বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে কুয়াশাজড়ানো তীব্র শীত উপেক্ষা করে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ ও আশপাশের এলাকায় মানুষের ঢল নেমেছে। যতোই সময় গড়াচ্ছে ততোই লোকসমাগম বাড়ছে। কারও চোখে অস্রু, কারও হাতে তসবি, কেউ আবার ভারাক্রান্ত মনে চুপচাপ হাঁটছেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসা মানুষের চোখে-মুখে একজন আপোসহীন দেশনেত্রীকে হারানোর বেদনা।
আজ বুধবার দুপুরে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় এমন চিত্র দেখা গেছে। গতকাল মঙ্গলবার রাত থেকেই এই এলাকায় নেতাকর্মীরা ভিড় করা শুরু করেছে। আজ দুপুরের আগেই খালেদা জিয়ার জানাজাস্থল মানিক মিয়া এভিনিউ বিএনপি নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের আগমনে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে গেছে।
মানিক মিয়া এভিনিউ ও সংসদ ভবন এলাকায় খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক দিয়ে মানুষের স্রোত আসছে। সকাল থেকে ঢাকার প্রবেশপথগুলো দিয়ে সারি সারি গাড়ি ঢাকায় প্রবেশ করেছে। দূর দূরান্ত থেকে আসা মানুষ খঅলেদা জিয়াকে শেষ বিদায় জানাতে গাড়ি থেকে নেমে পায়ে হেঁটে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের দিকে রওনা হচ্ছেন।
জানাজায় অংশ নিতে চট্টগ্রাম থেকে আসা আবুল কালাম বলেন, ‘আমার নেত্রীর শেষ বিদায়ে অংশ নিতে আমরা চট্টগ্রাম থেকে এসেছি। তার জীবনটাই ছিল লড়াইয়ের। মৃত্যুর মুখেও আমার নেত্রী আপস করেননি। আমরা গর্ব করে বলতো পারবো, আমরা খালেদা জিয়ার কর্মী।’
ভোলার চরফ্যাশন থেকে আসা মো. সোলেমান বলেন, ‘শীতের কারণে লঞ্চে আসতে দেরি হয়েছে। শরীরও ভালো নেই। তবু এসেছেন। তার কথায়, ‘ম্যাডামের জন্য একটা আলাদা টান কাজ করেছে। চুপচাপ জানাজায় দাঁড়িয়ে দোয়া করাই আমার চাওয়া।’
নোয়াখালীর সুবর্ণচর থেকে আসা আবু বকর বলেন, ‘আমরা কোনো মিছিল বা স্লোগানের জন্য আসিনি। শুধু শেষবারের মতো সম্মান জানাতে চাই। জানাজায় দাঁড়াতে পারলেই আমাদের আসা সার্থক হবে।’
রাজশাহী থেকে আসা ইউনিয়ন পর্যায়ের প্রবীণ কর্মী ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘ম্যাডামের মৃত্যুতে মনে হচ্ছে আমাদের মাথার ওপর থেকে একটা ছায়া সরে গেছে। তিনি কখনো অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেননি। এই কাঁপানো শীতেও আমরা এসেছি কেবল তার জন্য দোয়া করতে।’

সিলেট থেকে আসা মাঠপর্যায়ের কর্মী জামার উদ্দিন বলেন, ‘আজ কোনো শোডাউনের দরকার নেই। নেত্রীকে শেষবারের মতো দেখা আর জানাজায় দাঁড়ানোই সবচেয়ে জরুরি। তার বিদায়ে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, সেটা আর পূরণ হওয়ার নয়।’
তারেক রহমান, তার স্ত্রী জুবাইদা রহমান, কন্যা জাইমা রহমান, ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রীসহ পরিবারের সদস্যরা জানাজাস্থলে আছেন।
জানাজা উপলক্ষে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পুলিশের পাশাপাশি এপিবিএন, র্যাব, বিজিবি ও সেনাবাহিনী মোতায়েন থাকবে। সার্বিক নিরাপত্তার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ১০ হাজারের বেশি সদস্য মোতায়েন থাকবে।
খালেদা জিয়ার জানাজা আজ বেলা ২টায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা ও মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে অনুষ্ঠিত হবে। জানাজা শেষে খালেদা জিয়াকে তার স্বামী সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে সমাহিত করা হবে। সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় খালেদা জিয়াকে দাফন করা হবে।
এর আগে আজ বুধবার বেলা পৌনে ১২টার দিকে লাল-সবুজ রঙের জাতীয় পতাকায় মোড়ানো ফ্রিজার ভ্যানে করে খালেদা জিয়ার মরদেহ জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় নিয়ে আসা হয়। সেনাবাহিনী হিউম্যান চেইন তৈরি করে রাষ্ট্রীয় প্রোটকলে তার মরদেহ আনা হয়।
এর আগে বেলা ১১টার দিকে ছেলে তারেক রহমানের গুলশান অ্যাভিনিউয়ের ১৯৬ নম্বর বাসা থেকে খালেদা জিয়ার মরদেহ বহনকারী ফ্রিজার ভ্যানটি যাত্রা শুরু করে। তারও আগে সকাল ৯টার দিকে খালেদা জিয়ার মরদেহ রাজধানীর এভার কেয়ার হাসপাতাল থেকে বের করে গুলশানে নেওয়া হয়। শুরুতে তার দীর্ঘদিনের বাসভবন ‘ফিরোজা’য় নেওয়ার কথা থাকলেও পরে গাড়িটি তারেক রহমানের গুলশান অ্যাভিনিউয়ের ১৯৬ নম্বর বাসায় নেওয়া হয়। সেখানে পৌঁছানোর পর বেলা ১১টা পর্যন্ত খালেদা জিয়ার স্বজন এবং বিএনপির নেতাকর্মীরা শেষবারের মতো তাকে শ্রদ্ধা জানান।
রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে ৩৭ দিন ধরে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৬টায় মৃত্যুবরণ করেন বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।
গত ২৩ নভেম্বর বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে দ্রুত তাকে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তার ফুসফুসে ইনফেকশন ধরা পড়ে। পরে কিডনি জটিলতা, হৃদরোগ ও নিউমোনিয়ায় তার অবস্থার আরও অবনতি হয়। ১ ডিসেম্বর তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। সেখানে মেডিকেল বোর্ডের দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে তার চিকিৎসা চলছিল।
আওয়ামী লীগের দীর্ঘ ১৬ বছরের শাসনামলে দীর্ঘদিন নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন খালেদা জিয়া, করেছেন কারাভোগ। চিকিৎসার সুযোগও দেওয়া হয়নি তাকে। ফলে ধীরে ধীরে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, আর্থ্রাইটিস, লিভার সিরোসিস, কিডনির জটিলতাসহ নানা শারীরিক অসুস্থতা দেখা দেয় খালেদা জিয়ার।
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ৫ আগস্ট আওয়ামী সরকারের পতনের পরদিন ৮০ বছর বয়সী খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেন রাষ্ট্রপতি। এরপর উন্নত চিকিৎসার জন্য চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি লন্ডনে যান খালেদা জিয়া। ১১৭ দিন লন্ডনে অবস্থান শেষে গত ৬ মে তিনি দেশে ফেরেন। এরপর একাধিকবার শারীরিক নানা জটিলতায় সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীকে হাসপাতালে যেতে হয়েছে।
আরও পড়ুন: মায়ের মরদেহের পাশে তারেক রহমানের কোরআন তেলাওয়াত
