, | |

মূলপাতা চট্ট-মেট্টো

চিটাগাং চেম্বার নির্বাচন বয়কট করছে ‘সম্মিলিত ব্যবসায়ী পরিষদ’!


রাজনীতি সংবাদ প্রতিবেদক প্রকাশের সময় :১৯ মে, ২০২৬ ১০:২১ : পূর্বাহ্ণ

দেশের শতবর্ষী প্রাচীন ব্যবসায়ী সংগঠন চিটাগাং চেম্বার অব কমার্সের নির্বাচন নিয়ে নাটকীয় মোড় দেখা দিয়েছে। গতকাল সোমবার সকালে চিটাগাং চেম্বারের নির্বাচন বোর্ড ২৩ মে (শনিবার) ভোটের তারিখ ঘোষণা করে। কিন্তু এই নির্বাচন বয়কট করার সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে সম্মিলিত ব্যবসায়ী পরিষদ প্যানেল। এফবিসিসিআইয়ের আর্বিট্রেশন ট্রাইব্যুনালের আদেশ অনুযায়ী নির্বাচনের নতুন তফসিল ঘোষণা না করায় তারা এই সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে।

গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় নগরীর জামাল খাঁন এলাকার একটি ক্লাবে বৈঠক করেন সম্মিলিত ব্যবসায়ী পরিষদ প্যানেলের প্রার্থীরা। এতে প্যানেলটির ২২ জন প্রার্থী উপস্থিত ছিলেন।

জানতে চাইলে সম্মিলিত ব্যবসায়ী পরিষদ প্যানেলের পরিচালক প্রার্থী আহমেদুল আলম চৌধুরী রাসেল রাজনীতি সংবাদকে বলেন, ‘বৈঠকে নির্বাচনের বিষয়ে দুটি সিদ্ধান্ত হয়েছে। একটি হলো, চেম্বারের নির্বাচন বোর্ডের চেয়ারম্যানের কাছে আমরা নির্বাচনের নতুন তফসিল ঘোষণার দাবি জানাবো। আর দ্বিতীয় সিদ্ধান্ত হলো, নির্বাচন বোর্ড দাবি না মানলে আমরা নির্বাচন বয়কট করবো। তারা (ইউনাইটেড বিজনেস ফোরাম) এম এ লতিফের (চট্টগ্রাম-১১ আসনের আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি) মতো প্রহসনের নির্বাচন করছে। এই নির্বাচনে অংশ নিলে সেটা হবে আমাদের জন্য আত্মঘাতী।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চেম্বারের নির্বাচন বোর্ডের চেয়ারম্যান মনোয়ারা বেগম গতকাল রাতে রাজনীতি সংবাদকে বলেন, ‘নির্বাচনের নতুন তফসিল ঘোষণার সুযোগ নেই। যেখানে শেষ হয়েছিল, আমরা সেখান থেকে শুরু করেছি। গত ১১ ডিসেম্বর হাইকোর্টের আদেশের ভিত্তিতেই আমরা পুরোনো তফসিল অনুযায়ী ভোটের তারিখ ঘোষণা করেছি। এ বিষয়ে আমরা হাইকোর্টের অ্যাটর্নি জেনারেলের মতামত নিয়েছি। তিনি হাইকোর্টের আদেশের প্রেক্ষিতে পুরোনো তফসিল অনুযায়ী নির্বাচন অনুষ্ঠানের মতামত দিয়েছেন।’

জানতে চাইলে ইউনাইটেড বিজনেস ফোরাম প্যানেলের উপদেষ্টা ও চিটাগাং চেম্বারের সাবেক সভাপতি আমির হুমায়ুন মাহমুদ চৌধুরী রাজনীতি সংবাদকে বলেন, ‘চেম্বারের তিনজন সদস্য আর্বিট্রেশন ট্রাইব্যুনালে যে অভিযোগ দিয়েছিলেন তা খারিজ করে দেওয়া হয়েছে। ওই অভিযোগের বাইরে চেম্বারের নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে আদেশ দেওয়ার কোনো এখতিয়ার নেই আর্বিট্রেশন ট্রাইব্যুনালের। দেশের সর্বোচ্চ আদালত হাইকোর্ট যেভাবে নির্দেশনা দিয়েছে সেভাবেই চেম্বারের নির্বাচন হবে।’

