৪ মাস আগে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের দুই সমন্বয়ক হুমায়ুন কবির ও ইব্রাহিম খোকন নেতৃত্ব দিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে শ্রমিক-কর্মচারী আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। তাদের আন্দোলনের চাপে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) দুবাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে অন্তর্বর্তী সরকার। অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ দিকে থমকে যাওয়া এনসিটি ইজারা প্রক্রিয়া বর্তমান বিএনপি সরকার সময়ে আবার আলোচনায় এসেছে। কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দরে এবার দানা বাঁধছে না আন্দোলন। এর কারণ ৪ মাস আগে একে অপরের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া দুই সমন্বয়কের মধ্যে এখন বিভেদের দেয়াল গড়ে উঠেছে।
গত ৪ জুন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় এক চিঠিতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে দুবাইভিত্তিক বন্দর অপারেটর ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে এনসিটি ইজারা প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করতে নির্দেশনা দিয়েছে। কিন্তু এবার এনসিটি ইজারা ইস্যুতে নীরব চট্টগ্রাম বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীরা।
চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের দুই সমন্বয়ক হুমায়ুন কবির ও ইব্রাহিম খোকনের মধ্যে বিরোধের কারণে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছেন শ্রমিক-কর্মচারীরা। শ্রমিক-কর্মচারীদের মধ্যে অনৈক্য ও নেতৃত্ব না থাকায় এবার এনসিটি ইজারা বিরোধী আন্দোলন গড়ে তুলতে পারছেন না তারা।

৪ মাস আগে এনসিটি ইজারা বিরোধী আন্দোলনে হুমায়ুন কবির ও ইব্রাহিম খোকন ছিলেন একে অপরের সহযোদ্ধা। কিন্তু তারা এখন একে অপরের ‘শত্রুতে’ পরিণত হয়েছে। তাদের বিরোধ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, একে অপরের মুখ দেখাদেখিও বন্ধ হয়ে গেছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের আসন্ন শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের (সিবিএ) নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দুই শ্রমিক নেতা দুই মেরুতে অবস্থান নিয়েছেন। চার মাস আগে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের আন্দোলনের পর তাদের মধ্যে বিরোধের বীজ বপন হয়েছে।
হুমায়ুন কবির চট্টগ্রাম বন্দরের অডিট সুপার পদে কর্মরত। তিনি চট্টগ্রাম বিভাগীয় শ্রমিক দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য। ইব্রাহিম খোকন চট্টগ্রাম বন্দরের ইঞ্জিন ড্রাইভার হিসেবে কর্মরত। তিনি শ্রমিক দলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকলেও কোনো দায়িত্বে নেই।
চট্টগ্রাম বন্দরের আসন্ন সিবিএ নির্বাচনে হুমায়ুন কবির ও ইব্রাহিম খোকনের নেতৃত্বে পৃথক দুটি প্যানেল গঠন হতে যাচ্ছে। তারা দুজনই সাধারণ সম্পাদক পদে লড়াই করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সাধারণ সম্পাদক পদে প্রার্থী হওয়া নিয়েই তাদের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইব্রাহিম খোকন রাজনীতি সংবাদকে বলেন, ‘৪ মাস আগে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের আন্দোলনের সময় হুমায়ুন কবির অঙ্গীকার করেছিলেন, সিবিএ নির্বাচনে আমি যে পদে প্রার্থী হবো তিনি সে পদে প্রার্থী হবেন না। তিনি আমার পরের পদে প্রার্থী হবেন। বন্দরের সকল কর্মচারীর সামনে প্রকাশ্যে তিনি এ অঙ্গীকার করেছিলেন। কিন্তু আন্দোলনের পর তিনি পল্টি নিয়েছেন। তার মধ্যে কোনো নীতিনৈতিকতা নেই।’
