প্রকাশের সময় : ২ জুলাই ২০২৬, ৮:০৫ অপরাহ্ণ
আকতার পারভেজ হিরু। বয়স ৪৩ বছর। পিএইচপি অটোমোবাইলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। একজন উদীয়মান শিল্প উদ্যোক্তা। অসাধারণ জ্ঞান ও প্রজ্ঞাসম্পন্ন ব্যক্তি। হাস্যোজ্জ্বল উচ্ছল প্রাণবন্ত একজন তরুণ। দেশের খ্যাতনামা শিল্পগ্রুপ পিএইচপি ফ্যামিলির চেয়ারম্যান সুফি মোহাম্মদ মিজানুর রহমান সর্বকনিষ্ঠ সন্তান তিনি। অস্ট্রেলিয়ার স্বনামধন্য ইউনিভার্সিটি অব ক্যানবেরা থেকে বিজনেস কমিউনিকেশনের উপর গ্র্যাজুয়েশন করেছেন তিনি। অস্ট্রেলিয়া থেকে দেশে এসে নিজেদের পারিবারিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের হাল ধরেন। প্রথমে পিএইচপির শিপিং লাইনের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন তিনি। পরবর্তীতে শিপিং লাইন থেকে গুটিয়ে পিএইচপির অটোমোবাইল (মোটরগাড়ি) সেক্টরের দায়িত্ব নেন। এরপর নিজেকে ছাড়িয়ে যান। তার হাত ধরেই বাংলাদেশে প্রথম স্বয়ংসম্পূর্ণ অটোমোবাইল কারখানা গড়ে উঠে। সেই কারখানা থেকেই ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ গাড়ি তৈরির স্বপ্নের সূচনা হয়। এখানেই থামেননি এই স্বপ্নবাজ তরুণ। আরও বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে নিজেকে মেলে ধরেছেন তিনি। মেধাবী এই তরুণ শিল্প উদ্যোক্তা চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধিত্বও করছেন। চট্টগ্রামের শতবর্ষী প্রাচীন ব্যবসায়ী সংগঠন চিটাগাং চেম্বার অব কমার্সের দ্বিতীয়বারের মতো পরিচালক নির্বাচিত হয়েছেন। এছাড়া মালয়েশিয়া সরকারের চট্টগ্রামের অনারারি কনসাল হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।
গত ২৮ জুন বিকেলে চট্টগ্রাম নগরীর বহদ্দারহাটে পিএইচপি অটোমোবাইলস লিমিটেডের পেরোডুয়ার কার্যালয়ে আকতার পারভেজ হিরুর মুখোমুখি হয় রাজনীতি সংবাদ। তরুণ উদ্যোক্তা হয়ে উঠার গল্প ও সমসাময়িক বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে কথা হয় তার সঙ্গে। তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রাজনীতি সংবাদের সম্পাদক সালাহ উদ্দিন সায়েম।
রাজনীতি সংবাদ: আপনি সম্প্রতি চিটাগাং চেম্বারের পরিচালক নির্বাচিত হয়েছেন। কেন দ্বিতীয়বারের মতো চেম্বারের নির্বাচন করলেন?
