জাহাজভাঙা মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স এসোসিয়েশনের (বিএসবিআরএ) নির্বাচন নাটকীয় মোড় নিয়েছে। ঋণখেলাপির কারণে নির্বাচন থেকে বাদ পড়েছেন সভাপতি প্রার্থী রাইজিং স্টিল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমজাদ হোসেন চৌধুরী। তিনি বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আসলাম চৌধুরীর ছোট ভাই। আমজাদ চৌধুরী বাদ পড়ায় তার প্রতিদ্বন্দ্বী সভাপতি প্রার্থী পিএইচপি ফ্যামিলির ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মহসিন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন।
গত ২ মার্চ শিপ ব্রেকার্স এসোসিয়েশনের নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়। মনোয়নপত্র জমাদানের শেষ তারিখ ছিল ২৩ এপ্রিল। এরপর যাচাই-বাছাই শেষে গতকাল সোমবার (১০ মে) ঋণখেলাপির অভিযোগে আমজাদ হোসেন চৌধুরীর প্রার্থিতা বাতিল করে নির্বাচন বোর্ড। এরপর প্রার্থিতা ফিরে পাওয়ার আশায় নির্বাচন আপিল বোর্ডের কাছে আপিল করেন আমজাদ চৌধুরী। গত ৬ মে আপিল শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। তবে শুনানিতে আমজাদ চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন না। কিন্তু আপিল করেও প্রার্থিতা টিকেনি তার।
নির্বাচন বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. আফতাব উদ্দিন চৌধুরী স্বাক্ষরিত এক নোটিশে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোর (সিআইবি) রিপোর্টে আমজাদ চৌধুরী ঋণখেলাপি সাব্যস্ত হওয়ায় তার আপিল নামঞ্জুর হয়।
নির্বাচন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, রাইজিং স্টিল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমজাদ চৌধুরীর বিরুদ্ধে প্রায় ১২০০ কোটি টাকার ঋণখেলাপির অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে আমজাদ হোসেন চৌধুরীর সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
আমজাদ চৌধুরীর বড় ভাই আসলাম চৌধুরীও ঋণখেলাপির কারণে নির্বাচনে বিজয়ী হয়েও আটকে গেছেন। তিনি গত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) আসনে বিজয়ী হলেও আদালতের আদেশে ফল ঘোষণা করেনি নির্বাচন কমিশন। তার প্রার্থিতার বিরুদ্ধে করা আপিল শুনানি চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচনের ফলাফল স্থগিতের নির্দেশ দিয়েছিল হাইকোর্ট। সীতাকুণ্ড আসনের জামায়াতের প্রার্থী আনোয়ার সিদ্দিকী ঋণখেলাপির অভিযোগ এনে আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা ফিরিয়ে দিতে হাইকোর্টের দেওয়া আদেশের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল আবেদন করেন। কিন্তু এখনো এই লিভ টু আপিলের শুনানি হয়নি।
শিপ ব্রেকার্স এসোসিয়েশনের একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাজনীতি সংবাদকে বলেন, দেশের গুরুত্বপূর্ণ জাহাজভাঙা শিল্প খাতের নেতৃত্বে আর্থিকভাবে স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের আসা প্রয়োজন। ঋণখেলাপির অভিযোগ থাকা কোনো ব্যক্তিকে সভাপতি পদে নির্বাচিত করা হলে সংগঠনের ভাবমূর্তি প্রশ্নের মুখে পড়বে।
তফসিল অনুযায়ী, আগামী ৩ জুন শিপ ব্রেকার্স এসোসিয়েশনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন ১৮ জন। শিপ ব্রেকার্স এসোসিয়েশনের নির্বাচনে দুই বছর মেয়াদের জন্য সভাপতি, সিনিয়র সহসভাপতি ও দুজন সহসভাপতি এবং সাতজন নির্বাহী সদস্য নির্বাচিত হন।
এর আগে গত বছরের ২৫ অক্টোবর শিপ ব্রেকার্স এসোসিয়েশনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। নির্বাচনে ১১টি পদের বিপরীতে মনোনয়নপত্র জমা দেন ১১ জন। এসব প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্বাচনের প্রায় দেড় মাস আগে ১৫ সেপ্টেম্বর ‘স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন’ করতে না পারার কারণ দেখিয়ে ইস্তফা দেয় নির্বাচন বোর্ড। ফলে আর নির্বাচন হয়নি। এরপর গত ৩ নভেম্বর শিপ ব্রেকার্স এসোসিয়েশনের এক সভায় আমজাদ চৌধুরীকে সংগঠনটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করা হয়। তিনি সংগঠনটির নির্বাহী কমিটির সদস্য। তাকে চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) আসনের আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য এস এম আল মামুনের পরিবর্তে নিযুক্ত করা হয়।
‘নিয়মভঙ্গ’ করে আমজাদ চৌধুরীকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করার অভিযোগে গত ৫ ফেব্রুয়ারি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডিটিও এক অফিস আদেশে বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের সচিব আবু সাফায়াৎ মুহম্মদ শাহে দুল ইসলামকে শিপ ব্রেকার্স এসোসিয়েশনে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
উল্লেখ্য, এর আগে শিপ ব্রেকার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি ছিলেন আবু তাহের। তিনি একটানা ৯ বছর সভাপতি পদে ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর নেতৃত্ব থেকে সরে দাঁড়ান। তিনি চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) আসনের আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য দিদারুল আলম দিদারের বাবা ও চট্টগ্রামের সিটির সাবেক মেয়র মনজুর আলমের ভাই।
আরও পড়ুন: চট্টগ্রাম সিটির মেয়র পদে বিএনপিতে আলোচনায় দুই নাম
