লিওনেল মেসি বেঞ্চে, একাদশে জুলিয়ান আলভারেজ, নিকো পাজ, জিওভানি লো সেলসো, এক্সেকিয়েল পালাসিওসরা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত গল্পটা আবার মেসিরই হলো। মাত্র আধঘণ্টা খেলেই দুর্দান্ত ফ্রি-কিকে গোল করে আর্জেন্টিনা অধিনায়ক গড়লেন আরেক বিশ্বরেকর্ড। এক গোল হজম করলেও বদলি নামা মেসির রেকর্ডগড়া গোলে ৩-১ ব্যবধানে জিতেছে লিওনেল স্কালোনির দল। নয়টি পরিবর্তন নিয়ে মাঠে নেমেও আর্জেন্টিনা জানিয়ে দিলো, বেঞ্চের শক্তিতেও তারা কম যায় না।
আজ রোববার বাংলাদেশ সময় সকাল ৮টায় শুরু হওয়া ম্যাচে যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসে জর্ডানের মুখোমুখি হয়েছিল আর্জেন্টিনা।
নকআউট নিশ্চিত থাকায় আগের ম্যাচের তুলনায় একাদশে নয়টি পরিবর্তন আনেন স্কালোনি। তবু শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে আর্জেন্টিনা। ম্যাচের ষষ্ঠ মিনিটেই জিওভানি লো সেলসো বল জালে পাঠালেও অফসাইডের কারণে গোলটি বাতিল হয়। তবে হতাশা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি।
১৯ মিনিটে ডি-বক্সের ঠিক বাইরে ফাউলের শিকার হন লো সেলসো। সেই ফ্রি-কিক থেকেই নিজের ভুলে যাওয়া উদযাপন ফিরিয়ে আনেন তিনি। বাঁ পায়ের নিখুঁত শটে জর্ডানের রক্ষণপ্রাচীর ভেদ করে বল জালে জড়িয়ে দেন আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডার। গোলরক্ষক ইয়াজিদ আবুলাইলার কিছুই করার ছিল না।
প্রথম গোলের পর আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে আর্জেন্টিনা। ৩১ মিনিটে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন লাউতারো মার্টিনেজ। ভিএআরের সহায়তায় পাওয়া পেনাল্টি থেকে ঠান্ডা মাথায় গোল করে বিশ্বকাপে নিজের গোলখাতা খোলেন ইন্টার মিলানের এই ফরোয়ার্ড। ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকেই বিরতিতে যায় আর্জেন্টিনা।
দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচে ফেরার ইঙ্গিত দেয় জর্ডান। ৫৫ মিনিটে মুসা আল-তামারির গোলে ব্যবধান কমিয়ে আনে এশিয়ার প্রতিনিধিরা। গোলটি জর্ডানের জন্যও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপ অংশগ্রহণে গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচেই গোল করার কৃতিত্ব দেখিয়েছে দলটি।
জর্ডানের গোলের পর কিছুটা চাপে পড়তে শুরু করেছিল আর্জেন্টিনা। ঠিক তখনই স্কালোনির তুরুপের তাস হয়ে মাঠে নামেন মেসি। ম্যাচের ৬০ মিনিটে বদলি হিসেবে মাঠে নামার সঙ্গে সঙ্গে ডালাস স্টেডিয়ামজুড়ে শুরু হয় সমর্থকদের উচ্ছ্বাস।

এরপর অপেক্ষা ছিল শুধু একটি মুহূর্তের। সেই মুহূর্তটি আসে ম্যাচের ৮০ মিনিটে। ডি-বক্সের প্রায় ২৫ গজ বাইরে ফ্রি-কিক পায় আর্জেন্টিনা। সবাই যখন মেসির পরিচিত বাঁকানো শটের অপেক্ষায়, তখন তিনি বেছে নেন ভিন্ন পথ। নিচু শটে জর্ডানের রক্ষণদেয়াল ও গোলরক্ষককে ফাঁকি দিয়ে বল পাঠিয়ে দেন জালে। আবুলাইলা ভুল দিকে ঝাঁপ দেয়ায় বলের নাগালই পাননি।
গোলটি শুধু আর্জেন্টিনার জয় নিশ্চিত করেনি, ইতিহাসের পাতায় নতুন অধ্যায়ও লিখেছে। বিশ্বকাপে টানা সাত ম্যাচে গোল করার বিরল কীর্তি গড়েছেন মেসি। এর আগে এই রেকর্ডে যৌথভাবে শীর্ষে ছিলেন ফ্রান্সের জাস্ট ফন্টেইন ও ব্রাজিলের জাইরজিনহো, যারা টানা ছয় ম্যাচে গোল করেছিলেন। এবার তাদের ছাড়িয়ে এককভাবে শীর্ষে উঠে গেলেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। এর আগে আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক এবং অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল করেছিলেন তিনি। জর্ডানের বিপক্ষে গোল করে বিশ্বকাপে নিজের মোট গোলসংখ্যাও নিয়ে গেছেন ১৯-এ, যা টুর্নামেন্টের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। একই সঙ্গে ফ্রি কিক গোলেও রেকর্ডে ভাগ বসালেন রোজারিওর এই ক্ষুদে জাদুকর। বিশ্বকাপ ইতিহাসে মাত্র ৫ জন ফুটবলার আছেন যারা ফ্রি কিক থেকে দুটি গোল করেছেন। মেসিও এখন তাদের দলে নাম লেখালেন। এই তালিকায় মেসির সঙ্গে পেলে, রিভেলিনো, ব্রুনো জেনঘিনি, ডেভিড বেকহ্যামও রয়েছেন।
ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধ নিয়ে স্কালোনির কিছুটা ভাবনার কারণ থাকলেও ফলাফল নিয়ে সন্তুষ্ট হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে আর্জেন্টিনার। গ্রুপ পর্বে শতভাগ সাফল্য নিয়ে শেষ ষোলোয় পৌঁছেছে দলটি। আগামী ৪ জুলাই মায়ামিতে শেষ বত্রিশের লড়াইয়ে তাদের প্রতিপক্ষ কেপ ভার্দে।
আর মেসি? তিনি যেন প্রতিটি ম্যাচেই নতুন করে মনে করিয়ে দিচ্ছেন, বয়স বাড়লেও ইতিহাস লেখার অভ্যাস এখনো ফুরিয়ে যায়নি। বিশ্বকাপের মঞ্চে আরেকটি রাতে নিজের নামের পাশে যোগ করলেন নতুন দুটি রেকর্ড, আর আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে নিলেন শিরোপা রক্ষার অভিযানের পরবর্তী ধাপে।
আরও পড়ুন: স্বরূপে ফিরলেন রোনালদো