হুমায়ুন কবির বিষয়টি অস্বীকার করে রাজনীতি সংবাদকে বলেন, ‘সিবিএ নির্বাচনের প্রার্থীর বিষয়ে আমি কোনো অঙ্গীকার করিনি। ইব্রাহিম খোকন এটা মিথ্যা কথা বলছেন। আমি অঙ্গীকার করেছিলাম চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের আন্দোলনের কমিটি নিয়ে। এই কমিটির তালিকা তৈরির সময় পাঁচজনকে সমন্বয়ক করা হয়। তখন আমি বলেছি, পাঁচজন সমন্বয়ক হতে পারে না। এরপর আমি খোকনকে আহ্বায়ক করে কমিটির প্রস্তাব করি। কিন্তু তিনি এটা নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করেছিলেন।’
চট্টগ্রাম বন্দরের সিবিএ নির্বাচনের এখনো তফসিল ঘোষণা হয়নি। তবে ২৫ সদস্যের নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। এখনো নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা না হলেও ভোটের প্রচার শুরু হয়ে গেছে বন্দর ভবনে। নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থীদের ব্যানার-পোস্টারে ছেয়ে গেছে বন্দর ভবন। নির্বাচনী প্রচার ঘিরে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে বন্দর ভবনে।
জানতে চাইলে সিবিএ নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কমিশনার ও চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (পরিবহন) গোলাম মো. সারওয়ারুল ইসলাম রাজনীতি সংবাদকে বলেন, ‘বন্দরের সিবিএ নির্বাচন নিয়ে আমাদের প্রস্তুতি চলছে। এখন আমরা ভোটার তালিকা তৈরির কাজ করছি। ভোটার তালিকা তৈরি শেষে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে।’
চট্টগ্রাম বন্দরের আসন্ন সিবিএ নির্বাচনে বিএনপির সহযোগী সংগঠন শ্রমিক দলের পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত ইসলামী শ্রমিক সংঘও অংশ নেবে। ‘সর্বদলীয় শ্রমিক ঐক্য পরিষদ’ নামে একটা প্যানেল গঠন করেছে ইসলামী শ্রমিক সংঘ। সর্বদলীয় শ্রমিক ঐক্য পরিষদের সভাপতি পদে হেলাল উদ্দিন ও সাধারণ সম্পাদক পদে মোহাম্মদ ইয়াছিন প্রার্থী হয়েছেন। তবে দুটি শ্রমিক সংগঠন প্যানেলভিত্তিক নির্বাচনের প্রস্তুতি নিলেও সিবিএ নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে ব্যক্তিকেন্দ্রিক।
কেন পৃথক প্যানেল করলেন হুমায়ুন কবির ও ইব্রাহিম খোকন?
চট্টগ্রাম বন্দরের আসন্ন সিবিএ নির্বাচনে ইতোমধ্যে হুমায়ুন কবির ‘শওকত-কবির পরিষদ’ নামে একটি প্যানেল গঠন করেছেন। তার প্যানেলে সভাপতি প্রার্থী করা হয়েছে মোজাহের হোসেন শওকতকে। তিনি চট্টগ্রাম বন্দর শ্রমিক দলের (সাবেক সিবিএ) সহসম্পাদক। সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী হুমায়ুন কবির বন্দর চট্টগ্রাম বন্দর শ্রমিক দলের (সাবেক সিবিএ) প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ছিলেন। কিন্তু এখনো প্যানেল গঠন করেননি ইব্রাহিম খোকন। তবে তার প্যানেলে যোগ দিয়েছেন দুই শ্রমিক দল নেতা সিরাজুল ইসলাম ও ইমরান খান। সিরাজুল ইসলাম চট্টগ্রাম বিভাগীয় শ্রমিক দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য।
পৃথকভাবে প্যানেল গঠন করার কারণ জানতে চাইলে হুমায়ুন কবির রাজনীতি সংবাদকে বলেন, ‘বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীদের মধ্যে মোজাহের হোসেন শওকতের জনপ্রিয়তা আছে। তাকে আমি সভাপতি প্রার্থী করে সম্মান দিয়েছি। তার জন্য প্রয়োজনে আমি ছাড় দিবো। ইব্রাহিম খোকন কি আমার মতো করে প্যানেল করতে রাজি আছেন? তিনি কি আমাকে নিশ্চয়তা দিতে পারবেন, ইয়াছিনকে (সর্বদলীয় শ্রমিক ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী) হারাতে পারবেন?’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইব্রাহিম খোকন রাজনীতি সংবাদকে বলেন, ‘ইয়াছিনকে হারানোর ব্যাপারে আমি শতভাগ নিশ্চয়তা দিতে পারবো। নির্বাচনে ইয়াছিন কোনো ফ্যাক্টরই না। কারণ এনসিটি ইজারা বিরোধী আন্দোলনে তার কোনো ভূমিকাই ছিল না। বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীরা তাকে গণনাও করেন না। শুধু ইয়াছিন না, হুমায়ুন কবিরকেও আমি হারাতে পারবো। আমি তাকে চ্যালেঞ্জ দিলাম। তার সাহস থাকলে আমার সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করুক।’
