের ওপর অস্ত্র ধরে রাখতো। জিন্নাহ পাকিস্তানের সঙ্গ নিয়েছে বলেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে।’
সামসুদ্দিন বলেন, ‘আল্লামা ইকবাল হল বা জিন্নাহ এভিনিউর নাম কেন পরিবর্তন করতে হবে? কারণ দিল্লি এগুলোর পরিবর্তন চায়, তাই করা হয়েছে। কিন্তু আমরা এগুলো চাই না। তাই বাংলাদেশকে চীন এবং পাকিস্তানের সঙ্গে সুসম্পর্ক করতে হবে।’
অনুষ্ঠানে ঢাকার বিহারি ক্যাম্পের বাসিন্দা এসকে আজিম বলেন, ‘১৫-১৬ বছর পর আমরা এখানে উর্দু ভাষায় কথা বলছি এবং অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে পারছি। এ জন্য এই অনুষ্ঠানের আয়োজকদের অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে ধন্যবাদ। মিরপুর-মোহাম্মদপুর আমাদের বাপ-দাদাদের বসবাস ছিল, তারা পাকিস্তানের পক্ষে মারা গেছেন। ভারত থেকে বিভক্ত হয়ে এই দেশ পাকিস্তান হয়েছিল। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ সাহেব না থাকলে এশিয়া মহাদেশে মুসলমানদের জন্য কোনো দেশ থাকতো না। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ সাহেবর জন্য আমরা পাকিস্তান পেয়েছি, যেখানে আমরা মুসলমানরা সম্মানের সাথে ধর্মপালন করতে পেরেছি। ১৯৭১ সালে ভারত যুদ্ধ করে আমাদের এ দেশকে দুই ভাগ করে দিয়েছে। পঞ্চাশ-ছাপান্ন বছর ধরে আমাদের বাপ-দাদারা এই পাকিস্তানের স্বপ্ন দেখে গেছেন। এজন্য আজ আমাদের এখানে পাকিস্তানের সবাইকে দেখে আর এ অনুষ্ঠানে এসে খুব খুশি লাগছে। ইনশাআল্লাহ, আগামীতেও এ ধারা অব্যাহত থাকবে।’
আরেক বক্তা নজরুল ইসলাম বলেন, ‘যেকোনো ভাবেই হোক আমরা স্বাধীন হয়েছি। আমাদের পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করতে হবে। মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ না থাকলে পাকিস্তান সৃষ্টি হতো না, আর পাকিস্তান না থাকলে বাংলাদেশের সৃষ্টি হতো না। মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ আমাদের জাতির পিতা, কিন্তু সেটা আমরা স্বীকার করি না। কিন্তু আমাদের ভ্রাতৃত্ব রক্ষা করতে হবে। আর আমি আশা করি, মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর জন্মবার্ষিকী ও মৃত্যুবার্ষিকী প্রতিবছর এখানে (বাংলাদেশ) প্রতিপালিত হবে।’
মো. শাখাওয়াত বলেন, ‘ভারতীয় উপমহাদেশে ১৭৫৭ সালের পর যে রাজনৈতিক অদক্ষতা বা হিংসা তার অবসান ঘটান মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ। মানুষ হিসেবে জিন্নাহ ছিল অত্যন্ত ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন। একজন মুসলমানের যে চরিত্র থাকার দরকার তা জিন্নাহর ছিল। জিন্নাহ যদি ১৯৪৭ সালে এই বাংলাদেশের দায়িত্ব না নিতেন তাহলে এই জাতির অবস্থা পশ্চিম বাংলার মতো হতো। ভারতের একটা অঙ্গরাজ্য হয়ে থাকতো। দায়িত্ব নেওয়ার কারণে ওইদিন তিনি (জিন্নাহ) বলেছিলেন, ‘পূর্ব পাকিস্তান পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে থাকবে। আমাদের এখন বন্ধুত্বের পরিমাপ করতে হবে।’
আরও পড়ুন: আমি দেশের কাছাকাছি আছি, যাতে চট করে ঢুকে যেতে পারি: শেখ হাসিনা
