রাজধানীর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ইসলামী আন্দোলনের মহাসমাবেশ জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছে। এতে লাখো মানুষের সমাগম ঘটেছে। সমাবেশ থেকে প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে সংসদে আসন বণ্টন, নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডসহ ১৬ দফা দাবি জানিয়েছে চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন।
আজ শনিবার সকাল সাড়ে ১০টায় এই সমাবেশ শুরু হয়। প্রয়োজনীয় রাষ্ট্র সংস্কার, গণহত্যার বিচার, সংখ্যানুপাতিক (পিআর) পদ্ধতিতে নির্বাচনের দাবি এবং দেশ ও ইসলামবিরোধী সকল ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের প্রতিবাদে এই সমাবেশের আয়োজন করা হয়।
সমাবেশে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) গণঅধিকার পরিষদ, এবি পার্টিসহ বিভিন্ন দলের নেতারা অংশ নেন। এ ছাড়া হিন্দু্, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের সংগঠনের নেতারাও অংশ নেন।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চল এবং ঢাকার নানা প্রান্ত থেকে ইসলামী আন্দোলনের হাজার হাজার নেতাকর্মী ও সমর্থক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এসে হাজির হন। ঢাকার বাইরের নেতাকর্মী ও সমর্থকেরা ভোর রাতেই ঢাকা পৌঁছান। তারা বায়তুল মোকাররমসহ ঢাকার বিভিন্ন মসজিদে রাতযাপন করেন।
দুপুর পৌনে ২টায় সমাবেশস্থলে লোকে লোকারণ্য হয়ে ওঠে। ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন সংলগ্ন গেট, স্বাধীনতা জাদুঘরের প্রধান ফটক এবং চারুকলা সংলগ্ন গেট দিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্রোতের মতো নেতাকর্মী প্রবেশ করে। ঢাকা টিএসএসসি গেট স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়ায় ঢাকার পশ্চিম ও দক্ষিণ এলাকা দিয়ে আসা হাজার হাজার নেতাকর্মী ও সমর্থকেরা কালী মন্দির গেট দিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রবেশ করে।
দুপুরে ২টায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের চার পাশের সড়ক ইসলামী আন্দোলনের মিছিলে মিছিলে সয়লাব হয়ে যায়। রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে দলীয় ব্যানার, ফেস্টুন নিয়ে, টিশার্ট পরে মিছিলসহ উদ্যানের দিকে অগ্রসর হন ইসলামী আন্দোলনের নেতাকর্মীরা। কওমী, আলিয়া মাদরাসার পাশাপাশি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীরা নিজ নিজ ব্যানারে মহাসমাবেশে অংশ নেন।
সমাবেশকে কেন্দ্র করে বরাবরের মতোই উদ্যান এবং এর আশপাশে দলীয় প্রতীকের রেপলিকা, হেডার, ফেস্টুন, কোর্ট পিন, টুপি, পাগড়ি, জায়নামাজ, আতর, তজবি ও স্বল্প মূল্যে খাবার দোকান বসানো হয় দলের পক্ষ থেকে।
ইসলামী আন্দোলনের আমীর সৈয়দ রেজাউল করীমের সভাপতিত্বে মহাসমাবেশে ঘোষণাপত্র পাঠ করেন দলের মুখপাত্র মাওলানা গাজী আতাউর রহমান।
ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে, ভবিষ্যৎ স্বৈরতন্ত্র রোধ করা, সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় জনমতের প্রতিফলন নিশ্চিতে সংস্কার কমিশনে মতামত দিয়েছে ইসলামী আন্দোলন। তা বিবেচনা কররত মহাসমাবেশ থেকে আহ্বান জানাচ্ছি।
সমাবেশ থেকে সংস্কারের দ্বিতীয় ধাপের সংলাপে বাস্তবায়নের জন্য ১৬ দফা দাবি জানানো হয়। এগুলো হলো-
১. সংবিধানের মূলনীতি হিসেবে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচারের সঙ্গে ‘আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাসই হবে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল নীতি’ এ বিষয়টি অবশ্যই পুনঃস্থাপন করতে হবে।
২. সংসদের প্রস্তাবিত উভয়কক্ষে সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে নির্বাচন দিতে হবে।
৩. গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যাশা বাস্তবায়নে জাতীয় ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে আগামী জুলাই মাসের মধ্যে জুলাই সনদ ঘোষণা করতে হবে।
৪. নির্বাচিত স্বৈরাচার, দুর্নীতিবাজ, লুটেরা ও সন্ত্রাসী শ্রেণি রাষ্ট্রক্ষমতাকে ব্যবহার করে জনগণের অধিকার কেড়ে নিতে না পারে, রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয়করণের মাধ্যমে ধ্বংস করতে না পারে এবং একদলীয় কর্তৃত্ববাদী শাসন কায়েম করতে না পারে সে জন্য প্রয়োজনী মৌলিক রাষ্ট্রসংস্কার দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে।
৫. সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিতে জনপ্রশাসনকে ঢেলে সাজাতে হবে। ফ্যাসিবাদেরক চিহ্নিত করে দ্রুত অপসারণ করতে হবে।
৬. পতিত ফ্যাসিবাদের বিচার নিশ্চিতে বিদেশে পালাতক অপরাধীদের আটকে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা আরও জোরদার করতে হবে।
৭. দেশ থেকে পাচার করা অর্থ উদ্ধারে সক্রিয়, কার্যকর ও দৃশ্যমান উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
৮. দেশে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস ও খুনখারাবি রোধে প্রশাসনকে আরও কার্যকর ও অবিচল হতে হবে।
৯. ভারতের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। দেশবিরোধী চুক্তি বাতিল করতে হবে।
১০. জাতীয় নির্বাচনের আগে সব স্থানীয় নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে। আগামীতেও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে স্থানীয় নির্বাচনের বিধান প্রণয়ন করতে হবে।
১১. চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ, ঋণখেলাপি ও সন্ত্রাসীদেরকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করতে হবে।
১২. জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পূর্বে অবশ্যই সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
১৩. ঘুষ, দূর্নীতিসহ সকল প্রকার নাগরিক হয়রানি বন্ধ করতে হবে। কোনো নিরপরাধ ব্যক্তির বিরুদ্ধে শুধু রাজনৈতিক কারণে হয়রানিমূলক মামলা বন্ধ করতে হবে। হয়রানিমূলক সব মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। দেশের কোথাও কোনো রকম মব সৃষ্টির সুযোগ দেওয়া যাবে না। মব সৃষ্টিকারীদের দমনে যথাযথ আইনী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
১৪. দেশ বিরোধী ও ইসলাম বিরোধী সব ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত মোকাবিলায় সাম্রাজ্যবাদ, সম্প্রসারণবাদ ও আধিপত্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে।
১৫. জাতীয় নির্বাচনে দুর্নীতিবাজ, চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে দেশপ্রেমিক ও ইসলামী শক্তির ইস্পাত কঠিন ঐক্য গড়ে তুলতে হবে।
১৬. স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের সুরক্ষা, জনগণের জান-মাল ও ইজ্জতের নিরাপত্তা বিধান, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি সুরক্ষা, সর্বত্র শান্তি শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং কাঙ্ক্ষিত উন্নতি ও অগ্রগতির লক্ষ্যে সকল পর্যায়ে ইসলামের সুমহান আদর্শের অনুশীলন করতে হবে।
আরও পড়ুন: ‘নতুন বাংলাদেশ দিবসের’ তারিখ নিয়ে আখতার-সারজিস-হাসনাতের আপত্তি