আকতার পারভেজ হিরু: আমি মূলত চট্টগ্রামের উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের কল্যাণে কাজ করার জন্য চেম্বারের সাথে সম্পৃক্ত হয়েছি। তার একটা ছোট্ট দৃষ্টান্ত দিই। ২০২৩ সালে প্রথমবার চেম্বারের পরিচালক নির্বাচিত হওয়ার পর আমি চট্টগ্রামের ফ্রিল্যান্সারদের নিয়ে একটা ডিনারের আয়োজন করেছিলাম। সেখানে তারা তাদের দুঃখ-কষ্টের কথা তুলে ধরেন। তাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো একটা স্থায়ী ভেন্যু না থাকা, যেখানে তারা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও ওয়াই-ফাই সংযোগ পাবে। এটা না থাকাতে তাদের কাজের ব্যঘাত হয়। আর তাদের কাজে ব্যঘাত হওয়া মানে বৈদেশিক মুদ্রা আসতে ব্যাহত হওয়া। তখন চেম্বারে আইটি ফেয়ারের উদ্বোধনে এসেছিলেন তৎকালীন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক। তখন আমি উনার কাছে ফ্রিল্যান্সারদের দাবি তুলে ধরি। তিনি বিষয়টা যাচাই-বাছাই করে সাথে সাথে তৎকালীন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রীকে ফোন দেন। মন্ত্রীর সঙ্গে ফোনালাপ করে তিনি চট্টগ্রামের কালুরঘাটে নির্মিত আইটি পার্কে ৮ হাজার বর্গফুটের একটা স্পেস ফ্রিল্যান্সারদের ভাড়া দেওয়ার অঙ্গীকার করেন এবং চিটাগাং চেম্বারকে তিনি এটার দায়িত্ব দেন। শুনেছি, ওই আইটি পার্কের এখন ৮০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। কাজ পুরোপুরি শেষ হলে আমরা ফ্রিল্যান্সারদের স্পেসের বিষয়টা ফলোআপ করবো।
প্রশ্ন: চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের জন্য চেম্বার এবার কী কাজ করবে?
উত্তর: চেম্বারের কাজ হলো ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা করা। আমরা চেষ্টা করবো ব্যবসায়ীদের জন্য যত বেশি কাজ করতে পারি, যত বেশি সহযোগিতা করতে পারি। আমরা প্রথম কাজ করছি ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার নিয়ে। নিষ্প্রাণ হয়ে পড়ে থাকা এই ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারকে আমরা প্রাণবন্ত করার উদ্যাগ নিয়েছি। এ লক্ষ্যে এই বিল্ডিংয়ের খালি থাকা স্পেস আমরা ভাড়া দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছি। ইতোমধ্যে কাস্টমসকে আমরা স্পেস ভাড়া দিয়েছি। এটা পুরোপুরি ভাড়া দিতে পারলে চেম্বারের তহবিলের যোগান বাড়বে। আমাদের দ্বিতীয় কাজ হবে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে একটা ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড ল্যাবরেটরি গড়ে তোলা। চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার আনলে চারদিনের মধ্যে নষ্ট হয়ে যায়। এ অবস্থায় ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে ল্যাবরেটরি চালু করা গেলে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা দিনে দিনে রিপোর্ট পেয়ে যাবে। এক্ষেত্রে ১-২ দিনের মধ্যে এসেসমেন্ট হয়ে যাবে। এতে ব্যবসায়ীরা দ্রুত সময়ে শুল্ক পরিশোধ করতে পারবে। এরপর আমাদের তৃতীয় কাজ হবে, মেলার জন্য চেম্বারের উদ্যোগে স্থায়ী একটি মাঠ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া। যেখানে শুধু বাণিজ্য মেলা না, ফার্নিচার মেলা, বইমেলা, বস্ত্র মেলা, অটোমোবাইল ফেয়ার, জব ফেয়ারসহ বিভিন্ন ধরণের মেলার আয়োজন করা হবে।
প্রশ্ন: চট্টগ্রামের খ্যাতনামা শিল্পপ্রতিষ্ঠান সীকম গ্রুপের চেয়ারম্যান আমিরুল হক চেম্বারের নেতৃত্বে এসেছেন। ধনাঢ্য এই ব্যবসায়ীর নেতৃত্ব কেমন দেখছেন?
উত্তর: সত্যি কথা এটা বলতে হবে, আমাদের নতুন সভাপতি আমিরুল হক নিঃসন্দেহে একজন অত্যন্ত পরিপক্ক লোক। তিনি একজন ডাইনামিক লিডার। আমার বলতে দ্বিধা নেই, তিনি আমার চেয়ে অনেক বেশি বুঝেন এবং সঠিকভাবেই বুঝেন। আমরা যখন একটা কাজ করি, তখন প্রশাসন, মার্কেটিং, সেলস, প্রেজেন্টেশন নিয়ে চিন্তা করি। এক্ষেত্রে আমিরুল হক আমাদের চেয়ে এক লেভেল বেশি চিন্তা করেন। আমি বিশ্বাস করি, উনার নেতৃত্বে শুধু চিটাগাং চেম্বার নয়, চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী সমাজ ও চট্টগ্রামবাসী উপকৃত হবে। চেম্বার থেকে উনার নেওয়ার কিছু নেই, উনি দেওয়ার জন্য এসেছেন।
প্রশ্ন: বাংলাদেশের বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র বলা হয় বন্দরনগরী চট্টগ্রামকে। কিন্তু চট্টগ্রাম কেন বাণিজ্যিক রাজধানী হয়ে উঠছে না?
উত্তর: চট্টগ্রাম তখনই বাণিজ্যিক রাজধানী হয়ে উঠবে যখন চট্টগ্রামের অর্থনীতি প্রাণবন্ত হবে। ঢাকা শহরের বর্তমান জনসংখ্যা হলো প্রায় ৩ কোটি ৬৬ লাখ। আর চট্টগ্রাম নগরীর বর্তমান জনসংখ্যা হলো ৬০ লাখ। তাহলে সব কোম্পানি ঢাকায় অফিস না করে কি চট্টগ্রামে করবে? যেখানে জনসংখ্যা বেশি সেখানেই তো কোম্পানিগুলোর অফিস হবে। প্রাণবন্ত অর্থনীতির জন্য জনসংখ্যা অনেক বড় একটা ফ্যাক্টর। যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনের চেয়ে নিউ ইয়র্ক বেশি প্রাণবন্ত। কারণ নিউ ইয়র্ক যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে জনবহুল নগরী। আমি প্র্যাকটিক্যালি একটা কথা বলি। চট্টগ্রামে যদি মাসে ৮-১০টি গাড়ি বিক্রি হয়, ঢাকায় মাসে একদম অনায়াসে ৭০টি গাড়ি বিক্রি হবে। এর কারণ হলো অর্থনীতির আকার। যারা চট্টগ্রামে ফার্নিচারের ব্যবসা করে তাদের অনেকে হতাশ হয়ে যায়। যারা ইলেকট্রনিক্সের ব্যবসা করে তাদের অনেকে হতাশ হয়ে যায়। কারণ বেচাকেনা নেই। তখন তারা ঢাকায় গিয়ে একটা শোরুম খুলে। এরপর ব্যবসায় মুনাফা হয়। চট্টগ্রামে একসময় নামকরা ও চমৎকার রেস্টুরেন্ট ছিল রিগ্যাল। বিদেশিরা সেই রেস্টুরেন্টে গিয়ে খাওয়ার পর বলতো ‘ওয়াও’। দুর্ভাগ্যবশত ওই রেস্টুরেন্টের মালিক চট্টগ্রামে টিকে থাকতে পারেননি। তিনি যদি এই রেস্টুরেন্ট ঢাকায় করতেন তাহলে হয়তো আরও তিনটি শাখা করতে পারতেন। কাজেই আমাদের মেনে নিতে হবে যে, ঢাকার অর্থনীতি আমাদের চেয়েও বেশি প্রাণবন্ত। এটা অস্বীকার করলে বোকামি হবে। চট্টগ্রামের অর্থনীতিকে প্রাণবন্ত করতে সরকার একটা কাজ করতে পারে, সেটা হলো ঢাকার সঙ্গে চট্টগ্রামের সংযোগ বাড়ানো। সেক্ষেত্রে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় বুলেট ট্রেন চালু করা যেতে পারে, যার গতি হবে ঘণ্টায় ৩০০ কিলোমিটার। তাহলে মাত্র ৪৫ মিনিটে ঢাকায় পৌঁছে যাওয়া যাবে। এ ছাড়া ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ৬ লেনে উন্নীত করা যেতে পারে। এর ফলে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় দিনে গিয়ে দিনে ফিরে আসা যাবে। এতে ব্যবসায়ীরা উপকৃত হবে।
প্রশ্ন: আপনি একজন গাড়ি ব্যবসায়ী। এবারের বাজেটে ইলেকট্রিক গাড়ি আমদানিতে শুল্ক ছাড় দেওয়া হয়েছে। কিন্তু জ্বালানিচালিত গাড়ি আমদানিতে শুল্ক বাড়ানো হয়েছে। বিষয়টা কীভাবে দেখছেন?
উত্তর: পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক গাড়ি ব্যবহারে জনগণকে উৎসাহিত করতে সরকার জ্বালানিচালিত গাড়ি আমদানিতে শুল্কের পরিমাণ ১৩২ থেকে বাড়িয়ে ১৬০ শতাংশে উন্নীত করেছে। এর ফলে সিবিইউ (বিদেশে সম্পূর্ণ প্রস্তুতকৃত) গাড়ি আমদানিতে পরিবহন, শুল্ক ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ আরও বেড়ে যাবে। ফলে মানুষ এখন সিবিইউ গাড়ির পরিবর্তে সিকেডি গাড়ি (বিদেশ থেকে গাড়ির যন্ত্রাংশ আমদানি করে দেশে এনে জোড়া লাগানো হয়) ব্যবহার করবে। সিবিইউ গাড়ির ওপর শুল্ক বাড়ানোর বিষয়টা আমি ইতিবাচক হিসেবে দেখি। তিনটা ক্ষেত্রে এটা ইতিবাচক। প্রথমত, দেশ থেকে বৈদেশিক মুদ্রা বাইরে কম যাবে। দ্বিতীয়ত, এখন দেশে ব্যবসায়ীদের অনেকে সিকেডি গাড়ির কারখানা তৈরি করবে। এতে অনেক লোকের কর্মসংস্থান হবে। তৃতীয়ত, আমাদের প্রযুক্তি ও কারিগরি দক্ষতা বাড়বে।
প্রশ্ন: ২০১৫ সালে চট্টগ্রাম নগরীর পাহাড়তলী সরাইপাড়ায় গাড়ির কারখানা স্থাপন করে পিএইচপি অটোমোবাইল। ২০১৭ সালে দেশে বেসরকারি পর্যায়ে প্রথম প্রতিষ্ঠান হিসেবে পিএইচপি অটোমোবাইলের গাড়ি সংযোজন শুরু হয়। এরপর ২০২০ সালে আপনার হাত ধরে দেশে প্রথম তৈরি মালয়েশিয়ার বিখ্যাত গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান প্রোটনের চার চাকার প্রাইভেট কার বাজারে আসে। দেশে গাড়ি তৈরির চিন্তাটা কীভাবে আসলো?
উত্তর: ২০১৪ সালে পিএইচপির ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড সায়েন্সেস (ইউআইটিএস) এর কনভোকেশনে এসেছিলেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ। তিনি এখানে এসে আমার আব্বা সুফি মিজানুর রহমান সম্পর্কে খোঁজ-খবর নেন। তারপর তিনি দেশে ফিরে আমার আব্বাকে মালয়েশিয়ায় আমন্ত্রণ জানান। এরপর আব্বাকে সঙ্গে নিয়ে আমরা মালয়েশিয়ায় যাই। সেখানে গিয়ে তার সঙ্গে মিটিং করার আগে তিনি আমাদের বলেন, তোমরা আগে আমার প্রোটন গাড়ির ফ্যাক্টরি ঘুরে আসো। মাহাথির মোহাম্মদ তখন মালয়েশিয়ার বিখ্যাত গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান প্রোটনের চেয়ারম্যান ছিলেন। প্রোটনের ফ্যাক্টরি ঘুরে আসার পর তিনি আমার আব্বাকে বললেন, আমি চাই তুমি বাংলাদেশে প্রোটন বিক্রি করো। তখন আমার আব্বা বললেন, আমি তো স্টিল বানাই, গ্লাস বানাই। এ কথা শুনে মাহাথির মোহাম্মদ বলে উঠলেন, সুফি বেশি কথা বলিও না। তখন আমার আব্বা বললেন, আচ্ছা, আলহামদুলিল্লাহ। এরপর আমরা দেশে এসে গাড়ির কারখানা তৈরির কাজে নেমে পড়ি। আমরা গত ৯ বছর ধরে গাড়ি সংযোজন করে আসছি।
প্রশ্ন: পিএইচপি অটোমোবাইলের কারখানায় এখন কেবল গাড়ি সংযোজন হচ্ছে। কখন গাড়ি উৎপাদন হবে?
