জাহাজভাঙা মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স এসোসিয়েশনের (বিএসবিআরএ) নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে। আগামী শনিবার (১৩ জুন) চট্টগ্রাম নগরীর রেডিসন ব্লুতে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। গতকাল বুধবার নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেন নির্বাচন বোর্ডের চেয়ারম্যান আফতাব উদ্দিন চৌধুরী।
এদিকে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার পর ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন ঋণখেলাপির দায়ে প্রার্থিতা বাতিল হওয়া রাইজিং স্টিল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমজাদ হোসাইন চৌধুরী। নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার পরই তিনি ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে নির্বাচন বোর্ডের চেয়ারম্যান আফতাব উদ্দিন চৌধুরীর হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারে মেসেজ পাঠিয়ে তাকে মামলার হুমকি দিয়েছেন।

মেসেজে তিনি লিখেন, ‘আসসালামু আলাইকুম। যাদের নির্দেশনা অনুযায়ী নির্বাচন শিডিউল দিয়েছেন, তাদের থেকে খরচের টাকা বেশি করে নিয়ে নিয়েন। কারণ আপনাকে নির্বাচনের পরে কোর্টে যাতায়াত করতে হবে; তখন তারা আপনার পাশে থাকবে না। কথাটা জানাইলাম। সাব জুডিশ মেটার রেখে নির্বাচন করতেছেন এইটার মাশুল আপনাকে আইনের মাধ্যমে দিতে হবে। কথাটা মনে করাই দিয়ে রাখলাম।’
আমজাদ চৌধুরী চিটাগাং চেম্বার অব কমার্সের সিনিয়র সহসভাপতি। তিনি বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আসলাম চৌধুরীর ছোট ভাই। আসলাম চৌধুরী গত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) আসনে বিজয়ী হন।
আমজাদ চৌধুরীর হুমকির বিষয়ে মুখ খুলতে রাজি হননি নির্বাচন বোর্ডের চেয়ারম্যান আফতাব উদ্দিন চৌধুরী। তবে তিনি মোবাইলে মেসেজ পাঠানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
আফতাব উদ্দিন চৌধুরী বলেন, গত ৮ জুন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ আমজাদ চৌধুরীর প্রার্থিতার বৈধতা নিয়ে হাইকোর্টের রিটের আদেশ স্থগিত করে দেয়। একই সাথে নির্বাচন আয়োজনের বিষয়েও নির্দেশনা দেয়। আপিল বিভাগের রায় অনুযায়ী আমরা ভোট গ্রহণের তারিখ ঘোষণা করেছি।
নির্বাচন বোর্ডের চেয়ারম্যানকে হুমকি দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে আমজাদ চৌধুরী মেসেজ পাঠানোর কথা স্বীকার করে রাজনীতি সংবাদকে বলেন, ‘আমি নির্বাচন বোর্ডের চেয়ারম্যানকে হুমকি দিইনি। হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে তিনি নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেছেন। তাই চেয়ারম্যানকে আদালতে যেতে হবে বলেছি।’
গত ৩০ এপ্রিল ঋণখেলাপির অভিযোগে আমজাদ চৌধুরীর প্রার্থিতা বাতিল করে শিপ ব্রেকার্স এসোসিয়েশনের নির্বাচন পরিচালনা বোর্ড। এরপর আমজাদ নির্বাচন আপিল বোর্ডের কাছে আপিল করেন। গত ৬ মে আপিল বোর্ডে আপিল শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সিআইবি রিপোর্টে ‘ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি’ সাব্যস্ত হওয়ায় শুনানিতে আমজাদের আপিল নামঞ্জুর করে তার মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করা হয়।
নির্বাচনী বোর্ডের এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে গত ১ জুন হাইকোর্টে রিট করেন আমজাদ চৌধুরী। রিটের শুনানি শেষে তার প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্ট। হাইকোর্টের এই আদেশের বিরুদ্ধে গত ৩ জুন লিভ টু আপিল (আপিল করার অনুমতি চেয়ে আবেদন) করে শিপ ব্রেকার্স এসোসিয়েশনের নির্বাচন বোর্ড। আংশিক আপিল শুনানি শেষে আপিল বিভাগ আমজাদ চৌধুরীর প্রার্থিতার বৈধতা নিয়ে হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত করে দেয়। এরপর গত ৮ জুন আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানি শেষে আমজাদ চৌধুরীর প্রার্থিতার বৈধতা নিয়ে হাইকোর্টের রিটের আদেশ স্থগিত করে আপিল বিভাগ। এতে শিপ ব্রেকার্স এসোসিয়েশনের নির্বাচন পরিচালনা বোর্ডের সিদ্ধান্ত বহাল থাকে। ফলে আমজাদ চৌধুরীর প্রার্থিতা বাতিল হয়ে যায়।
প্রসঙ্গত, গত ৩ জুন চট্টগ্রাম নগরীর পাঁচ তারকা হোটেল রেডিসন ব্লুতে শিপ ব্রেকার্স এসোসিয়েশনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। নির্বাচনে ভোটার সংখ্যা হলো ৮৬ জন। নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন ১৮ জন। এর মধ্যে সভাপতি পদে প্রার্থী হয়েছেন দুজন। এরা হলেন- দেশের খ্যাতনামা শিল্পগ্রুপ পিএইচপি ফ্যামিলির ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মহসিন ও রাইজিং স্টিল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমজাদ চৌধুরী। কিন্তু আমজাদ চৌধুরী নির্বাচন থেকে বাদ পড়েছেন। নির্বাচনে দুই বছর মেয়াদের জন্য সভাপতি, সিনিয়র সহসভাপতি ও দুজন সহসভাপতি এবং সাতজন নির্বাহী সদস্য নির্বাচিত হবেন।
এর আগে গত বছরের ২৫ অক্টোবর শিপ ব্রেকার্স এসোসিয়েশনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। নির্বাচনে ১১টি পদের বিপরীতে মনোনয়নপত্র জমা দেন ১১ জন। তখন আমজাদ চৌধুরীর ‘অযাচিত হস্তক্ষেপের’ কারণে ১৫ সেপ্টেম্বর ‘স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন’ করতে না পারার কারণ দেখিয়ে ইস্তফা দেয় নির্বাচন বোর্ড। ফলে আর নির্বাচন হয়নি।
এরপর গত বছরের ৩ নভেম্বর সংগঠনের সংঘবিধি লঙ্ঘন করে শিপ ব্রেকার্স এসোসিয়েশনের সভাপতির পদ ‘দখল’ করেন আমজাদ চৌধুরী। সংগঠন পরিপন্থী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে আমজাদ চৌধুরীকে গত ৫ ফেব্রুয়ারি অপসারণ করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এরপর বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের সচিব আবু সাফায়াৎ মুহাম্মদ শাহে দুল ইসলামকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
আরও পড়ুন: নিউমুরিং টার্মিনাল ইজারা: এবার চট্টগ্রাম বন্দরে দানা বাঁধছে না আন্দোলন
