সৌরীশ ঘোষ প্রকাশের সময় :১৬ আগস্ট, ২০২১ ১২:২০ : অপরাহ্ণ
আমেরিকা কি কার্যত বিনা যুদ্ধে পাকিস্তানের হাতে তুলে দিল আফগানিস্তানকে? যা ঘটছে আফগানিস্তানে, তার অন্যতম কারণ আমেরিকা। ভবিষ্যতে যা ঘটবে, তার দায়ও আমেরিকাকেই নিতে হবে। কাতারে আমেরিকার সঙ্গে আলোচনা করতে চেয়েছিল তালেবান। তখন আলোচনায় যায়নি আমেরিকা। লক্ষ্য ছিল ওসামা বিন লাদেন। আমেরিকা তালেবানের কাছ থেকে লাদেনকে চেয়েছিল। তাতে রাজি হয়নি তালেবানরা।
তাতেই প্রাথমিক সমস্যা তৈরি হয়। লড়াই বাধে। যে লড়াইকে আফগানিস্তানের মুক্তির লড়াই হিসাবে তুলে ধরতে চেয়েছিল আমেরিকা। কিন্তু জর্জ বুশ বা বারাক ওবামা— কেউই আফগানিস্তানে রাষ্ট্র গঠনের চেষ্টা করেননি। কোনও মুক্তিই তারা দিতে চাননি।
হ্যাঁ, এ কথা ঠিক যে, অর্থনৈতিক সাহায্য আমেরিকা করে গিয়েছিল। কিন্তু সেটাও খুব বড় কিছু নয়। ক্রমে সেই সত্যিটা প্রকাশ্যে এসে পড়ছিল। তার উপর এলো করোনা। প্রবল অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হলো আমেরিকার উপর। যুদ্ধের খরচ টানা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়লো। সেই কারণেই ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময়ে সেনা প্রত্যাহারের ধীর গতি হঠাৎ বেড়ে গেলো জো বাইডেন আসার পর।
আমেরিকার সেনা ফিরলো। কিন্তু ফিরলো না আফগানদের ভাগ্য। তারা যে তিমিরে ছিলেন, সেখানেই পড়ে রইলেন। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিস্থিতির কোনও উন্নতি হল না!
মনে রাখা দরকার যে, আশরাফ গনির সরকার বা তার আগে হামিদ কারজাইয়ের আমল-প্রত্যেকের প্রশাসনই ছিল বিপুল দুর্নীতিগ্রস্ত। সাধারণ মানুষের উন্নতির কথা কেউ ভাবেনি। যা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে আফগান সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। আফগান প্রদেশগুলি চলে ‘প্রদেশ প্রভু’-দের দ্বারা। এদের নিজস্ব সেনা (মিলিশিয়া) আছে। তাদের হারাতে হারাতেই তালেবান কাবুল পর্যন্ত পৌঁছেছে।
নব্বইয়ের দশকে যখন তালেবান ক্ষমতা দখল করেছিল, তখনও তারা এদের হারাতে হারাতেই এসেছিল। কিন্তু পরে যখন আমেরিকার সেনা প্রবেশ করে আফগানিস্তানে, তখন এদের ক্ষমতা হ্রাস করানো হয়। হামিদ কারজাইয়ের ক্ষমতায় আসার পর এই প্রভুরা ক্রমে সরকারের কাছাকাছি আসেন। নিজস্ব বাহিনী তুলে নিয়ে সরকারের বাহিনীর মাধ্যমে শাসন করতে শুরু করেন। এরা আগাগোড়াই তালেবান বিরোধী ছিলেন। এদের সখ্য ছিল মুজাহিদিনের সঙ্গে। কাছাকাছি আসায় সরকারও এদের উপর ভরসা করতে শুরু করে।
গনি চেষ্টা করেছিলেন এদের হাতে ক্ষমতা পৌঁছে দেওয়ার। যাতে তালেবানের সঙ্গে এরা লড়তে পারেন। কিন্তু সাম্প্রতিক লড়াইয়ে সামান্য কয়েকজন প্রদেশ প্রভু ছাড়া কেউই তেমন প্রতিরোধ গড়ে তোলেননি।
কেন?