উত্তর: আমরা এখন সিকেডি গাড়ি (বিদেশ থেকে গাড়ির যন্ত্রাংশ আমদানি করে দেশে এনে জোড়া লাগানো হয়) তৈরি করছি। আমাদের কারখানায় এখন গাড়ির ১৭ ধরণের যন্ত্রাংশ তৈরি হয়। একটা গাড়ি তৈরি করতে ৩ হাজার ৮০০ ধরণের যন্ত্রাংশ লাগে। একটা গাড়ির বডি ও চেসিস তৈরি করতে হলে দিনে অন্তত ৫০-৬০টি গাড়ি বিক্রি করতে হবে। না হয় পোষাবে না। তবে আমাদের বিক্রির পরিমাণ যদি বাড়ে তাহলে আমরা একদিন বডি ও চেসিস তৈরি করতে পারবো। তবে বাংলাদেশে কখনো গাড়ির ইঞ্জিন তৈরি করা সম্ভব না। এর কারণ হলো যাদের ইঞ্জিনের ফ্যাক্টরি আছে তারা বছরে ২ লাখ গাড়ি বিক্রি করে। তাও লাভ করতে পারে না। বাংলাদেশে বছরে যাত্রীবাহী গাড়ির চাহিদা হলো ২০ থেকে ২১ হাজার। তাহলে বাকি ১ লাখ ৮০ হাজার গাড়ি আপনি কার কাছে বিক্রি করবেন?
প্রশ্ন: ২০২৪ সাল থেকে আপনারা প্রোটনের গাড়ি সংযোজন বন্ধ করে দেন। এরপর মালেশিয়ার আরেক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান পেরোডুয়ার গাড়ি অ্যাসেম্বল করছেন। প্রোটন আর পেরোডুয়ার গাড়ির মধ্যে গুণগত মানের পার্থক্য কী?

উত্তর: ২০২৪ সালে প্রোটনের সাথে আমাদের চুক্তি শেষ হয়ে গিয়েছিল। তাই এই গাড়ির সংযোজন বন্ধ করে দিই। এরপর আমরা পেরোডুয়ার সাথে চুক্তি করি। আর প্রোটনের চেয়ে পেরোডুয়ার গাড়ির গুণগত মান অনেক ভালো। পেরোডুয়া মালয়েশিয়ার অনেক বড় কোম্পানি। পেরোডুয়া মালয়েশিয়ায় ৬০ শতাংশ মার্কেট শেয়ার নিয়ে গত ১৮ বছর ধরে দেশটিতে শীর্ষ ব্র্যান্ড।
প্রশ্ন: অটোমোবাইল সেক্টরে আপনার কাজ করার আগ্রহ কেন হলো?
উত্তর: আমাদের পরিবারের সিদ্ধান্তে আমি অটোমোবাইল সেক্টরটা দেখছি। গাড়ি বিক্রি করা অনেক কষ্টের কাজ। তাই আমার অন্য ভাইয়েরা কেউ এই ঝামেলা নিতে চায়নি। তবে ছোটবেলা থেকে গাড়ির প্রতি আমার ভালোবাসা ছিল। আমি আমার জমানো টাকা দিয়ে একটা স্পোর্টস কার কিনেছি। ২৩ লাখ টাকা দিয়ে। অটোমোবাইল খাতের পাশপাশি আমি পিএইচপি স্টকেরও দায়িত্ব পালন করছি। আমি পিএইচপি স্টকস এন্ড সিকিউরিটিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। এর আগে আমি পিএইচপি শিপিং লাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলাম। আমাদের শিপিং এজেন্সি ছিল। আমরা যখন অটোমোবাইলে নামলাম তখন সব জাহাজ বিক্রি করে দিই। পিএইচপি শিপিং লাইনের আস্তে আস্তে কবর দেওয়া হলো। এটা আমাদের লাভজনক প্রতিষ্ঠান ছিল।
প্রশ্ন: অটোমোবাইল সেক্টর নিয়ে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
উত্তর: আমার স্বপ্ন হলো আমাদের দেশের মানুষ যেন মেইড ইন বাংলাদেশ ব্র্যান্ডের নতুন গাড়ি চালাতে পারে। যদি আমরা কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানের বড় কোনো অর্ডার পায়, যারা মাসে হাজারের বেশি গাড়ি কিনবে, তাহলে ইনশাআল্লাহ আমার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করে দেখাবো।
প্রশ্ন: ভবিষ্যতে নিজেকে কোথায় দেখতে চান?
