গুম, খুন, দুর্নীতিসহ বিভিন্ন মামলার আসামি হয়ে বিদেশে পাড়ি দেওয়া পুলিশের সাবেক আইজি বেনজীর আহমেদ সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হয়েছেন। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায় ইন্টারপোলের সহযোগিতায় বেনজীরকে গ্রেপ্তার করেছে দুবাই পুলিশ।
অনিয়ম-দুর্নীতির মামলায় দেশ থেকে গোপনে পালানোর পর বেনজীরের গ্রেপ্তারের খবরে নতুন একটি প্রশ্ন সামনে আসছে-আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের এই প্রভাবশালী পুলিশ কর্মকর্তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা কি সম্ভব হবে?
সংযুক্ত আরব আমিরাতের আইন অনুযায়ী, গ্রেপ্তারের ৩০ দিনের মধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ প্রস্তাব পাঠাতে হবে। স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় মামলা, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও তদন্তের দলিলাদি প্রস্তুত করে প্রত্যর্পণ অনুরোধ পাঠানোর ফলোআপ কার্যক্রম শুরু করেছে।
সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তার করা বড় অগ্রগতি হলেও দেশে ফিরিয়ে আনা সহজ কাজ নয়। কারণ, ইন্টারপোলের পুলিশের রেড নোটিশের ভিত্তিতে আটক বা শনাক্ত করা ব্যক্তিকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়াটি বেশ দীর্ঘ। এটি মূলত সংশ্লিষ্ট দেশের আইন, আদালত, মামলার নথিপত্রের গ্রহণযোগ্যতা, দ্বিপাক্ষিক চুক্তি ও কূটনৈতিক তৎপরতার ওপর নির্ভর করে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে বাংলাদেশের বন্দি বিনিময় চুক্তি নেই। দণ্ডিত বন্দিদের প্রত্যার্পণের চুক্তি রয়েছে। ২০১৪ সালের ২৭ অক্টোবর বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে এই দণ্ডিত বন্দি বিনিময় সংক্রান্ত চুক্তি হয়। সেখানে স্পষ্টভাবে বলা আছে, দণ্ডিত বন্দি বিনিময় চুক্তি, মানে বাংলাদেশের সরকার কর্তৃক বা বাংলাদেশের আদালত কর্তৃক দণ্ডপ্রাপ্ত হলে সেই ক্ষেত্রে। কিন্তু বেনজীর তো দণ্ডিত নন। এখন প্রশ্ন, তাহলে কী হবে?
দুদকের আইনজীবী মো. মাহমুদুল আরেফীন স্বপন বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে বাংলাদেশের দণ্ডিত বন্দিদের প্রত্যার্পণের চুক্তি আছে। এই চুক্তি কার্যকর তখনই হতো যদি বেনজীর আহমেদ দণ্ডিত হতেন। বেনজীর যেহেতু ইন্টারপোলের সহযোগিতায় গ্রেপ্তার হয়েছে, এখন ইন্টারপোলের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারকে বসতে হবে। দুই রাষ্ট্রের মধ্যে আবার কোনো চুক্তি হতে পারে কিংবা ইন্টারপোলের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকার, স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যৌথভাবে সমাধানে আসতে পারে। এছাড়া তাকে এই মুহূর্তে এই চুক্তি অনুসারে ফেরত আনা যাবে না, কারণ তিনি দণ্ডিত হননি।
বিদেশ থেকে আসামি ফেরত আনার বিষয়ে আগে মিশ্র অভিজ্ঞতা রয়েছে বাংলাদেশের। পুলিশ পরিদর্শক মামুন এমরান খান হত্যা মামলার আসামি রবিউল ইসলাম ওরফে আরাভ খান দুবাইতে গ্রেপ্তার হলেও ভারতীয় পাসপোর্টধারী হওয়ায় তাকে ফেরানো যায়নি। একইভাবে নোটিশ জারির পর দুবাইতে শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান আহমেদ গ্রেপ্তার হলেও একাধিক দেশের (ভারতীয় ও ডমিনিকান রিপাবলিক) পাসপোর্ট ব্যবহারের কারণে তাকেও আনা সম্ভব হয়নি।
তবে, আশার আলোও রয়েছে। নরসিংদীর শিবপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হারুনুর রশিদ খান হত্যা মামলার আসামি মহসিন মিয়াকে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে ইন্টারপোলের সহযোগিতায় দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছিল।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের বন্দি বিনিময় চুক্তি থাকলে সেই চুক্তির আওতায় কোনো বন্দিকে দেশে ফিরিয়ে আনার সুযোগ থাকে। কিন্তু সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে আমাদের কোনো বন্দি বিনিময় চুক্তি নেই, তবে কূটনৈতিক সম্পর্ক আছে। কূটনৈতিক চ্যানেলে যে কোনো বন্দিকে ফিরিয়ে আনার আইনগত সুযোগ আছে।
আরও পড়ুন: দুবাই বিমানবন্দরে যেভাবে ধরা পড়লেন সাবেক আইজিপি বেনজীর
