, | |

মূলপাতা আইন-আদালত

প্রশাসনের চাপে আবু সাঈদের পোস্টমর্টেম রিপোর্ট পরিবর্তন হয় ৫ বার


২০২৪ সালের ১৬ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যা করে পুলিশ। ফাইল ছবি
প্রকাশের সময় :২৪ আগস্ট, ২০২৫ ৩:৩৩ : অপরাহ্ণ

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে রংপুরে পুলিশের গুলিতে নিহত বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের পোস্টমর্টেম রিপোর্ট প্রশাসনের চাপে পাঁচবার পরিবর্তন করা হয়।

আজ রোববার রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক রংপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. রাজিবুল ইসলাম এ তথ্য জানিয়েছেন।

ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে তিনি সাক্ষ্য দেন।

ডা. রাজিবুল ইসলাম বলেন, ‘স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) সভাপতি চন্দন আমাকে বলেন, আবু সাঈদের লাশ নিয়ে ব্যবসা চলছে। শেখ হাসিনা এ ব্যাপারে কনসার্ন আছেন। পুলিশ যেভাবে বলে তুমি সেভাবে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট দিয়ে দাও।’

এই চিকিৎসক আরও বলেন, ‘আমাকে ৫ বার রিপোর্ট পরিবর্তন করতে হয়েছিল। কিন্তু একটি রিপোর্ট পুলিশ নষ্ট করতে বলে। পরে আমি সর্বশেষ ও চতুর্থ বারের রিপোর্টে আবু সাঈদের হত্যার বিস্তারিত উল্লেখ করলেও গুলির বিষয়ে উল্লেখ করিনি। আমি লিখেছিলাম উপরোক্ত কারণে আবু সাঈদের মৃত্যু হয়েছে।’

কান্নাজড়িত কণ্ঠে ডা. রাজিবুল ইসলাম ট্রাইব্যুনালকে বলেন, ‘আমি রাত ৩টা পযন্ত রিপোর্ট লিখছিলাম। আমার স্ত্রী এসে আমি কী লিখছি তা জানতে চাচ্ছিলো। আমার পরিবার নিয়ে আমি শঙ্কিত ছিলাম। আমাকে বিদেশ ভ্রমণ ও কক্সবাজার ফ্যামিলিসহ ঘুরে আসতে বলেছিল। বিনিময়ে তাদের কথামতো রিপোর্ট তৈরি করতে বলছিলো। কিন্তু আমি তাদের কথায় রাজি হইনি।’

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই সকালে রংপুর জিলা স্কুল থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। সেখানে বিভিন্ন কলেজ ও স্কুলের শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। মিছিলটি রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের কাছে পৌঁছালে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের ক্যাডারদের নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী দফায় দফায় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালাতে থাকে।

আন্দোলনে অংশ নেওয়া ছাত্র-জনতা প্রতিরোধ গড়ে তুললে পুলিশও হামলাকারীদের পক্ষ নিয়ে গুলি, রাবার বুলেট, কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এতে শতাধিক শিক্ষার্থী গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন।

এ সময় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের মেধাবী শিক্ষার্থী আবু সাঈদ একাই পুলিশের গুলির সামনে দাঁড়িয়ে বুক চেতিয়ে বলতে থাকেন, ‘গুলি করলে কর আমি বুক পেতে দিয়েছি’। এ সময় রাস্তার বিপরীত পাশের মাত্র ১৫ মিটার দূর থেকে অন্তত দুই পুলিশ সদস্য শটগান থেকে সরাসরি তার ওপর গুলি চালান। গুলিতে লুটিয়ে পড়েন আবু সাঈদ। হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করে। আবু সাঈদের মুখ দিয়ে তখন রক্ত বের হচ্ছিলো। সারা শরীরে গুলি আর রাবার বুলেটের ক্ষত।

 

এই হত্যাকাণ্ডের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং তা দেশজুড়ে ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটায়। এই ঘটনায় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তীব্র আন্দোলন গড়ে ওঠে।

২৫ বছর বয়সী আবু সাঈদ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ১২তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোটা সংস্কার আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক ছিলেন।

আবু সাঈদকে হত্যার ঘটনায় ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট রংপুরের অতিরিক্ত মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা দায়ের করা হয়। আবু সাঈদের বড় ভাই রমজান আলী এ হত্যা মামলা দায়ের করেন।

মামলার এজাহারে বাদী উল্লেখ করেন, ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই শহীদ আবু সাঈদ নিরস্ত্র, একা থাকা ও পুলিশের জন্য কোনো হুমকি না হওয়া সত্ত্বেও শটগান দিয়ে নির্মম ও নৃশংসভাবে গুলি করে পুলিশ। আবু সাঈদ পড়ে গিয়ে একাধিকবার দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেও আসামিরা পরিকল্পিতভাবে নৃশংসভাবে গুলি করেন।

আরও পড়ুন: আবু সাঈদ হত্যা মামলা: ৩০ আসামির বিচার শুরু

মন্তব্য করুন
Rajniti Sangbad


আরও খবর