উত্তর: ভবিষ্যতে আমি নিজেকে নয়, আমার দেশকে দেখতে চায় একটা অটো হাব হিসেবে। আমি স্বপ্ন দেখি, বাংলাদেশে আমরা যদি গাড়ি তৈরি করতে নাও পারি কিন্তু এমন এমন জিনিস তৈরি করবো যাতে বড় বড় দেশ এখান থেকে পার্টস নিয়ে ওদের গাড়িতে লাগাবে। যেমন বাংলাদেশি লেদার। হাইয়েন্ড গাড়িগুলোতে সব লেদারের সিট। বড় দেশগুলো সেই লেদারের সিট যদি আমাদের কাছে পাঠিয়ে দেয় এবং আমরা যদি ভালো কোয়ালিটির লেদার লাগিয়ে দিতে পারি তাহলে এটা একটা বড় হাব হবে।
প্রশ্ন: আপনার বাবা সুফি মিজানুর রহমান শূন্য থেকে সাফল্যের শীর্ষে উঠে এসেছেন। যাকে একজন ‘ভিশনারি’ মানুষ বলা হয়। সন্তান হিসেবে আপনার বাবাকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
উত্তর: আমার বাবাকে মূল্যায়ন করার দুইটা দিক আছে। তিনি একজন ব্যবসায়ী। ব্যবসায় নিঃসন্দেহে তিনি সফল। উনার কাছ থেকে অনেক কিছু শেখার আছে আমাদের। কিন্তু এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তিনি একজন সফল বাবা। আপনি চাইলে সুতার ফ্যাক্টরি থেকে ভালো সুতা বানাতে পারবেন। কিন্তু একজন ভালো বাবা হওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। আমার বাবা ১০ নম্বরের মধ্যে ২০ পেয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন উনি কেমন বাবা।
প্রশ্ন: একজন সফল ব্যবসায়ী হিসেবে তরুণ উদ্যোক্তাদের প্রতি কী পরামর্শ দেবেন?
উত্তর: তরুণ উদ্যোক্তাদের যার যে কাজ করার ইচ্ছা আছে তার ওই কাজে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া উচিত। পড়ালেখা শেষে কর্মজীবনে প্রথম একবছর একটা বড় কর্পোরেট হাউজে কাজ করা উচিত। যাতে করে সে কর্পোরেট, অ্যাকাউন্টস, এইচআর, অ্যাডমিনিস্ট্রেশন-এগুলোতে কীভাবে কাজ করে তা সে এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে উপলব্ধি করতে পারবে। এরপর তার একটা মাঝারি মানের কোম্পানিতে যাওয়া উচিত। যেখানে সে ৫ থেকে ৭ বছর সার্ভিস দেবে। তারপরে তার একটা ছোটোখাটো কোম্পানিতে চাকরি করা উচিত যেখানে সে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। সেখানে কোনো ভুল হলে সে সংশোধন করার চেষ্টা করবে। ১৫ বছর পর সে যদি একটা কোম্পানি করে তাহলে মানুষের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারবে। তখন সে যে সিদ্ধান্ত নেবে তা অনেক পরিপক্ক হবে।
রাজনীতি সংবাদ: আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
আকতার পারভেজ হিরু: আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ।
আরও পড়ুন: ইতালিতে মেলায় গিয়ে কপাল খুলে যায় নাদের খানের
