অবশেষে চাকরিচ্যুত হলেন চিটাগাং চেম্বার অব কমার্সের ‘দুর্নীতিবাজ’ সেক্রেটারি ইনচার্জ ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ ফারুক। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বাণিজ্য সংগঠন অনুবিভাগের (ডিটিও) নির্দেশে চেম্বারের প্রশাসক মুহাম্মদ আনোয়ার পাশা গত মঙ্গলবার (২০ মে) তাকে বরখাস্ত করেছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চেম্বারের প্রশাসক মুহাম্মদ আনোয়ার পাশা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে চিটাগাং চেম্বারের ডেপুটি সেক্রেটারি শাহেদ আলী টিটু রাজনীতি সংবাদকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
জানা গেছে, ২৪ ফেব্রুয়ারি সেক্রেটারি ইঞ্জিনিয়ার ফারুককে চাকরি থেকে অব্যাহতি দিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বাণিজ্য সংগঠন অনুবিভাগের (ডিটিও) মহাপরিচালকের কাছে চিঠি দেন চেম্বারের প্রশাসক মুহাম্মদ আনোয়ার পাশা।
চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, ইঞ্জিনিয়ার ফারুক চেম্বারের সেক্রেটারি ইনচার্জ হওয়ার পর দীর্ঘদিন ধরে কর্তব্যরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিভিন্নভাবে হয়রানি করে আসছেন। তিনি নিজের পছন্দের লোকদের চাকরি স্থায়ীকরণ, পদোন্নতি এবং বেতনবৃদ্ধিসহ বিভিন্ন বৈষম্যমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত ছিলেন।
চিঠিতে চেম্বারের প্রশাসক আরও লিখেন, ইঞ্জিনিয়ার ফারুককে ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’ আখ্যায়িত করে চেম্বারের নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের স্বার্থে গত ১৬ অক্টোবর ‘বঞ্চিত ব্যবসায়ী ফোরাম’ নামের একটি সংগঠন বাণিজ্য সংগঠন অনুবিভাগের কাছে একটি চিঠি দেয়।
ইঞ্জিনিয়ার ফারুকের মহাসচিব পদের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে আনোয়ার পাশা চিঠিতে লিখেন, চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ড্রাস্ট্রির মেমোরেন্ডাম অ্যান্ড আর্টিকেলস অব অ্যাসোসিয়েশনে মহাসচিব কিংবা সেক্রেটারি জেনারেল পদ না থাকলেও বোর্ডকে প্রভাবিত করে তিনি মহাসচিব/সেক্রেটারি জেনারেল পদে পদোন্নতি নেন। নিয়ম অনুযায়ী, এক বোর্ড সভার কার্যবিবরণী পরবর্তী বোর্ড সভায় অনুমোদনপূর্বক গৃহীত সিদ্ধান্তসমূহ কার্যকর করা হয়। কিন্তু তিনি নিয়ম নীতি অনুসরণ না করে পরবর্তী বোর্ড সভার আগেই পদোন্নতিপত্র স্বাক্ষর করিয়ে নেন।
চিঠিতে চেম্বারের প্রশাসক আরও লিখেন, গত ৩ সেপ্টেম্বর থেকে ইঞ্জিনিয়ার ফারুক চিটাগাং চেম্বার কার্যালয়ে অনুপস্থি আছেন। আমার কার্যালয়ে (চট্টগ্রাম অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (সার্বিক) তার অনিয়মিত উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেলেও গত ১ ডিসেম্বর থেকে কোনো রকম অবহিতকরণ ও বিনা অনুমতিতে অনুপস্থিত রয়েছেন। তিনি দীর্ঘদিন যাবৎ কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার কারণে চেম্বারের যাবতীয় কার্যক্রম যেন বিঘ্ন সৃষ্টি না হয় সেজন্য ইঞ্জিনিয়ার ফারুককে অব্যাহতি প্রদান এবং একজন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব প্রদানের জন্য প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আবেদন করেন।
