নগরীর আগ্রাবাদে চট্টগ্রাম ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের চতুর্থ তলায় চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাষ্ট্রির কার্যালয় সরকারি কর্ম দিবসে সাধারণত বিকেল ৫টার পর বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু গত ৩১ আগস্ট রাতে চেম্বারের কার্যালয় খোলা থাকে রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত। তখন প্রতিষ্ঠানটির তিনজন কর্মকর্তা অফিসে কাজ করছিলেন। কিন্তু তিন কর্মকর্তার রাতে অফিস করার বিষয়টি অবগত ছিলেন না চেম্বার প্রশাসক। চেম্বার প্রশাসকের অগোচরে তিন কর্মকর্তা রাত জেগে টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপের সদস্যভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর সদস্যপদ নবায়নের কাজ করেন। এ ঘটনায় চেম্বারে তোলপাড় চলছে।
জানা গেছে, গত ২০ আগস্ট বাণিজ্য মন্ত্রণালয় চিটাগাং চেম্বারের টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপকে অকার্যকর করে দেয়। এ নিয়ে চেম্বার প্রশাসককে একটি চিঠি পাঠায় মন্ত্রণালয়। চিঠিতে প্রশাসককে চেম্বারের আসন্ন নির্বাচনে টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপকে ভোট প্রদানের সুযোগ না দিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়।
গত ২ সেপ্টেম্বর রাজনীতি সংবাদে ‘চিটাগাং চেম্বারের নির্বাচন নিয়ে সংকট’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এতে চিটাগাং চেম্বারের অ্যাসিসটেন্ট সেক্রেটারি (মেম্বার সেকশন) সৈয়দ সালাউত উল্লাহ বলেছিলেন, টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলোর সদস্যপদ নবায়নের জন্য চেম্বার প্রশাসক তাকে নির্দেশ দেন। কিন্তু চেম্বার প্রশাসক প্রকৃতপক্ষে তাকে এরকম কোনো নির্দেশ দেননি।
জানা গেছে, রাজনীতি সংবাদে ওই প্রতিবেদন প্রকাশের পর চেম্বার প্রশাসক সৈয়দ সালাউত উল্লার ওপর চরম ক্ষিপ্ত হন।
প্রসঙ্গত, চট্টগ্রাম অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (সার্বিক) পদে থাকা মুহাম্মদ আনোয়ার পাশাকে সম্প্রতি বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) নির্বাহী পরিচালক (বাণিজ্য) পদে বদলি করা হয়। পাশাপাশি তিনি চেম্বারের প্রশাসকের দায়িত্বও সামলাচ্ছেন।
জানা গেছে, গত ৪ সেপ্টেম্বর দুপুর ১২টার দিকে চেম্বার প্রশাসক মুহাম্মদ আনোয়ার পাশা বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) নিজ কার্যালয়ে সৈয়দ সালাউত উল্লাহসহ চেম্বারের আরও দুই কর্মকর্তাকে ডেকে আনেন। এরা হলেন-চেম্বারের অ্যাসিসটেন্ট অ্যাকাউন্টেট মোহাম্মদ আকতার ফারুক ও চেম্বারের অ্যাসিসন্টেট অফিসার শিবম বৈদ্য। তারা গত ৩১ আগস্ট রাতে চেম্বারে সালাউত উল্লার সঙ্গে অফিস করেছিলেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চেম্বার প্রশাসক আনোয়ার পাশা চেম্বারের অ্যাসিসটেন্ট সেক্রেটারি সৈয়দ সালাউত উল্লার কাছে গত ৩১ আগস্ট রাতে বিনা অনুমতিতে টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলোর সদস্যপদ নবায়ন করার কারণ জানতে চান। কিন্তু তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। এ সময় চেম্বার প্রশাসক তাকে কড়া ভাষায় ধমক দেন। এরপর গত ৩১ আগস্ট রাতে সৈয়দ সালাউত উল্লাহ, মোহাম্মদ আকতার ফারুক ও শিবম বৈদ্য চেম্বারে কী কাজ করেছিলেন তাদের কাছ থেকে সাদা কাগজে সেটার পৃথক পৃথক লিখিত স্বীকারোক্তি নেন চেম্বার প্রশাসক।
জানা গেছে, লিখিত স্বীকারোক্তিতে সৈয়দ সালাউত উল্লাহ ‘নিজের ইচ্ছায়’ টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলোর সদস্যপদ নবায়ন করার বিষয়টি উল্লেখ করেন। আর চেম্বারের অ্যাসিসটেন্ট অ্যাকাউন্টেট মোহাম্মদ আকতার ফারুক ও চেম্বারের অ্যাসিসন্টেট অফিসার শিবম বৈদ্য উল্লেখ করেন, সৈয়দ সালাউত উল্লাহ তাদেরকে ৫টার পর অফিসে থাকতে বাধ্য করেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মোহাম্মদ আকতার ফারুক ও শিবম বৈদ্য রাজনীতি সংবাদের কাছে বিষয়টি স্বীকার করেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আকতার ফারুক ও শিবম বৈদ্য লিখিত স্বীকারোক্তিতে এ তথ্য উল্লেখ করায় গত ৪ সেপ্টেম্বর দুপুরে বিএসসি ভবনে আনোয়ার পাশার অফিস থেকে বের হওয়ার পর তাদের ওপর চরম ক্ষিপ্ত হন সৈয়দ সালাউত উল্লাহ।
চেম্বার সূত্রে জানা গেছে, গত ৩১ আগস্ট একটা সূত্র থেকে খবর পেয়ে বিকেল ৫টার পর চেম্বার প্রশাসক মুহাম্মদ আনোয়ার পাশা অ্যাসিসটেন্ট সেক্রেটারি (মেম্বার সেকশন) সৈয়দ সালাউত উল্লাহকে ফোন করে জানতে চান, টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলোর সদস্যপদ নবায়ন করা হচ্ছে কিনা? উত্তরে সালাউত উল্লাহ তা অস্বীকার করেন।
গত ৩১ আগস্ট বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে কয়েকজন লোক সঙ্গে নিয়ে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক এস এম সাইফুল আলম চেম্বার কার্যালয়ে গিয়ে চিটাগাং টায়ার টিউব ইমপোটার্স গ্রুপের সদস্যপদ নবায়ন করেন। তিনি ৩ ঘণ্টা চেম্বারে অবস্থান করে এই গ্রুপের সদস্যপদ নবায়ন করেন।
জানা গেছে, চিটাগাং চেম্বারের আসন্ন নির্বাচনে সাইফুল আলম ট্রেড গ্রুপের সদস্য চিটাগাং টায়ার টিউব ইমপোটার্স অ্যান্ড ডিলার্স গ্রুপ থেকে প্রার্থী হতে পারেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ৩১ আগস্ট রাত সাড়ে ৮টার দিকে সৈয়দ সালাউত উল্লাহ টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলোর সদস্যপদ নবায়ন করে তাদের মানি রিসিপ্ট প্রদান করেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চেম্বারের অ্যাসিসটেন্ট অ্যাকাউন্টেট মোহাম্মদ আকতার ফারুক রাজনীতি সংবাদকে বলেন, গত ৩১ আগস্ট রাত সাড়ে ৮টার দিকে সৈয়দ সালাউত উল্লাহ আমার কাছে টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলোর সদস্যপদ নবায়ন ফি’র মানি রিসিপ্টের কার্বন কপি জমা দেন।

অভিযোগ উঠেছে, সদস্যপদ নবায়ন করা নিয়ে চেম্বারের অ্যাসিসটেন্ট সেক্রেটারি (মেম্বার সেকশন) সৈয়দ সালাউত উল্লার সঙ্গে টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলোর ‘মোটা অঙ্কের লেনদেন’ হয়েছে। এ নিয়ে চেম্বারের কর্মকর্তাদের মধ্যে কানাঘুষা চলছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে চিটাগাং চেম্বারের একজন কর্মকর্তা রাজনীতি সংবাদকে বলেন, মোটা অঙ্কের লেনদেনের কারণেই সৈয়দ সালাউত উল্লাহ চেম্বার প্রশাসকের অগোচরে কৌশলে রাতের বেলায় অফিস করে টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলোর সদস্যপদ নবায়ন করেছেন।
এ বিষয়ে জানতে চিটাগাং চেম্বারের অ্যাসিসটেন্ট সেক্রেটারি (মেম্বার সেকশন) সৈয়দ সালাউত উল্লাহকে ফোন করা হলে তিনি কল রিসিভ করে এই প্রতিবেদকের পরিচয় জেনে সংযোগ কেটে দেন। এরপর অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে তার হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারে মেসেজ পাঠানো হয়। কিন্তু তিনি কোনো জবাব দেননি।
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রে জানা গেছে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপকে অকার্যকর করলেও চেম্বারের বিএনপিপন্থি একটি পক্ষ তাদের ব্যক্তি স্বার্থে এই দুই ক্যাটাগরিকে কার্যকর রাখতে চাইছে।
জানা গেছে, চিটাগাং চেম্বারের টাউন অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যভুক্ত প্রতিষ্ঠান হলো চারটি। এগুলো হলো-পটিয়া অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি, বোয়ালখালী অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি, হাটহাজারী অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি এবং রাঙ্গুনিয়া অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি।
অপরদিকে ট্রেড গ্রুপেরও সদস্যভুক্ত প্রতিষ্ঠান হলো চারটি। এগুলো হলো-চিটাগাং ডাইস অ্যান্ড কেমিক্যালস ইমপোটার্স অ্যান্ড ডিলার্স গ্রুপ, চিটাগাং মিল্ক ফুড ইমপোটার্স অ্যান্ড ডিলার্স গ্রুপ, চিটাগাং টায়ার টিউব ইমপোটার্স অ্যান্ড ডিলার্স গ্রুপ এবং চট্টগ্রাম ক্ষুদ্র পাদুকা শিল্প মালিক গ্রুপ।
তবে নির্বাচনে টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী থাকে না। নির্বাচনে এই দুটি ক্যাটাগরি থেকে তিনজন করে মোট ছয়জন প্রার্থী হন। এই দুই ক্যাটাগরি থেকে প্রতিষ্ঠানগুলোর ডেলিগেট মেম্বাররা সমঝোতার ভিত্তিতে যে ৬ জনকে প্রার্থী করেন তারা বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। টাউন-ট্রেড চট্টগ্রাম-১১ আসনের আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য এম এ লতিফের ‘পকেট ভোট’ নামে পরিচিত। এই দুই ক্যাটাগরি থেকে তিনি যাদের প্রার্থী সিলেকশন করতেন তারা বিনাভোটে পরিচালক নির্বাচিত হতেন।
আওয়ামী লীগ নেতা এম এ লতিফের টাউন-ট্রেডের ‘পকেট ভোট’ এখন হাতের মুঠোয় কব্জা করে নিচ্ছে বিএনপি নেতারা।
সাধারণ ব্যবসায়ীরা এখন প্রশ্ন তুলছেন, আগামীতে চিটাগাং চেম্বারে এম এ লতিফের মতো বিএনপি নেতারাও কি দখলের রাজত্ব কায়েম করবে?
আরও পড়ুন:
চিটাগাং চেম্বারের নির্বাচন নিয়ে সংকট
চিটাগাং চেম্বারে মেম্বারশিপ নিয়ে ভয়াবহ জালিয়াতি
চিটাগাং চেম্বারের ‘দুর্নীতিবাজ’ সেক্রেটারি ইঞ্জিনিয়ার ফারুক বরখাস্ত
