আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য ইশতেহার ঘোষণা করেছে বিএনপি। ইশতেহারে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড চালুসহ ৯টি প্রধান প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দলটি। জুলাই সনদ বাস্তবায়নেরও প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দলটি।
আজ শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর হোটেল প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এই ইশতেহার ঘোষণা করেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।
অনুষ্ঠানে স্বাগত ভাষণ দেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, আজ এক নতুন ইতিহাস, আজকে নতুন নেতৃত্ব। সেই নেতা বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সমগ্র জাতি আজ উন্মুখ হয়ে আছে। নতুন নেতৃত্ব জটিল রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন বার্তা নিয়ে আসবেন। তার নেতৃত্বে নতুন এক সুর্যোদয় হবে।
বিএনপির ঘোষিত ইশতেহারের রাষ্ট্রব্যবস্থা সংস্কার অংশে বলা হয়েছে, সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে সংবিধানে পুনঃস্থাপন করা হবে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন অগণতান্ত্রিক সংশোধনী বাতিল, ৩১ দফার ভিত্তিতে সংস্কার, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহাল, উপ-রাষ্ট্রপতি পদ সৃজন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ ১০ বছর, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্য, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, সংসদে উচ্চকক্ষ প্রবর্তন, বিরোধীদলীয় ডেপুটি স্পিকার, উচ্চকক্ষে ২০ শতাংশ নারী, ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন, আন্তর্জাতিক চুক্তিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত, স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠন, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে সংস্কার করবে দলটি।
বিএনপির ইশতেহারে যে ৯টি প্রধান প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলো হলো-
১. প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারকে সুরক্ষা দিতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করে প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা অথবা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। অর্থসেবার এই পরিমাণ পর্যায়ক্রমে বাড়ানো হবে।
২. কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে ‘কৃষক কার্ড’-এর মাধ্যমে ভর্তুকি, সহজ ঋণ, কৃষিবিমা ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় বাজারজাতকরণ জোরদার করা হবে। মৎস্যচাষী, পশুপালনকারী খামারি ও কৃষি খাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও এই সুবিধা পাবেন।
৩. দুর্নীতিমুক্ত ও মানবিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে দেশব্যাপী এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ করা হবে। জেলা ও মহানগর পর্যায়ে মানসম্মত চিকিৎসা, মা ও শিশুর পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবাসহ রোগ প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে।
৪. আনন্দময় ও কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাস্তব দক্ষতা ও মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা হবে। প্রাথমিক শিক্ষায় সর্বাধিক গুরুত্ব, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি সহায়তা ও ‘মিড-ডে মিল’ চালু করা হবে।
৫. তরুণদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কারিগরি ও ভাষা দক্ষতা উন্নয়ন, স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তা সহায়তা, বৈশ্বিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে যুক্তকরণসহ মেধাভিত্তিক সরকারি নিয়োগ নিশ্চিত করা হবে।
৬. ক্রীড়াকে পেশা ও জীবিকার মাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলতে জেলা–উপজেলা পর্যায়ে ক্রীড়া অবকাঠামো ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা হবে।
৭. পরিবেশ রক্ষা ও জলবায়ু সহনশীলতা জোরদারে দেশপ্রেমী জনগণের স্বেচ্ছাশ্রম ও সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে ১০ হাজার কিলোমিটার নদী–খালখনন ও পুনঃখনন, ৫ বছরে ১৫ কোটি বৃক্ষরোপণ ও আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু করা হবে।
৮. ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি সুদৃঢ় করতে সব ধর্মের উপাসনালয়ের ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের জন্য সম্মানী ও প্রশিক্ষণভিত্তিক কল্যাণ ব্যবস্থা চালু করা হবে।
৯. ডিজিটাল অর্থনীতি ও বৈশ্বিক সংযোগ বাড়াতে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সিষ্টেম (পেপাল) চালু, ই-কমার্সের আঞ্চলিক হাব স্থাপন ও ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পণ্যের রপ্তানি সম্প্রসারণ করা হবে।
বিএনপি বলছে, এই ইশতেহার কেবল নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নয়, এটি একটি নতুন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চুক্তির ঘোষণা। বিএনপি প্রতিশোধ নয়, ন্যায় ও মানবিকতার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে। ক্ষমতা নয়, জনগণের অধিকারই বিএনপির রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। লুটপাট নয়, উৎপাদন; ভয় নয়, অধিকার; বৈষম্য নয়, ন্যায্যতা- এই নীতিতেই রাষ্ট্র পরিচালিত হবে।
বিএনপি বলছে, জনগণের রায়ে দায়িত্ব পেলে তারা এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলবে, যেখানে ভোটের মর্যাদা থাকবে। সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও বৈষম্যের অবসান হবে। আইনের ঊর্ধ্বে কেউ থাকবে না। প্রত্যেক নাগরিক গর্ব করে বলতে পারবেন, সবার আগে বাংলাদেশ।
আরও পড়ুন: নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা জামায়াতের, যা আছে ২৬ দফায়
