রাজনীতি সংবাদ প্রতিবেদক, ঢাকা
প্রকাশের সময় : ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫, ১০:৩০ অপরাহ্ণ
তারেক রহমান। ১৭ বছর আগে নির্যাতিত হয়ে কারাগার থেকে নির্বাসনে গিয়েছিলেন তিনি। মনে মনে বলেছিলেন, ‘আবার আসিবো ফিরে এই বাংলায়’। ঠিকই তিনি ফিরে এলেন মা, মাটি ও মানুষের কাছে। তবে তার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ছিল অভূতপূর্ব। বীরের বেশে, মুকুটহীন সম্রাটের বেশে মাতৃভূমিতে পা রাখেন তিনি। লাখো নেতাকর্মীর ভালোবাসা, উচ্ছ্বাস ও আবেগে ভেসে ফিরে এসেছেন এই রাজনীতিক। তার প্রত্যাবর্তন ঘিরে উচ্ছ্বসিত ছিল গোটা দেশ।
লন্ডন থেকে তারেক রহমানকে বহনকারী বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ফ্লাইটটি আজ (২৫ ডিসেম্বর) বেলা ১১ টা ৩৯ মিনিটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে।
বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে সামনে থাকা ফুল বাগানের ভেতরে চলে যান তারেক রহমান। এরপর জুতা খুলে খালি পায়ে দেশের মাটিতে দাঁড়ান। এ সময় তিনি বসে মাটি হাতে নেন। একমুঠো মাটি হাতে নিয়ে তা পরম মমতায় নাচাচড়া করেন।

এরপর বিমানবন্দর থেকে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগান লেখা লাল-সবুজ রঙের বুলেটপ্রুফ বাসে করে পূর্বাচল ৩০০ ফিট সড়কে বিএনপির সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে অংশ নিতে রওনা দেন। বাসে করে যাওয়ার সময় রাস্তার দুপাশে লাইন ধরে প্রিয় নেতাকে অভিবাদন জানান নেতাকর্মীরা। সহাস্যে হাত নেড়ে সবার অভিবাদনের জবাব দেন বিএনপির এই নতুন দিনের কাণ্ডারি।

তারেক রহমানকে একনজর দেখতে রাজধানীর পূর্বাচল ৩০০ ফিট সড়কে জড়ো হন লাখ লাখ নেতাকর্মী। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসেন বিএনপির কর্মী-সমর্থক ও অনুরাগীরা। ঘন কুয়াশার মধ্যে ভোর থেকে সংবর্ধনাস্থল ঘিরে ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। অনেকে এক-দুই দিন আগে থেকে এই এলাকায় এসে অবস্থান নেন। সংবর্ধনাকে কেন্দ্র করে মঞ্চ ও আশপাশের এলাকা সাজানো হয় দলীয় পতাকা, ব্যানার ও ফেস্টুনে। অনেক নেতাকর্মীর পরনে ছিল দলীয় রঙের জার্সি, মাথায় ক্যাপ, কপালে ব্যান্ড। কেউ কেউ দলের লোগো সংবলিত ব্যাজ পরে এসেছেন। এমনকি অসুস্থ ও বয়স্ক নেতাকর্মীদেরও হুইল চেয়ারে করে আসতে দেখা যায়।

প্রত্যেকেই পথ চেয়েছিলেন তারেক রহমানের। অবশেষে সবার অপেক্ষার অবসান ঘটে বিকেল ৩টা ৫০ মিনিটের দিকে। বিমানবন্দর থেকে ৩০০ ফিটের সংবর্ধনাস্থল পর্যন্ত পথ পাড়ি দিতে তিন ঘণ্টারও বেশি সময় লাগে। গণসংবর্ধনাস্থলের প্রবেশদ্বারে দাঁড়িয়ে তারেক রহমানকে অভিবাদন জানান হাজার হাজার নারী-শিশু বৃদ্ধ-যুবা। অনেকে হাত উঁচিয়ে সালাম জানান। তাদের বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস-আনন্দ আর নানা স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ।

গাড়ি থেকে নেমে ৩টা ৫০ মিনিটে লাল গালিচার ওপর দিয়ে হেঁটে সভামঞ্চে ওঠেন তারেক রহমান। সেই মুহূর্তে পুরো এলাকা করতালি, স্লোগান ও আবেগে ফেটে পড়ে। চারদিক থেকে ফুলের তোড়া ছুটে আসে মঞ্চের দিকে। অনেক নেতাকর্মী আবেগ সামলাতে না পেরে কাঁদতে থাকেন।

বিশ্বের দেশে দেশে নির্বাসিত নেতাদের বিজয়ীর বেশে রাজকীয়ভাবে ফিরে আসার স্মৃতি ও ইতিহাস মেখে তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন একটি নতুন ও ঐতিহাসিক রাজনৈতিক উপাখ্যানের সূচনালগ্ন। তার রাজকীয় রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে নতুন রাজনীতির গণইতিহাস রচনার মাহেন্দ্রক্ষণ।

ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সময় ২০০৭ সালের ৭ই মার্চ গ্রেপ্তার হয়েছিলেন বিএনপির তৎকালীন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব তারেক রহমান। ২০০৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর তিনি মুক্তি পান। এরপর ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর পরিবারের সদস্যদেরকে সাথে নিয়ে লন্ডনের উদ্দেশ্যে ঢাকা ছাড়েন তারেক রহমান।
২০১২ সালে তিনি ব্রিটেনে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেন। এরপর থেকে তারেক রহমান দীর্ঘ সময় সেখানেই অবস্থান করছিলেন। এই সময়কালে দেশের বাইরে থেকেও তিনি বিএনপির রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ওয়ান-ইলেভেন সরকার এবং বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে শ’খানেক মামলা করা হয়েছিল। এর মধ্যে ৫টি মামলায় তার সাজাও হয়েছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার পতনের পর একে একে সব মামলা ও সাজা থেকে খালাস পান তারেক রহমান। মামলা-সাজা থেকে রেহাই পাওয়ার পর দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন শেষে মাতৃভূমিতে ফিরে এসেছেন বিএনপির এই নতুন দিনের কাণ্ডারি। তার বীরোচিত স্বদেশ প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক ঘটনা।