তা এখনও খুব একটা স্পষ্ট নয়। উদাহরণ দিয়ে বলা যায় মাজার-ই-শরিফের কথা। চাইলে তালেবানের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারতো এই প্রদেশ। কিন্তু তোলেনি। হেরাটে ইসমাইল খান কিছুটা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনিও সরে এলেন। কেন, সেটা এখনও স্পষ্ট নয়।
ওরা কি তাহলে আশরাফ গনির সরকারের বিরুদ্ধে গেলেন?
আফগানিস্তানে আমেরিকার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ‘মরিয়া’ চেষ্টাও এই সরকার বিরোধিতার পিছনে কাজ করে থাকতে পারে। আমার মতে, আফগানিস্তানের একটিও সরকার সঠিকভাবে নির্বাচিত নয়। গনি সরকারও নয়। আমেরিকা বাইরে থেকে শক্তি প্রয়োগ করে গনিকে প্রেসিডেন্টের আসনে বসিয়েছিল। এ নিয়ে আমেরিকার প্রতি বিরূপ মনোভাব তৈরি হয়েছিল আফগানবাসীর। প্রশাসনের শীর্ষ স্তরের মানুষেরা তালেবানকে চাইতেন না ঠিকই। কিন্তু পাশাপাশি আমেরিকাকেও পছন্দ করতেন না।
তার কারণ, আফগানিস্তান জুড়ে আমেরিকার ক্রমাগত অত্যাচার। রেডক্রসের হাসপাতালও ধ্বংস হয়েছে আমেরিকার হামলায়। অনেক সাধারণ মানুষের মৃত্যু হয়েছে আমেরিকার যুদ্ধংদেহী মনোভাবের কারণে। যে ঘটনাগুলি কখনওই সামনে আসেনি। এমনকি, আফগানিস্তানে ক্ষমতায় বসে থাকা সরকারও এই সমস্যাগুলিকে কখনও সমাধানের চেষ্টা করেনি। করবেই বা কী করে! কারণ ওদের হাত-পা বাঁধা। আমেরিকার টাকায় ওরা ক্ষমতায় বসে আছে। সেই ক্ষমতায় থেকে আমেরিকার বিরুদ্ধে যাওয়া তো সম্ভব নয়। হামিদ কারজাই তার শাসনকালের শেষের দিকে বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু তাতে লাভ হয়নি। উল্টে তাকেই সরে যেতে হয়েছে।
আমেরিকার হাতে তৈরি পরিস্থিতিই ধীরে ধীরে তালেবানের দিকে হাওয়া ঘুরিয়ে দেয়। খুব ধীরে হলেও তা ক্রমে আমেরিকার বিরুদ্ধে গোটা আফগানিস্তানকে তাতিয়ে তোলে। তালেবানদের মধ্যে একটা ‘বিপ্লবী’ সুলভ ভাবভঙ্গি আছে, আমেরিকার অত্যাচারে অতিষ্ট মানুষ সেটা আরও বেশি করে মেনে নিতে শুরু করে। কিন্তু মেনে নিলেই তো হল না। এত বড় একটা যুদ্ধ চালাতে গেলে তো রসদ দরকার। অস্ত্র আর রসদ না থাকলে এই লড়াই সম্ভব নয়।
সেখানেই শুরু হয়েছিল এক নতুন অধ্যায়। পাকিস্তান সরাসরি মদত দিতে শুরু করেছে তালেবানদের। শুধু পাকিস্তান নয়, মদত ছিল চীনেরও। কয়েকদিন আগেই চীনের সঙ্গে তালেবানের বৈঠক করেছে। চীন প্রায় সরাসরি প্রস্তাব দিয়েছে, বেজিংয়ের যে ‘বিনিয়োগ’ আফগানিস্তানে আছে, তা সুরক্ষিত রাখলে তারা তালেবান সরকারের পাশে দাঁড়াবে। সেগুলি মেনে নিয়ে তালেবান এগিয়েছে। এর মধ্যে অনুঘটকের কাজ করেছে আমেরিকার হাত তুলে দেওয়া।
করোনা পরবর্তী পরিস্থিতিতে আমেরিকার অর্থনৈতিক অবস্থা ভেঙে পড়েছে। যুদ্ধের বিপুল খরচ তাদের পক্ষে চালানো সম্ভব নয়। আর চালিয়েই বা কী হবে?