হুমায়ুন কবিরের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ইব্রাহিম খোকন বলেন, ‘‘এনসিটি ইজারা বিরোধী আন্দোলনের সময় আমাকে যখন গ্রেপ্তার করা হয়, তখন হুমায়ুন কবির ভয়ে কুমিল্লায় পালিয়ে যান। গত ২২ এপ্রিল একটি গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তা আমাকে বন্দর চেয়ারম্যানের কক্ষে ডেকে নিয়ে যান। তখন সেখানে হুমায়ুন কবিরও ছিলেন। বন্দর চেয়ারম্যান এনসিটি ইজারার বিরুদ্ধে আমাদের আন্দোলন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তখন হুমায়ুন কবির বন্দর চেয়ারম্যানকে ১০-১৫ বার ‘স্যরি’ বলেন। এরপর তিনি বললেন, ‘স্যার, আমাদের মাফ করে দেন’। বন্দর চেয়ারম্যানের কক্ষ থেকে বের হওয়ার পর হুমায়ুন কবিরকে আমি প্রশ্ন করলাম, আপনি চেয়ারম্যানের কাছে কেন ক্ষমা চাইলেন? এনসিটি আন্দোলন তো আমাদের ভুল ছিল না। তিনি তখন আমাকে বললেন, বিষয়টা বাদ দেন।’’
হুমায়ুন কবির না ইব্রাহিম খোকন-কাকে সমর্থন দেবে শ্রমিক দল?
চট্টগ্রাম বন্দরের আসন্ন সিবিএ নির্বাচনে হুমায়ুন কবির ও ইব্রাহিম খোকন সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী হওয়া নিয়ে বন্দরে শ্রমিক দলের নেতাকর্মীরা দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছেন। তবে চট্টগ্রাম বিভাগীয় শ্রমিক দল এখনো দুই নেতার কোনো প্যানেলকে সমর্থন দেয়নি।
শ্রমিক দলের সমর্থনের বিষয়ে জানতে চাইলে হুমায়ুন কবির রাজনীতি সংবাদকে বলেন, ‘এখানে কি শ্রমিক দলের নির্বাচন হবে? এখানে কোনো দলবাজি নেই।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিভাগীয় শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক ও চট্টগ্রাম বন্দর শ্রমিক দলের (সাবেক সিবিএ) সাবেক সাধারণ সম্পাদক কাজী শেখ নুরুল্লাহ বাহার রাজনীতি সংবাদকে বলেন, ‘বন্দরের সিবিএ নির্বাচনে চট্টগ্রাম বিভাগীয় শ্রমিক দল এখনো কোনো প্যানেলকে সমর্থন দেয়নি। এখন কেউ যদি স্বঘোষিত প্যানেল ঘোষণা করে সেটা তার ব্যাপার।’
প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘হুমায়ুন কবির যদি শ্রমিক দলের সমর্থনের প্রয়োজন মনে না করে, তাহলে সে শ্রমিক দলের নাম কেন ব্যবহার করছে?’
কাকে ‘ফ্যাক্টর’ মনে করছেন ইয়াছিন?
বন্দরের সিবিএ নির্বাচনে শ্রমিক দলের দুই নেতা হুমায়ুন কবির ও ইব্রাহিম খোকন সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী হয়েছেন। তারা জামায়াত সমর্থিত ইসলামী শ্রমিক সংঘের সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী মোহাম্মদ ইয়াছিনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। কিন্তু মোহাম্মদ ইয়াছিন নির্বাচনে শ্রমিক দলের দুই নেতা হুমায়ুন কবির ও ইব্রাহিম খোকনের মধ্যে কাকে ‘ফ্যাক্টর’ মনে করছেন?
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মোহাম্মদ ইয়াছিন রাজনীতি সংবাদকে বলেন, ‘’আমি হুমায়ুন কবিরকে ‘ফ্যাক্টর’ মনে করছি। তবে শ্রমিক দল কিংবা নুরুল্লাহ বাহার যদি হুমায়ুন কবিরকে সমর্থন না দেয় তাহলে তিনি নির্বাচনে সুবিধা করতে পারবেন না। কারণ নুরুল্লাহ বাহার বন্দর সিবিএ’র সাবেক সেক্রেটারি ছিলেন। বন্দরে শ্রমিক দলের একটা বড় অংশ তার নিয়ন্ত্রণে আছে। ফলে তিনি যাকে সমর্থন দেবেন তিনি এগিয়ে থাকবেন।’
আরও পড়ুন: চট্টগ্রাম সিটির মেয়র পদে বিএনপিতে আলোচনায় দুই নাম