জানা গেছে, বাণিজ্য সংগঠন অনুবিভাগের (ডিটিও) মহাপরিচালক এই চিঠি পাওয়ার পর ইঞ্জিনিয়ার ফারুকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে চেম্বারের প্রশাসককে নির্দেশ দেন। এরপর চেম্বারের প্রশাসক সেক্রেটারি ইনচার্জ ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ ফারুককে বরখাস্ত করেন।
প্রসঙ্গত, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৩১ আগস্ট চিটাগাং চেম্বারে ইঞ্জিনিয়ার ফারুককে লাঞ্চিত করেন একদল ব্যবসায়ী। পরদিন ফারুকের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ তুলে তাকে অপসারণের দাবিতে আন্দোলনে নামে চেম্বারের এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন।
এরপর থেকে ‘ভয়ে’ ফারুক আর চেম্বারে যাননি। চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার আনোয়ার পাশা চেম্বারের প্রশাসকের দায়িত্ব পাওয়ার পর কোর্ট বিল্ডিংয়ে তার কার্যালয়ে গিয়ে অফিস করতেন ফারুক। কিন্তু তিনি দিনে মাত্র আড়াই ঘণ্টা অফিস করতেন আর বেতন নিতেন আড়াই লাখের ওপরে! আড়াই ঘণ্টার চাকরিতে মিনিটে ১ হাজার ৭৭৭ টাকা আয় করতেন তিনি। চিটাগাং চেম্বারে ফুল টাইম অফিস করা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে এ নিয়ে ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দেয়।
এ নিয়ে গত বছরের ২১ নভেম্বর রাজনীতি সংবাদে ‘আড়াই ঘণ্টা অফিস করে বেতন নেন আড়াই লাখের ওপরে!’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনটি প্রকাশ হওয়ার পর বিস্মিত হন চিটাগাং চেম্বারের সদস্যরা।
চট্টগ্রাম-১১ আসনের (বন্দর-পতেঙ্গা) আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য ও চিটাগাং চেম্বারের সাবেক সভাপতি এম এ লতিফের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত ইঞ্জিনিয়ার ফারুক। তিনি লতিফের ছত্রছায়ায় ও যোগসাজসে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে ‘হরিলুট’ করে অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠে।
ইঞ্জিনিয়ার ফারুকের অঢেল সম্পদ নিয়ে গত বছরের ২১ অক্টোবর রাজনীতি সংবাদে ‘৬ কোটি টাকার মালিক চিটাগাং চেম্বারের সেক্রেটারি’ শীর্ষক একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
সেই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট) থেকে বিএসসি (সিভিল ইঞ্জিনিয়ার) পাশ করা ফারুকের বেতন ২ লাখ ৬৬ হাজার ৫৪০ টাকা। ২০০৮ সালের ১০ এপ্রিল চিটাগাং চেম্বারের অব কমার্সের মালিকানাধীন ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে আবাসিক ইঞ্জিনিয়ার (সিভিল) পদে ২৪ হাজার টাকা বেতনে চাকরি নিয়েছিলেন তিনি। ৯ বছরের মাথায় তিনি চিটাগাং চেম্বারের সেক্রেটারি ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সেক্রেটারির চেয়ারে বসার পর ফুলেফেঁপে উঠে তার সম্পদ। জমি-প্লট কিনেছেন প্রায় ৩ কোটি টাকার, সঞ্চয়পত্র কিনেছেন প্রায় ১ কোটি টাকার, ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছেন প্রায় ১ কোটি টাকা, বানিয়েছেন কোটি টাকা দামের আলিশান বাড়ি। সবমিলিয়ে তিনি প্রায় ৬ কোটি টাকার সম্পদ গড়েছেন।
আরও পড়ুন:
৬ কোটি টাকার মালিক চিটাগাং চেম্বারের সেক্রেটারি
আড়াই ঘণ্টা অফিস করে বেতন নেন আড়াই লাখের ওপরে!
চিটাগাং চেম্বারের সেক্রেটারি উধাও!
চিটাগাং চেম্বারে মেম্বারশিপ নিয়ে ভয়াবহ জালিয়াতি