আমেরিকা ভেবেছিল, আফিম চাষের বিপুল টাকা তাদের হাতে আসবে। কিন্তু তা হয়নি। কিছুটা টাকা পেলেও আশানুরূপ আফিমের লাভ আমেরিকার ঝুলিতে আসেনি। তার উপর বিপুল পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এতদিনের লড়াইয়ে।
আল কায়দাকে শায়েস্তা করার একটা লক্ষ্য আমেরিকার ছিল। তা এত দিনে পূর্ণ হয়ে গিয়েছে। তালেবানও আল কায়দাকে সামনের সারিতে না আনার শর্তে রাজি হয়েছে। এর পর তো নতুন করে আমেরিকার কিছু পাওয়ার নেই।
মুখে বললেও আমেরিকা কোনওদিনই আফগানিস্তানে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র তৈরি করতে সেনা পাঠায়নি। তাই লাভের খাতায় যখন টান পড়েছে, নিঃশব্দে ধীরে ধীরে সরে গিয়েছে তারা। নিজের দেশেও মধ্য এশিয়ায় সেনা রাখা নিয়ে বিস্তর চাপে থেকেছে আমেরিকার প্রশাসন। করোনার পর সেই চাপ আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সামলানোই এখন আমেরিকার একমাত্র লক্ষ্য। সেটা করতে চেয়ে সে দেশ ‘একাকিত্বের অর্থনীতি’-র পথ বেছে নিয়েছে। খরচ কমিয়ে এনেছে। আফগানিস্তান থেকে সেনা সরানোর বিষয়টা তারই একটা অংশ। আমেরিকা আর নতুন করে যুদ্ধ চায় না।
তবে আন্তর্জাতিক রাজনীতির ইতিহাসে এই পর্যায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে রইল। কারণ, বিশ্বের শক্তি বলয়ের একপাশে আমেরিকা থাকলে অন্য পাশে অবশ্যই রয়েছে চীন। কাবুলের পতন আসলে চীনের কাছে আমেরিকার পরাজয়ের ইঙ্গিত।
চীন কিন্তু কোনও যুদ্ধ করে এগোয়নি। এগিয়েছে কূটনীতি ও অর্থনৈতিক লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে। কিন্তু আমেরিকা যুদ্ধ করে এগোতে গিয়েছিল। পারল না। ইরাকেও পারল না। আফগানিস্তানেও পারল না। শেষে এমন অবস্থা হল, যখন তালেবান ক্রমাগত এগিয়ে আসছে, একের পর এক প্রদেশ দখল করছে, তখনও আমেরিকার সৈন্য শুধু পিছু হটেছে। একটু-আধটু বোমা ফেলেছিল। কিন্তু তা কোনও দাগই কাটেনি।
উল্টো দিকে এই তালেবানের কাছে ছিল বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও অর্থ। যা আসলে চীন আর পাকিস্তানের দেওয়া। আমেরিকা কেন তার সামনে কোনও প্রতিরোধ গড়ে তুলল না-এই প্রশ্নটাই এখন ঘুরছে অনেকের মাথায়। এমনও যুক্তি শোনা গিয়েছিল কয়েকদিন আগে যে, এই তালেবানি বাড়বাড়ন্তের পিছনে অন্য কোনও মতলব আছে। সত্যিই কি তাই? আমেরিকা কি কার্যত বিনা যুদ্ধে পাকিস্তানের হাতে তুলে দিল আফগানিস্তানকে? তাতে তো আরও বিপদ বাড়বে ভারতের!
সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা