জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যার দায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দুই পুলিশ সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল। বাকি ২৮ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এই রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই পুলিশ সদস্য হলেন- রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক এএসআই আমির হোসেন ও কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়।
যাবজ্জীবনপ্রাপ্ত তিনজন হলেন- সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার (কোতোয়ালি জোন) আরিফুজ্জামান ওরফে জীবন, তাজহাট থানার সাবেক অফিসার ইনচার্জ রবিউল ইসলাম ওরফে নয়ন ও বেরোবির সাবেক ক্যাম্প ইনচার্জ বিভূতি ভূষণ রায় ওরফে মাধব।
এছাড়া রায়ে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. হাসিবুর রশীদ, গণিত বিভাগের সাবেক সহযোগী অধ্যাপক মো. মশিউর রহমান এবং লোকপ্রশাসন বিভাগের সাবেক সহযোগী অধ্যাপক আসাদুজ্জামান মন্ডলের ১০ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এছাড়া কয়েকজনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
এরআগে আবু সাঈদকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেপ্তার আসামিদের ট্রাইব্যুনালে তোলা হয়।
এই মামলার ৩০ আসামির মধ্যে সাবেক উপাচার্য হাসিবুর রশীদসহ মামলার ২৪ আসামি পলাতক। পলাতক আসামির মধ্যে রয়েছেন রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের সাবেক সহযোগী অধ্যাপক মো. মশিউর রহমান, লোকপ্রশাসন বিভাগের সাবেক সহযোগী অধ্যাপক আসাদুজ্জামান মন্ডল, সাবেক সহকারী রেজিস্ট্রার মো. হাফিজুর রহমান, সাবেক সেকশন অফিসার মো. মনিরুজ্জামান পলাশ, বিশ্ববিদ্যালয়টির সাবেক এমএলএসএস মোহাম্মদ নুরুন্নবী মন্ডল।
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই রংপুরে পুলিশের গুলিতে মারা যান আবু সাঈদ। তার হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ৩০ আসামির বিরুদ্ধে গত বছরের ৬ আগস্ট অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় বিচার।
মামলার প্রধান আসামি বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সে-সময়ের উপাচার্য ড. হাসিবুর রশিদ। তালিকায় আরও আছেন ৪ শিক্ষক, আরএমপির সাবেক কমিশনার মনিরুজ্জামানসহ ৮ পুলিশ, ছাত্রলীগের নেতা-কর্মী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী। এদের মধ্যে এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার মাত্র ৬ জন।
আবু সাঈদ হত্যায় ঊর্ধ্বতন নির্দেশদাতা হিসেবে এরই মধ্যে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকে যাবজ্জীবন সাজা দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল।
যেভাবে আবু সাঈদকে হত্যা করা হয়
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই সকালে রংপুর জিলা স্কুল থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। সেখানে বিভিন্ন কলেজ ও স্কুলের শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। মিছিলটি রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের কাছে পৌঁছালে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের ক্যাডারদের নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী দফায় দফায় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালাতে থাকে।
আন্দোলনে অংশ নেওয়া ছাত্র-জনতা প্রতিরোধ গড়ে তুললে পুলিশও হামলাকারীদের পক্ষ নিয়ে গুলি, রাবার বুলেট, কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এতে শতাধিক শিক্ষার্থী গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন।
এ সময় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের মেধাবী শিক্ষার্থী আবু সাঈদ একাই পুলিশের গুলির সামনে দাঁড়িয়ে বুক চেতিয়ে বলতে থাকেন, ‘গুলি করলে কর আমি বুক পেতে দিয়েছি’। এ সময় রাস্তার বিপরীত পাশের মাত্র ১৫ মিটার দূর থেকে অন্তত দুই পুলিশ সদস্য শটগান থেকে সরাসরি তার ওপর গুলি চালান। গুলিতে লুটিয়ে পড়েন আবু সাঈদ। হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করে। আবু সাঈদের মুখ দিয়ে তখন রক্ত বের হচ্ছিলো। সারা শরীরে গুলি আর রাবার বুলেটের ক্ষত।
এই হত্যাকাণ্ডের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং তা দেশজুড়ে ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটায়। এই ঘটনায় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তীব্র আন্দোলন গড়ে ওঠে।
২৫ বছর বয়সী আবু সাঈদ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ১২তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোটা সংস্কার আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক ছিলেন।
আবু সাঈদকে হত্যার ঘটনায় ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট রংপুরের অতিরিক্ত মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা দায়ের করা হয়। আবু সাঈদের বড় ভাই রমজান আলী এ হত্যা মামলা দায়ের করেন।
মামলার এজাহারে বাদী উল্লেখ করেন, ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই শহীদ আবু সাঈদ নিরস্ত্র, একা থাকা ও পুলিশের জন্য কোনো হুমকি না হওয়া সত্ত্বেও শটগান দিয়ে নির্মম ও নৃশংসভাবে গুলি করে পুলিশ। আবু সাঈদ পড়ে গিয়ে একাধিকবার দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেও আসামিরা পরিকল্পিতভাবে নৃশংসভাবে গুলি করেন।
আরও পড়ুন: জুলাই যোদ্ধাদের দায়মুক্তি দিয়ে সংসদে বিল পাস