প্রসঙ্গত, চেম্বারের নির্বাচনে টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপ থেকে ছয়জন পরিচালক প্রার্থী হয়েছে আমির হুমায়ুনের ইউনাইটেড বিজনেস ফোরাম প্যানেল থেকে। এতে ভোটের আগে ২৪টি পরিচালক পদের মধ্যে ৬টি বাগিয়ে নিয়েছে তারা। যে কারণে পুরোনা তফসিল অনুযায়ী নির্বাচনের বিরোাধিতা করছে সম্মিলিত ব্যবসায়ী পরিষদ। নতুন তফসিল অনুযায়ী নির্বাচন হলে টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপে প্রার্থী দেওয়ার সুযোগ পেতো সম্মিলিত ব্যবসায়ী পরিষদ।

সম্মিলিত ব্যবসায়ী পরিষদ প্যানেলের একজন প্রার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাজনীতি সংবাদকে জানিয়েছেন, তারিখ ঘোষণার মাত্র পাঁচ দিনের মধ্যে ভোটের দিনক্ষণ চূড়ান্ত করায় আমরা বিপাকে পড়েছি। আমাদেরকে হাইকোর্টে রিটের সুযোগ না দিতে তড়িঘড়ি করে ঈদের আগে ভোটের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। কারণ পাঁচ দিনের মধ্যে হাইকোর্টে রিট করার সুযোগ নেই।

এদিকে পুরোনো তফসিল অনুযায়ী ভোটের তারিখ ঘোষণা হওয়ায় উল্লসিত আমির হুমায়ুন চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড বিজনেস ফোরাম প্যানেলের প্রার্থীরা। তারা চেম্বারের পরিচালকের চেয়ারে বসতে অপেক্ষার প্রহর গুনছেন।

চিটাগাং চেম্বারের ব্যবসায়ীদের অনেকে বলছেন, দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর আমির হুমায়ুনের ‘কৌশলের’ কাছে নুরুল হক ‘ধরাশায়ী’ হয়েছেন।

জানা গেছে, গত রোববার (১৭ মে) বিকেলে সম্মিলিত ব্যবসায়ী পরিষদের প্যানেল লিডার এস এম নুরুল হক চিটাগাং চেম্বারের প্রশাসক মো. মোতাহের হোসেন ও চেম্বারের নির্বাচন বোর্ডের চেয়ারম্যান মনোয়ারা বেগমের সাথে সাক্ষাৎ করে ভোটের নতুন তফসিল ঘোষণার অনুরোধ করেছিলেন।

এর আগে গত ২২ এপ্রিল এফবিসিসিআইয়ের আর্বিট্রেশন ট্রাইব্যুনাল বাণিজ্য বিধিমালা-২০২৫ অনুযায়ী নতুন তফসিল ঘোষণা করে চিটাগাং চেম্বারের নির্বাচন অনুষ্ঠানের আদেশ দেয়। বাণিজ্য বিধিমালা-২০২৫ অনুযায়ী চেম্বারের সদস্যদের সরাসরি ভোটে সভাপতি, সিনিয়র সহসভাপতি, সহসভাপতি এবং পরিচালক নির্বাচিত হবে।

চিটাগাং চেম্বারের অ্যাসোসিয়েট সদস্য এস এম নুরুল হক এবং দুই অর্ডিনারি সদস্য মোহাম্মদ বেলাল হোসেন ও মুহাম্মদ আজিজুল হক পৃথকভাবে আর্বিট্রেশন ট্রাইব্যুনালে এ মামলা দায়ের করেছিলেন।

গত বছরের ৪ সেপ্টেম্বর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় চিটাগাং চেম্বারের টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে আদেশ দিয়েছিল। এরপর ১৩ সেপ্টেম্বর চেম্বারের নির্বাচন আপিল বোর্ড টাউন-ট্রেডের প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করে। মন্ত্রণালয়ের এ সিদ্ধান্ত বাতিলের জন্য চেম্বারের তিন সদস্য নুরুল হক, মোহাম্মদ বেলাল হোসেন ও আজিজুল হক আর্বিট্রেশন ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করেন। কিন্তু গত ২২ এপ্রিল ট্রাইব্যুনাল তাদের অভিযোগ খারিজ করে দেয়।

