এ যেন ঈদের আমেজ! রাজধানীর বাস, ট্রেন ও লঞ্চ টার্মিনালগুলোর চিত্র দেখলে মনে হবে যেন দুয়ারে কড়া নাড়ছে কোনো উৎসব। মূলত একদিন পরই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকা ছাড়তে শুরু করেছেন লাখ লাখ মানুষ। কর্মব্যস্ত যান্ত্রিক জীবন থেকে ছুটি নিয়ে নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে এবং প্রিয়জনের সান্নিধ্য পেতে গ্রামের বাড়ির পথে ছুটছেন তারা।
আজ বুধবার সকাল থেকেই কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে ভিড় জমিয়েছেন হাজারো মানুষ। বুধবার সকাল থেকেই স্টেশনজুড়ে ছিল যাত্রীদের উপচেপড়া চাপ। কেউ পরিবার নিয়ে, কেউ একা-যার যার মতো করে ট্রেনে চড়ে গন্তব্যে ফিরছেন। অতিরিক্ত যাত্রীর চাপে অনেকেই আসনবিহীন বা স্ট্যান্ডিং টিকিট কেটে যাত্রা করছেন। আবার ট্রেনের ভেতরে জায়গা না পেয়ে ঝুঁকি নিয়ে ছাদে উঠেও যাত্রা করতে দেখা গেছে অনেককে।
যাত্রাবাড়ী-সায়েদাবাদ বাস ও লঞ্চ টার্মিনালেও ঘরমুখো মানুষের উপচেপড়া ভিড় দেখা গেছে। ট্রেনগুলোতেও যাত্রীতে ঠাসা। আবার অনেকে গাড়ি না পেয়ে ট্রাক ও পিকআপে করেও গ্রামের পথে রওনা দিচ্ছেন। ভোট দিতে গ্রামে ফেরা মানুষের চোখেমুখে ক্লান্তির চেয়ে আনন্দই বেশি।
২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পায়। এরপর ২০১৮ সালের নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি হয়। সেই নির্বাচনকে ‘রাতের ভোট’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়। এসব অভিজ্ঞতার পর এবারের নির্বাচনকে ঘিরে মানুষের প্রত্যাশা ও আগ্রহ একেবারেই আলাদা।
গতকাল মঙ্গলবার থেকেই ঢাকাছাড়া মানুষের সংখ্যা বাড়তে শুরু করে। বাস, ট্রেন ও লঞ্চে সবচেয়ে বেশি চাপ ছিল গতকালই। তবে আজ বুধবার সকালেও সায়েদাবাদ ও যাত্রাবাড়ী এলাকায় উল্লেখযোগ্য ভিড় লক্ষ্য করা গেছে।
সকাল থেকেই সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে দেখা যায় নড়াইল, বরিশাল, পটুয়াখালী, পিরোজপুর, খুলনা, গোপালগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলার মানুষের লম্বা লাইন। কোথাও হাসি-আনন্দ, কোথাও অপেক্ষার ক্লান্তি। তবুও সামগ্রিক পরিবেশ যেন উৎসবের।
নড়াইলগামী যাত্রী আবুল কালাম বলেন, গতকাল টিকিট পাইনি। আজ সকাল থেকেই অপেক্ষা করছি। অনেক বছর পর ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছি। এই সুযোগ মিস করা যায় না। কাকে ভোট দেব, সেটাও ঠিক করা আছে।
তার মতো অনেকেই বলছেন, ভোট শুধু একটি দায়িত্ব নয়, এটি তাদের অধিকার। সেই অধিকার প্রয়োগ করতেই এই ভোগান্তি।
পোশাক কারখানার কর্মী সাইদুল কবিরের গন্তব্য পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়া। যাত্রাবাড়ীর দোলাইরপাড় এলাকা থেকে বাসে উঠবেন তিনি। সাইদুল বলেন, বাস কিছুক্ষণ পরপর ছাড়ছে ঠিকই, কিন্তু ভাড়া আগের চেয়ে অনেক বেশি রাখা হচ্ছে। তবুও মানুষ যাচ্ছে। ভোট দিতে এইটুকু কষ্ট কেউ হিসাব করছে না।
রাজধানীর মতিঝিলের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ২৪-এর অভ্যুত্থানের পর মানুষ অনেক কিছু বুঝেছে। এখন মানুষ পরিবর্তন চায়। গণতান্ত্রিক অধিকার পেয়েছি, এবার সেটার ব্যবহার করতে চাই।
বাসযাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাড়তি ভাড়া নিয়ে ক্ষোভ থাকলেও ভোটের আগ্রহে সেটি চাপা পড়ে গেছে। অনেকেই বলছেন, একদিনের বাড়তি ভাড়া ভবিষ্যতের জন্য একটি ভোটের কাছে তেমন কিছু নয়।
যাত্রাবাড়ী-সায়েদাবাদ এলাকায় শুধু মানুষের ভিড় নয়, লক্ষ্য করা গেছে এক ধরনের প্রাণচাঞ্চল্য। কেউ পরিবারের সঙ্গে গল্প করছেন, কেউ ফোনে গ্রামের খবর নিচ্ছেন, কেউ আবার প্রিয় প্রার্থীর কথা বলছেন সহযাত্রীদের সঙ্গে।
ভাড়া বাড়তি, যানজট আছে, অপেক্ষাও দীর্ঘ। তবুও ভোটের টানে গ্রামমুখী মানুষের এই ঢল থামানো যাচ্ছে না। বহুদিন পর ভোট যেন আবার ফিরে পেয়েছে উৎসবের রং, মানুষের অংশগ্রহণ আর গণতন্ত্রের প্রত্যাশা।
আরও পড়ুন: কীভাবে জানবেন ভোটকেন্দ্র কোনটি, ভোটার নম্বর কত?