গত ১১ মার্চ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ আর্বিট্রেশন ট্রাইব্যুনালে চিটাগাং চেম্বারের এই তিন সদস্যের মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত চেম্বার নির্বাচন স্থগিত রাখার নির্দেশ দিয়েছিল।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের চিটাগাং চেম্বারের টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়ার আদেশ চ্যালেঞ্জ করে একটি রিট দায়ের করা হয়েছিলো। চেম্বারের অর্ডিনারি মেম্বার মোহাম্মদ বেলাল গত বছরের ১৯ অক্টোবর এই রিট দায়ের করেছিলেন। এরপর ২২ অক্টোবর এই রিটের শুনানি শেষে হাইকোর্ট বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আদেশ স্থগিত করে টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপ ছাড়া নির্বাচন করার আদেশ দেয়। এরপর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এই রিটের বিরুদ্ধে আপিল করে। গত বছরের ৩০ অক্টোবর প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ হাইকোর্টের রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত চিটাগাং চেম্বারের নির্বাচন স্থগিতের আদেশ দেয়। এরপর গত বছরের ১১ ডিসেম্বর হাইকোর্ট বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আদেশ বাতিল চেয়ে করা রিট পিটিশন খারিজ করে দেয়। এর ফলে টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলো নির্বাচনে অংশগ্রহণের বাধা কেটে যায়।

এরপর রিটকারী বেলাল আবার আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল করে। কিন্তু পরে তিনি সেই লিভ টু আপিল প্রত্যাহার করে নেয়। এরপর গত ৫ মে আপিল বিভাগ লিভ টু আপিল খারিজ করে দেয়।

আপিল বিভাগ লিভ টু আপিল খারিজ করে দেওয়ার পর চেম্বার নির্বাচন কীভাবে হবে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠে। কারণ আর্বিট্রেশন ট্রাইব্যুনাল বাণিজ্য বিধিমালা-২০২৫ অনুযায়ী নির্বাচনের নতুন তফসিল ঘোষণা করার আদেশ দিয়েছিল।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চেম্বারের নির্বাচন বোর্ডের চেয়ারম্যান মনোয়ারা বেগম রাজনীতি সংবাদকে বলেন, ‘আর্বিট্রেশন ট্রাইব্যুনালের আদেশ আমাদের আমলে নেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ এই আদেশ অপ্রাসঙ্গিক।’

উল্লেখ্য, গত বছরের ১ নভেম্বর চেম্বারের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ভোটের দুই দিন আগে হাইকোর্টে রিট দায়ের করার ফলে নির্বাচন আটকে যায়। এরপর দ্বিতীয় দফায় গত ৪ এপ্রিল চেম্বারের ভোটগ্রহণের তারিখ নির্ধারণ করে নির্বাচন বোর্ড। কিন্তু আপিল বিভাগের নির্দেশে নির্বাচন স্থগিত করা হয়।

চিটাগাং চেম্বারের সর্বশেষ প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন হয়েছিল ২০১৩ সালের ৩০ মার্চ। ওই নির্বাচনে মাহবুবুল আলম-নুরুন নেওয়াজ সেলিম পরিষদ জয়লাভ করে। তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলো মোরশেদ মুরাদ ইব্রাহীম-আবদুস সালাম ঐক্য পরিষদ। নির্বাচনে মাহবুবুল আলম-নুরুন নেওয়াজ সেলিম পরিষদ থেকে ২০ জন এবং মোরশেদ-সালাম পরিষদ থেকে মাত্র চারজন পরিচালক নির্বাচিত হন। এর পরের পাঁচ মেয়াদের নির্বাচনে কোনো ভোটাভুটি হয়নি। বিনাভোটে চেম্বারের পরিচালনা পর্ষদ নির্বাচিত হয়েছে।

প্রসঙ্গত, চিটাগাং চেম্বারের নির্বাচনে ২৪টি পরিচালক পদে নির্বাচন হয়। এর মধ্যে অর্ডিনারি থেকে ১২ জন, অ্যাসোসিয়েট থেকে ৬ জন, টাউন অ্যাসোসিয়েশন থেকে ৩ জন এবং ট্রেড গ্রুপ ক্যাটাগরি থেকে ৩ জন পরিচালক নির্বাচিত হয়। তবে টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপ থেকে সমঝোতার ভিত্তিতে ছয়জন পরিচালক প্রার্থী হন। তাদের কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী থাকে না। তারা বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।

আরও পড়ুন: 

শিপ ব্রেকার্স এসোসিয়েশনের নির্বাচনে নাটকীয় মোড়!

চট্টগ্রাম সিটির মেয়র পদে বিএনপিতে আলোচনায় দুই নাম

মন্তব্য করুন
Rajniti Sangbad


আরও খবর